‘কাশ্মীর এখন বিশাল উন্মুক্ত কারাগার’ বিশ্বকে উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে ভারত!

0
644
Indian security personnel walk on a street in Srinagar on August 9, 2019, as widespread restrictions on movement and a telecommunications blackout remained in place after the Indian government stripped Jammu and Kashmir of its autonomy. - Indian forces went on high alert across Kashmir to head off protests after Friday prayers in mosques as tensions remained high over the ending of the disputed region's autonomy, residents and reports said. (Photo by STR / AFP)

কী হচ্ছে কাশ্মীরে? কী চলছে সেখানকার নিরীহ জনসাধারণের ওপর? কেন সেখানে কারফিউ? কেন দিনের পর দিন ইন্টারনেট বন্ধ? কেন লাখ লাখ সেনা-পুলিশ-আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছে গোটা উপত্যকা? কেন সেখানে সাংবাদিকদেরও ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না? কেন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বন্ধ?

কাশ্মীর ঘিরে সাম্প্রতিক বিশ্বের এই এত এত প্রশ্নের আসল উত্তর কী? কী করছে সেখানে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদি সরকার? কী সেই দুরভিসন্ধি যা আড়াল করতে এত বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন? উত্তপ্ত কাশ্মীরে এখন এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে কাশ্মীর তথা গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ।

কাশ্মীরের নেতৃস্থানীয় সব নেতাকর্মীকেই কারাগারে ঢুকিয়েছে মোদি সরকার। পুরো উপত্যকায় গিজগিজ করছে লাখ লাখ সেনা-পুলিশ। মোড়ে মোড়ে শত শত চেকপোস্ট। টানা চার দিন ধরে চলছে অঘোষিত কারফিউ।

এর ভেতরেই ফুঁসছে সেখানকার জনসাধারণ। ভারতের সরাসরি শাসন মানতে নারাজ ‘বিশেষ মর্যাদা’ হারানো এই উপত্যকা। পরিস্থিতি ধামাচাপা দিতে ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার অধিকার। গলাচিপে ধরা হচ্ছে মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠ। চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ করতে বাধা দেয়া হচ্ছে। সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে সোমবার থেকে কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগরভিত্তিক অধিকাংশ ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে না। এ ঘটনায় হতাশ সাংবাদিকরা পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ আখ্যা দিয়েছেন।

গত সোমবার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। এদিকে জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে একটি বিলও পাস করা হয়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটির চেহারা এখন বদলে যাবে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হওয়ায় ভারতীয়রা এখন অঞ্চলটিতে জায়গা কিনতে পারবে ও সরকারি চাকরি করতে পারবে। যা আগে সম্ভব ছিল না। মিডিয়ার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। জারি করা হয়েছে কারফিউ। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট-মোবাইল পরিষেবা। বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতিতে গত সোমবার থেকে কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগরভিত্তিক অধিকাংশ ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে না।

প্রতিবেদক মাতিন (ছদ্মনাম) বলেন, আমি সেখানকার ঐতিহাসিক ক্লোক টাওয়ারের একটি ভিডিও ধারণ করতে বিখ্যাত লালচক থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে যেতে সক্ষম হই। তবে কনসার্টিনা তার (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল সেনারা। কাশ্মীরের বাইরের সংবাদমাধ্যমে কাজ করা স্থানীয় প্রতিনিধিরা ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে তাদের প্রতিবেদন ও ছবি পাঠিয়েছেন। অন্য সাংবাদিকরা নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ির বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তাদের কাজ বাধা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে এক সপ্তাহ আগে কাশ্মীর পৌঁছেছেন এক বিদেশি সাংবাদিক। শনিবার পুলিশ শ্রীনগর তার হোটেলে গিয়ে সেই মুহূর্তেই এলাকা ত্যাগ করতে বলেছে। তিনি বলেন, আমার এখানে অবস্থানের বিষয় পূর্বনির্ধারিত ছিল।

তবে জোরপূর্বক টিকিট কেটে রোববার সকালে আমাকে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে তারা। স্থানীয় সংবাদ সংস্থায় কাজ করা সাংবাদিক সান্না এরশাদ মাত্তো বলেন, পরিস্থিতি দেখতে ও সংবাদ করতে গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে বের হয়েছি। বিভিন্ন চেকপোস্টে আমাকে বাধা দেয়া হয়েছে।

মাত্তো বলেন, সাংবাদিকদের তাদের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সরকার। আমরা অসহায়, এমনকি আমরা জানি না সেখানে কী ঘটছে। স্থানীয়দের জন্য এটা আরও খারাপ পরিস্থিতি। আমরা জানি না সেখানকার মানুষদের হত্যা করা বা বন্দি করা হচ্ছে কি না।

মুসলিম–অধ্যুষিত কাশ্মীর ভ্যালির একজন বললেন, নিরাপত্তা বাহিনীর এমন ভয়ের মধ্যে তিনি আর জীবন কাটাতে চান না। ৩০ বছর ধরে এখানে স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহীরা লড়াই করছে। তবে দিল্লির শাসকদের ‘স্বৈরাচারী নির্দেশের’ পর থেকে বাসিন্দারা নতুন করে ভাবছেন। নতুন ঘোষণা ভারত ও কাশ্মীরের জন্য খারাপ পরিণতি ডেকে আনবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

কাশ্মীরের পুরো অঞ্চলজুড়েই এখন ভয়, আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। জম্মু ও কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর গত সোমবার থেকে ভুতুড়ে নগরে পরিণত হয়েছে। দোকানপাট, স্কুল, কলেজ, অফিস সব বন্ধ। রাস্তাঘাটে কোনো গণপরিবহন চলছে না।

সড়কজুড়ে টহল দিয়ে বেড়ায় সশস্ত্র হাজার হাজার সেনা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। বাসিন্দারা বাড়িতে অবরুদ্ধ। প্রায় এক সপ্তাহের অবরুদ্ধ সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। রাজ্যের এক মন্ত্রীকে গৃহবন্দী রাখা হয়েছে। শত শত কর্মী, ব্যবসায়ী ও অধ্যাপককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের অস্থায়ী কারাগারে রাখা হয়েছে।

রেজওয়ান মালিক নামের একজন কাশ্মীরি বললেন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে ঘোষণা দেওয়ার দুদিনের মধ্যে তিনি দিল্লি থেকে শ্রীনগরে আসেন। শ্রীনগরে তাঁর পরিবার রয়েছে। ওই দুদিন তিনি পরিবারের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরকে এখন মনে হচ্ছে একটি কারাগার, বিশাল উন্মুক্ত কারাগার।’
রেজওয়ানের মতে, কারফিউ তুলে নিলে এবং বিক্ষোভকারীরা যদি রাস্তায় নামতে সক্ষম হয়, তাহলে তাতে প্রত্যেক কাশ্মীরি যোগ দেবেন।

বিশ্বকে উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে ভারত!
শহরটিতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত তথ্য পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। মানুষের মুখে মুখে কথা ছড়াচ্ছে অনেক বেশি। প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হচ্ছে। শ্রীনগরসহ অন্য স্থানগুলোয় সেনাদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ছে। শোনা গেছে, সেনাদের ধাওয়া খেয়ে এক বিক্ষোভকারী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছেন। অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তবে ভারতের ‍হিন্দুত্ববাদী সরকার কাশ্মীর পরিস্থিতি একদম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দেখানোর চেষ্টা করছে। গত বুধবার টিভিতে দেখানো হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল কাশ্মীর ভ্যালির দক্ষিণে শোপিয়ান শহরে রাস্তায় বসে কিছু মানুষের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। এলাকাটিকে ভারত ‘স্বাধীনতাকামীদের আখড়া’ বলে থাকে। ভারত বিশ্বকে দেখানোর চেষ্টা করল, কট্টর এই এলাকার মানুষও সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে রয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।

এটাকে লোকদেখানো বলছেন কাশ্মীরিরা। তাঁদের মতে, লোকজন যদি খুশিই হতো, তাহলে কেন কারফিউ? কেন এভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা?

পুলাওয়ামার একজন আইনজীবী জাহিদ হুসেন দার বলেন, কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ হয়ে আছে। অবরোধ উঠলেই সংকট শুরু হবে। রাজনীতিক ও পৃথক কাশ্মীরের দাবিতে আন্দোলনকারী নেতারা বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলে তাঁরা বিক্ষোভের ডাক দেবেন। আর তখন সব লোক রাস্তায় নেমে আসবে।

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে বড় ধরনের বিক্ষোভ না হওয়ার ঘটনাকে ভারতীয় অনেক গণমাধ্যম বলছে, কাশ্মীরিরা সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু যাঁরা কাশ্মীরকে চেনেন, যাঁরা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের লড়াই দেখেছেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন, এ কাশ্মীর এখন অন্য রকম। কাশ্মীরিদের মধ্যে এখন যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে, তা নজিরবিহীন।

এক শিক্ষার্থী পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন ‘ঝড় ওঠার আগে শান্ত’ পরিস্থিতি হিসেবে। তাঁর ভাষ্য, ‘সমুদ্র এখন শান্ত মনে হচ্ছে, কিন্তু সুনামি তীরে আঘাত হানতে যাচ্ছে বলে।’

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, স্বদেশ বার্তা

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন