দুদক কর্তাদের দুর্নীতি! ১২ কর্তার কেউই যায়নি জাহালমের বাড়ি!

0
148

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলেই নিরীহ জাহালমকে জেল খাটতে হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় থাকা অনুসন্ধান কর্মকর্তা, তদন্ত কর্মকর্তা ও তদারক কর্মকর্তা সবাই ভুল করেছে। কেউই যায়নি জাহালমের বাড়ি!

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত। তাঁদের কারও নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। এই কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করলেও তাঁদের কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া উচিত ছিল।

ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজেদের বাঁচাতে যেকোনো ব্যক্তিকে যে আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করতে পারেন, তা দুদকের কর্মকর্তারা ভেবেই দেখেনি। এ ব্যাপারে মামলার তদারক কর্মকর্তা সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ৩৩টি মামলার ১২ জন তদন্ত কর্মকর্তা গুরুত্বের সঙ্গে মামলা তদন্ত করেনি। প্রত্যেক তদন্ত কর্মকর্তা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রত্যেকে আশায় ছিলেন, অন্যরা তদন্তের কোনো অগ্রগতি করলে তাঁরা সেটা নকল করবে। যা তাঁদের চিরাচরিত অভ্যাস। তদন্ত কর্মকর্তারা সেটিই করেছে।

‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শিরোনামে গত ২৮ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রতিবেদন ছাপা হয় । সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল আবু সালেক ও তাঁর সহযোগীরা। কিন্তু দুদক সালেকের স্থলে জাহালমের নামে অভিযোগপত্র দেয়। গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় তিন বছর কারাভোগ করেন জাহালম।

দুদকের কেউই যায়নি জাহালমের বাড়িতে!
জাহালমকে আবু সালেক বলে অভিযোগপত্র দেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলেই। সত্য উদ্‌ঘাটন করে তা আদালতের কাছে জমা দেওয়াই তদন্ত কর্মকর্তাদের কাজ। এই কাজ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর বর্তানোর কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত কর্মকর্তাদের খেয়াল করা উচিত ছিল, ব্যাংক কর্মকর্তা ও হিসাব চিহ্নিতকারীরা আবু সালেককে খুঁজে বের করতে তৎপর হয়নি। তিনটি মামলায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়। এরপর ব্যাংক কর্মকর্তারা বুঝতে পারে, প্রধান আসামি আবু সালেককে খুঁজে বের না করে দিলে তাঁদের (ব্যাংক কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। তখন তাঁরা যেভাবেই হোক আবু সালেককে খুঁজে বের করে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এই কাজটি তদন্ত কর্মকর্তাদের করা উচিত ছিল। অথচ সেই কাজ করতে মাঠে নেমে পড়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা। তাঁরা যেনতেন প্রকারে জাহালমকে আবু সালেক উল্লেখ করে দুদকের সামনে হাজির করে। তাঁকে আবু সালেক রূপে শনাক্তও করে। দুদকের ১২ জন কর্মকর্তা মামলাগুলো তদন্ত করলেও একজন কর্মকর্তাও জাহালমের বাড়ি যায়নি।

জাহালম কারাভোগ নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান আবুল হাসনাত মো. আবদুল ওয়াদুদ প্রতিবেদনে বলেছে, জাহালমের বাড়িতে তিনি গেছেন। বাড়ির দৈন্যদশা এমন যে, যে কোনো ব্যক্তির সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক, ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতে জড়িত ব্যক্তির বাড়ির এমন দৈন্যদশা কেন? তদন্ত কর্মকর্তারা যদি জাহালমের বাড়ি যেত, তাহলে তাঁদের মনেও সন্দেহ দেখা দিত। দুদকের অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রমের সঠিক ও নিবিড় তদারকি ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় তদারকের কাজ দায়সারাভাবে চলে আসছে। নতুন কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব ছিল। কাজের যথাযথ তদারকি ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে এ ধরনের ত্রুটি হয়েছে।

অনুসন্ধানের ত্রুটি
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনালী ব্যাংকের ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শাখায় হিসাব খোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারক চক্র আরও ১৮ টি ব্যাংকে বেসরকারি হিসাব খোলে। জালিয়াতির মাধ্যমে (ভুয়া ক্লিয়ারিং ভাউচার) সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা তুলে নেয়। এই অভিযোগর সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রের পরিমাণ বিপুল। এমন অভিযোগের অনুসন্ধান দল গঠন না করে একজন মাত্র অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। অনুসন্ধান কর্মকর্তা একটি মামলায় স্থির না থেকে কেন ৩৩টি মামলা করার সুপারিশ করে, তা অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। অনুসন্ধান কর্মকর্তা বলেছিলেন, একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা আইন সম্মত নয়। কিন্তু আইন সম্মত নয়, এমন কাজটি তিনি কেন করলেন, তা অনুসন্ধান প্রতিবেদনে থাকা উচিত ছিল। একটি মামলার পরিবর্তে ৩৩ টি মামলা করার বিষয়ে আইনগত প্রশ্ন জড়িত ছিল। অথচ অনুসন্ধান কর্মকর্তা বা তদারক কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক কেউ এ বিষয়ে আইন অনুবিভাগের মতামত নেননি। যদি নেওয়া হতো তাহলে এই ভুল এড়ানো সম্ভব হতো। এই ভুলের দায় তদন্ত কর্মকর্তা, তদারক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক এড়াতে পারে না।

হাইকোর্টে দেওয়া দুদকের প্রতিবেদন বলছে, অনুসন্ধান কর্মকর্তা ১৪ মাস ধরে তদন্ত করে। দুদক বিধিমালা ২০০৭ অনুযায়ী তদন্ত করার কথা, কিন্তু অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদক বিধিমালা অনুসরণ করে প্রতিবেদন দেয়নি। সরেজমিন কোনো অনুসন্ধান করে নি । শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন দিয়েছে। এটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। সরেজমিন অনুসন্ধান করলে আবু সালেকের ভুয়া ঠিকানার বিষয়টি উঠে আসত। তদন্ত প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান তদারককারী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফ আলী ফারুকের কোনো অবদান দেখা যায় না।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, তদন্তের সময় জাহালমকে অন্যান্য আসামিদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। জাহালম ইংরেজি লিখতে জানেন না অর্থাৎ পড়ালেখা জানেন না। তাঁর সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যদি নেওয়া হতো, তাহলে তখনই উদ্‌ঘাটিত হতো যে, জাহালম প্রকৃত আসামি নন। ব্যাংক নিয়ম ভঙ্গ করে গ্রাহককে অতিরিক্ত চেক বই সরবরাহ ও লেনদেন পরিচালনা সহায়তাকারী কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করা হয়নি।

দুদক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, টাকা আত্মসাতের ঘটনা ১৮ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু এই টাকা কোথায় গেল, সে ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তারা পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করেননি। এ ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা বা অযোগ্যতা ছিল।

দুদকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মামলার প্রধান আসামি আমিনুল হক। তাঁর দুটি ব্যাংক হিসাবে ৮২ লাখ টাকা পাওয়া যায়। মানিকগঞ্জে ৪ একর ৩ শতক জমির মালিকও তিনি। তাঁর এনজিও ছিল। অর্থাৎ সোনালী ব্যাংকের এই টাকা জালিয়াতির বড় ভাগ তিনি পান। এমন একজন আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমিনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁর কাছ থেকে মামলার সব তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। দুদকের যে ১২ জন তদন্ত কর্মকর্তা সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩ মামলা তদন্ত করে, তাঁরা সবাই নিয়োগ পায় ২০১১ সালে। তাঁদের এ ধরনের জটিল তদন্তকাজে সম্পৃক্ত করা হয়। এ মামলার তদন্তই ছিল তাঁদের জীবনের প্রথম তদন্ত।কীভাবে এই ভুল
দুদকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আবু সালেকের শনাক্তকারীদের একজন হলে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তা ফয়সাল কায়েস। তদন্ত কর্মকর্তা সেলিনা আখতার ব্যাংক কর্মকর্তা ফয়সাল কায়েসকে চাপ দেন আবু সালেককে খুঁজে বের করার জন্য। সালেকের সন্ধানে কায়েস প্রথমে যান রাজধানীর শ্যামলীর ঠিকানায় (সালেক যে ঠিকানা ব্যাংক হিসেবে দেন)। সালেকের ছবি দেখে সেখানকার একজন কেয়ারটেকার জানান, ছবির লোক অনেক আগে চলে গেছে। এখানে কেউ থাকে না। ছবির লোকটি টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত। এরপর ফয়সাল কায়েস যান টাঙ্গাইলের নাগরপুরের গুণিপাড়া গ্রামে। সেখানে স্থানীয় বাজারের কয়েকজন লোক ছবি দেখে তাঁকে জাহালম ওরফে জানে আলম বলে শনাক্ত করে। জাহালম নরসিংদীর ঘোড়াশালের জুটমিলে চাকরি করেন বলে জানতে পারে। এরপর জাহালমের ভাই শাহানূরের স্থানীয় দোকানে যান। সেখান থেকে জাহালমের ঘোড়াশালের ঠিকানা নেয়। কায়েস তাঁর ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তা ও দুদক কর্মকর্তাদের নিয়ে যান ঘোড়াশালের জাহালমের মিলে। সেখানেই জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই তথ্য তিনি জানান তদন্ত কর্মকর্তা সেলিনা আখতারকে। পরে জাহালমকে দুদকে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। জাহালম দুদক কার্যালয়ে আসেন। ব্যাংক হিসাবের জন্য আবু সালেককে শনাক্তকারী, অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের মুখোমুখি করা হয় জাহালমকে। জাহালমকে সামনাসামনি দেখে ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস, ব্র্যাক ব্যাংকের সাবিনা শারমিন, শনাক্তকারী সহিদুল ইসলাম, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা নূর উদ্দিন শেখ, শনাক্তকারী সাকিল ও ইউসিবিএল কর্মকর্তা তাজবিন সুলতানা। সবাই সেদিন জাহালমকেই আবু সালেক বলে শনাক্ত করে। এরপর তদন্ত কর্মকর্তারা আবু সালেকের পরিবর্তে জাহালমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

সূত্র: প্রথম আলো

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন