বন্যায় ফসল হারিয়ে কৃষকরা পেরেশান!

0
186

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের হিসাবে, উজানের ঢল আর বৃষ্টিতে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অন্তত ৪২৪টি গ্রাম পানির নিচে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ছয় লাখ মানুষ। ১৫ দিন ধরে ফসলি জমিতে পানি। এবারে বন্যার কারণে অন্তত ১৪ হাজার হেক্টর আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে রোপা-আউশ ধানের তিন হাজার, পাটের সাড়ে ছয় হাজার, সবজি পৌনে দুই হাজার ও পৌনে তিন হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা ডুবেছে। এতে জেলার কৃষকদের অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ওপরে ক্ষতি হয়েছে।
গাইবান্ধা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ঘাঘট নদ। প্রায় সাত কিলোমিটার পূর্বে তিস্তা নদী। তিস্তার পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র। গাইবান্ধার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘাঘট কিংবা তিস্তার বাঁধ না ভাঙলে গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়িতে (বেশির ভাগ ইউনয়ন) বন্যা হওয়ার কথা নয়। স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, গত ১০০ বছরের গাইবান্ধায় এত বড় বন্যা হয়নি।
কিন্তু এবার গাইবান্ধায় বাঁধ ভেঙে কৃষিনির্ভর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় পানি নামতে বা শুকাতে কয়েক মাস লাগবে। এই বন্যা কৃষিতে বড় রকমের সংকট সৃষ্টি করবে।
কৃষিজমি, ঘরবাড়ি সব পানির নিচে। কারও বাড়িতে একবুক পানি। কারও আঙিনা দিয়ে এখনো স্রোত বইছে। কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবনেই হাঁটুপানি। কেতকিহাটের চারপাশের গ্রাম এখনো পানির মধ্যে। একই ইউনিয়নের বালাসীঘাট এলাকার বসতবাড়িগুলোতেও পানি। মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সড়কের ওপর।
ফুলছড়ির উদাখালী ইউনিয়নের ইনছার আলী বলেন, হঠাৎ বন্যায় সব ভেসে গেছে। বন্যাটা এমন ছিল যে জীবন বাঁচানোটাই দায় হয়ে পড়েছিল। ধান-চাল সব ঘরের মধ্যে, ঘরে বুকসমান পানি। সব পচে শেষ। পানি পুরোপুরি নামতে কয়েক মাস লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছিলেন প্রান্তিক কৃষক আয়নাল হক। তিনি বলেন, ‘বিছনের (বীজ) কাচলাগুলো সব নষ্ট হয়্যা গেল বাহে। বন্যা পানিত খ্যায়া গেছে। ওয়া (আমন) গাড়মু (রোপণ করা) ক্যাংকা করিয়া। আমন ধান এবার আর গাড়বার পারি না। ট্যাকা-পয়সাও নাই যে বিছন কিনিয়া আনিয়া ওয়া গাড়মু।’

ফুলছড়ির উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুরের অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ওয়াপদা বাঁধে। রতনপুর চরের কৃষক ফেরদৌস আলী বলেন, বন্যার পানিতে তাঁর পাট ও ভুট্টার খেত ডুবে গেছে। এখন পানি কমলেও ফসল সব পচে গেছে। তাঁরা সরকারি সহায়তা কামনা করেন।

অথচ কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছে, এই মুহূর্তে বন্যায় তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। গত সোমবার সচিবালয়ে চাল রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সে এ কথা বলেছে।(ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম)

অথচ প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জানা যায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবর্ষণে যমুনা নদীর পানি এখন বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার ঢলে তলিয়ে গেছে অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির পাটসহ আবাদি ফসল।

উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুল করিম বলেছে, প্রতিদিনই যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে চরাঞ্চলে খেতের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি অবনতি ঘটেছে সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল এবং দুর্গম চরে। দুর্ভোগে পড়েছে চর এলাকার হাজার হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি। তলিয়ে গেছে পাট, ধানসহ বহু ফসল।

বগুড়া জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আজ পর্যন্ত জেলার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ৯৯ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে দুর্গত এলাকার ১৭ হাজার ৫০০ পরিবারের ৬৮ হাজার ৫০০ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। বন্যায় প্রায় ৪০০ বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি যত বাড়ছে, পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ তত বাড়ছে। তলিয়ে গেছে পাট, ধানসহ বহু ফসল।

আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে দেশের ২০ জেলায় বন্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। দেশের চারটি নদী অববাহিকায় একযোগে পানি বাড়তে পারে। এতে আগামী এক সপ্তাহ টানা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
রোববার দেশের ১৬টি জেলায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। বেশির ভাগ নদ-নদীর পানি বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯৩টি পয়েন্টের মধ্যে ৭৩টি পয়েন্টে পানি বাড়ছে, এর মধ্যে ২৫টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এসব নদীর পানি প্রতিদিন তিন থেকে চার ইঞ্চি বাড়ছে। মানুষের বসবাসের ঘরের ভেতর বুকপানি। পানিতে থইথই করছে উঠান, বারান্দা। আঙিনায় বইছে স্রোত। পানিতে ভিজে গেছে চাল-ডাল, বিছানা-বালিশ।
এমনিভাবে, হাটবাড়িচরের চারদিকে যমুনা নদী। অনেকটা দ্বীপের মতো এই চর। পূর্বে জামালপুর জেলা। উত্তরে গাইবান্ধা। বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দুরে যমুনা নদীবেষ্টিত এই চরে বসবাস প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের। ৪০০ পরিবারের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকা চলে যমুনায় মাছ ধরে। অন্তত দুই বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই চরের অধিকাংশ বসতঘর এখন যমুনার পানিতে তলিয়ে গেছে বুকসমান পানির নিচে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছে নৌকায়, টিনের চাল আর বাঁশের উঁচু মাচায়। চরের কোথাও শুকনো জায়গা নেই। নারীরা ছোট ছোট শিশুকে নিয়ে নৌকায়, মাচায় আশ্রয় নিয়েছেন। বাড়িতে রান্না করার মতো অবস্থা নেই, ভাত রান্না করার অভাবে খাওয়া হচ্ছে না। খাওয়ার পানিও নেই।
তলিয়ে গেছে নলকূপ। নদীর পানি খেয়ে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে বানভাসিরা।( প্রথম আলো)

গাইবান্ধায় বাগুড়িয়া বাঁধ ভেঙে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি, ডুবে গেছে ৩০০ হেক্টর জমির ফসল। বন্যার প্রভাবে কুড়িগামে ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি, কুড়িগ্রামের উলিপুরে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি আর ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধির কারণে ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ২০টি গ্রাম প্লাবিত, ভাঙন ধরেছে ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধে। টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পানিবন্দি হাজারো মানুষ। (ইত্তেফাক)
বর্তমানে বন্যায় বিভিন্ন জেলায় জনগণ তাঁদের সহায় সম্ভল হারিয়ে পানি বন্দী ত্রাণহীর মানবেতর জীবন যাপন করছে। কৃষকরা তাঁদের কষ্টের সম্ভল আবাদী ফসল হারিয়ে পেরেশান। এ অবস্থায় মন্ত্রীর এমন মন্তব্য যেন, কৃষকদের কাঁটা গায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন