যানবাহন চলাচলে লাগামহীন চাঁদাবাজি, বন্ধের নেই কোন উদ্যোগ

0
172

জনগণের সেবা করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হল সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ। ভোটের আগে পাহাড়সম প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালালেও, ক্ষমতায় যাবার পর পরই সেই কথিত প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়াটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব নিলেও, মানুষের দুর্ভোগে সরকারের পদক্ষেপ প্রতিনিয়তই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, অবস্থার কোন উন্নতি দেখা যায় না। জনগণ শুধু ক্ষমতার পালাবদলই দেখছে, দেখছে না তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন। পরিবহন চলাচলে লাগামহীন চাঁদাবাজি তারই একটি নমুনা। এক্ষেত্রে ২৪ শে আগস্ট ২০১৯ প্রথম আলোর একটি রিপোর্ট দেখা যাক:

মহাসড়কে দূরপাল্লার যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তিন চাকার যান। অথচ এসব তিন চাকার যান মহাসড়কে নিষিদ্ধ।  সড়কে বিশৃঙ্খলার পেছনে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বড় কারণ। কিন্তু এ খাতে কীভাবে চাঁদাবাজি হয় এবং তা বন্ধের বিষয়টি স্থান পায়নি সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশে। এমনকি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির শাস্তি কিংবা ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়ন নিয়েও কোনো সুপারিশ নেই। সড়ক মন্ত্রণালয়ে দেওয়া ১১১ দফা সুপারিশের প্রায় সব কটিই পুরোনো। এগুলো মোটরযান আইনেও আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে সরকারের মনোযোগ না থাকায় সুপারিশের স্তূপ জমছে।

সড়কে শৃঙ্খলা আনা এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভায় শাজাহান খানের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের কমিটি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার কমিটি চূড়ান্ত সুপারিশের কপি সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভাপতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের হাতে তুলে দেয়। এ সময় সড়কমন্ত্রী জানিয়েছে, সুপারিশ বাস্তবায়নে টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।

অবশ্য এর আগেও সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি কমিটি করেছিল। সেই কমিটি ২০১২ সালে ৮৬ দফা সুপারিশ দিলেও বাস্তবায়নে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালে ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক শেখ মাহবুব ই রব্বানীর নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি ৬টি সুপারিশ ও ২২টি পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল।
এগুলোও বাস্তবায়ন হয়নি।

পরিবহন খাতে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়। আর হাইওয়ে পুলিশের প্রতিবেদনে এসেছে, শুধু মহাসড়কে চলাচলকারী ৫৮ হাজার ৭১৯টি যানবাহন থেকে বছরে ৮৭ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে।

সড়কে বিশৃঙ্খলার পেছনে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়। আর সড়কে প্রাণহানির পেছনে দায়ী চালকের বেপরোয়া গতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত পরশু শুক্রবার শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলে, তাদের দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন করার জন্য পাঁচ-সাতটা মন্ত্রণালয়ের দরকার পড়বে। তাই একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ করার সুপারিশ করেছে। কর্তৃপক্ষ এক বছর আন্তরিকভাবে কাজ করলে সুফল পাওয়া যাবে। চাঁদাবাজির বিষয়টি সুপারিশে না আনার বিষয়ে সে বলে, এটা ভিন্ন সমস্যা। এর সঙ্গে মালিক-শ্রমিক, পুলিশ, স্থানীয় রাজনীতি—নানা কিছু আছে। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। এটা ভিন্নভাবে আরেকটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

সড়ক আইনের বিষয়টি সম্পর্কে শাজাহান খান বলে, আইনটি নিয়ে তিন মন্ত্রী কাজ করছে। শিগগিরই হয়ে যাবে। এ জন্য এটা সুপারিশে এড়িয়ে গেছে।

পরিবহনে চাঁদাবাজির নানা পদ্ধতি

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিবহন খাতে তিন পদ্ধতিতে চাঁদা তোলা হয়। এগুলো হচ্ছে: ১. দৈনিক মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা, ২. বাস-মিনিবাস নির্দিষ্ট পথে নামানোর জন্য মালিক সমিতির চাঁদা এবং ৩. রাজধানী ও এর আশপাশে কোম্পানির অধীনে বাস চালাতে দৈনিক ওয়েবিল বা গেট পাস (জিপি) চাঁদা।

বর্তমানে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নামে প্রতিদিন প্রতিটি বাস-ট্রাক থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলা হয় ৭০ টাকা করে। সারা দেশের প্রায় পৌনে তিন লাখ বাস, মিনিবাস ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান থেকে দিনে প্রায় দুই কোটি টাকা চাঁদা ওঠে।

এর বাইরে ঢাকাসহ সারা দেশে বাস নামানোর আগেই মালিক সমিতির সদস্য পদ নিতে হয়। এর জন্য ২ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। অর্থাৎ বিআরটিএ থেকে বাস নামানোর অনুমতির আগেই মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে মালিক সমিতির সদস্য হতে হয়। বিআরটিএ সূত্র বলছে, এ জন্য সারা দেশে বাস-মিনিবাসের অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ পুরোনো, জীর্ণশীর্ণ। নতুন বাস-ট্রাক নামাতে পারেন না মালিকেরা। শাজাহান খানের নেতৃত্বে কমিটি পুরোনো বাস-মিনিবাস ও ট্রাকের পরিবর্তে নতুন বাস নামানোর সুপারিশ করেছে।

ঢাকা ও এর আশপাশে প্রায় সব বাসই চলে নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে। সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতারা প্রথমে একটি কোম্পানি খোলে। এর মধ্যে বিভিন্ন মালিকেরা বাস চালাতে দেয়। বিনিময়ে বাসপ্রতি ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। প্রতিদিন চাঁদা ওঠে প্রায় এক কোটি টাকা। ঢাকায় বাস চলে প্রায় আট হাজার।

বিপুল পরিমাণ চাঁদা দেওয়ায় বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে মালিকেরা তাঁদের বাস চুক্তিতে চালক ও চালকের সহকারীর হাতে ছেড়ে দেন। এ জন্য চালকেরা বাড়তি যাত্রী, বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে রাস্তায় পাল্লাপাল্লিতে লিপ্ত হন। এটাকে পরিবহন খাতের শৃঙ্খলার পথে বড় বাধা এবং সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মনে করা হয়।

এসকল বিষয় দেখতে দেখতে জনগণ আজ ক্লান্ত। রাজনীতিবিদদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে এগুলো তারা আর বিশ্বাস করে না। বিশেষক্ষেত্রে সামান্য কোন উন্নয়ন দেখা দিলেও সন্দেহ থেকে যায় অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ে। তাই তারা আসায় বুক বাঁধছে নতুন কোন কিছুর যা তাদেরকে এসকল বিষয় থেকে পরিত্রাণ দিবে।

 

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন