দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও ইফা ডিজিকে স্বপদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত!

1
151

সামীম মোহাম্মদ আফজাল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) হওয়ার পর থেকেই একের পর এক ইসলাম বিরোধী কাজ করেছে। যার ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম অনেক আন্দোলনও করেছিলেন। ইসলাম বিদ্বেষী সরকার নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে।

দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহিষ্কার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। যা চেয়েছে, তা-ই করেছে। মন্ত্রণালয় কিংবা ফাউন্ডেশনের কারও কথায় গুরুত্ব দেয়নি। এক সপ্তাহ ধরে এই সামীম মোহাম্মদ আফজালের অব্যাহতির দাবিতে উত্তপ্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির ২৭ পরিচালকের মধ্যে ২০ জনই সামীম মোহাম্মদ আফজালের অব্যাহতি চেয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।

তবে কেনাকাটা-নিয়োগবাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইফা মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ পান সামীম মোহাম্মদ আফজাল। এর পর ভুয়া সনদ/লিখিত পরীক্ষায় কম মার্ক পাওয়া সত্ত্বেও নিয়োগ দেয় ভাগ্নে-ভাতিজা-শ্যালিকাসহ ঘনিষ্ঠজনদের। এ ১০ বছরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে স্বজন ছাড়াও সিন্ডিকেট তৈরি করে লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহিষ্কার আর স্বেচ্ছাচারীর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ে দুটি অভিযোগ জমা পড়েছে। মন্ত্রণালয় ও দুদক এ বিষয়ে আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করেছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে নিয়োগের পর ভাগ্নি ফাহমিদা বেগমকে সহকারী পরিচালক, সিরাজুম মুনীরাকে মহিলা কো-অর্ডিনেটর অফিসার, ভাগ্নে এহসানুল হককে বায়তুল মোকাররম মসজিদের পেশ ইমাম, ভাতিজা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সহকারী পরিচালক, শাহ আলমকে উৎপাদক ব্যবস্থাপক, রেজোয়ানুল হককে প্রকাশনা কর্মকর্তা, মিসবাহ উদ্দিনকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, শ্যালিকা ফারজিমা শরমীনকে আর্টিস্টসহ নিকটাত্মীয়দের বিভিন্ন পদে নিয়োগের অভিযোগ সামীম মোহাম্মদ আফজালের বিরুদ্ধে।
ডিজির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়, গত ১০ বছরে ইফায় ৬ শতাধিক কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সময়ে নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি, নিময়নীতি তোয়াক্কা না করেই দৈনিক ভিত্তিতে আড়াইশ কর্মচারী নিয়োগ দেয়।

গত দেড় বছর আগে মসজিদভিত্তিক শিশু, গণশিক্ষায় কওমি ও আলিয়া নেসাবের ২০২০ জন শিক্ষক নিয়োগকালে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে তৎকালীন প্রকল্পপ্রধান জোবায়ের আহমেদ ক্ষুব্ধ হন। এ নিয়ে তৎকালীন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব মো. আবদুল জলিলের সঙ্গে ডিজির দ্বন্দ্ব হয়। যে কারণে ইবতেদায়ী পর্যায়ে নিয়োগ এখনো আটকে আছে। দুদক ও মন্ত্রণালয়ে আসা অভিযোগে বলা হয়, ইফা ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল নারিন্দার মশুরীখোলা দরবারের পীর শাহ মোহাম্মদ আহছানুজ্জামানের মুরিদ।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ‘বোগদাদী কায়দা’ আমপাড়া নামে যুগ যুগ ধরে পুস্তক ছাপা হলেও লেখক হিসেবে নতুন করে পীরের নাম বসিয়ে দেয় ডিজি। এ জন্য পীরকে ১৪ লাখ টাকা রয়ালিটি দেওয়া হয়। ডিজি নিজেও ইফার প্রকাশনায় ২৫টি পুস্তক লিখে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব পুস্তক ইসলামিক ফাউন্ডেশেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও সারাদেশে থাকা ইফা পরিচালিত পাঠাগারে কেনা বাধ্যতামূলক করেছে। আবার ইফার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর প্রেসে বই ছাপিয়ে তাকে ৭০ লাখ টাকা আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, সামীম মোহাম্মদ আফজালের হিসেবে পরিচিত জালাল আহমেদকে সংস্থাটির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ উপসচিবের পদে ৮ বছর রাখা হয়। ডিজির পর সেই একমাত্র কর্মকর্তা, যে একই পদে এত বছর থাকছে। জালাল আহমেদ ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির পরিচালকের দায়িত্ব পেলেও তাকে একই পদে রাখা হয়। ডিজির দুর্নীতির সহায়ক হিসেবে পরিচিত পরিচালক হারুনুর রশিদ, তাহের হোসেন, সাহাবউদ্দিন খান ও হালিম হোসেন খান।

হারুনুর রশিদ ও তাহের হোসেন যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৩ সালের অবসরগ্রহণ করলেও ২০১৮ সাল পর্যন্ত তারা অফিস করে বদলিবাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সভায় এ সময়ে অংশ নিয়ে সম্মানী পেয়েছেন। অবসরগ্রহণের পর তারা সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার করেছেন। মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষায় ফিল্ড সুপারভাইজার নিয়োগে ডিজির ঘনিষ্ঠজন এবিএম শফিকুল ইসলাম ও মজিব উল্লাহ ফরহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সারাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইফার অর্থায়নে ৫৬০ মডেল মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। এসব মসজিদের জন্য সাইনবোর্ড তৈরি করা হয়। প্রতিটি সাইনবোর্ডের ব্যয় ধরা হয় ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সারাদেশের জেলা অফিসারদের নির্দেশনা দিয়ে ঢাকা থেকে ডিজির স্ত্রীর বড় ভাই মনার মাধ্যমে কাজগুলো করানো হয়।

সূত্র বলছে, ২০১০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসের মেশিন ক্রয়ে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও মেশিন কেনা হয় ৪৫ লাখ টাকায়। কাগজপত্রে প্রেসের মেশিনটিকে হাইডেলবার্গ জার্মানির দেখানো হলেও মূলত এটি চীনের তৈরি।
এসকল দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ এবং সপ্তাহকালব্যাপী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের পরও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজালকে স্বপদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার।

সামীম মোহাম্মদ আফজালের পদত্যাগের দাবিতে গত সপ্তায়জুড়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সারা দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।

সামীম মোহাম্মদ আফজালকে শিগগিরই ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে; চলতি সপ্তাহে তার স্থলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম-সচিবকে আপাতত দায়িত্ব দেয়া হতে পারে- এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেন ইফার আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এ প্রক্ষাপটে, গত শনিবার ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নস এর সভা থেকে ডিজির পদত্যাগের কথা থাকলেও আগামী ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত স্বপদেই বহাল থাকছে বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ শেখ মো. আবদুল্লাহ।
সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন