প্রতিনিয়ত বাড়ছে ধর্ষণ আর ‘হিংস্র’ খুন, কোথায় চলছি আমরা?

2
389

► এক মাসে দেশে গলা কেটে খুন শতাধিক
► ধর্ষণ দিনে এক ডজনের মতো
► দ্রুত বিচার ও সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর

গণমাধ্যমে রোজকার সংবাদ হয়ে উঠেছে ধর্ষণ, এমনকি দলবদ্ধ ধর্ষণ। আগের সব পরিসংখ্যান ছাপিয়ে প্রতিদিন হচ্ছে ধর্ষণ।

বেড়েছে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও। গত এক মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে গলা কেটে খুন করার শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন এক ডজন ধর্ষণের অভিযোগের তথ্য মিলেছে। সবচেয়ে বেশি যৌন পীড়নের শিকার হচ্ছে শিশু ও কিশোরীরা।

অপরাধ ও সমাজতত্ত্ববিদরা বলছে, বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব, মনোসামাজিক অসুস্থতা এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতার কারণে ঘটছে ‘হিংস্র’ হত্যা আর ধর্ষণ। এর প্রতিকারে দ্রুত বিচারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছে তাঁরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা এর মতে, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাবে ‘নির্মম’ খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ বাড়ছে।

পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত অস্থিরতা দূর করতে হবে। পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক এর মতে, ‘নৃশংস’ হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা আগেও ঘটেছে; তবে এখন যে নিষ্ঠুরতা বা নতুন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। ভিন্ন দেশের সংস্কৃতির প্রভাবের সঙ্গে অপরাধ করে পার পাওয়ার সংস্কৃতি একটি বড় বিষয়। উচ্চ আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন করে ছয় মাসের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বাড়াতে সরকারের কার্যক্রম গ্রহণ করাও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছে, ‘দু-একটি নির্মম ঘটনা ঘটে, যা সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সার্বিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। সব স্থানকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং পুলিশ ফোর্স বাড়ানোর ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে আমরা সচেতনতার কাজও করছি। ’

গত ২৬ আগস্ট রাতে রাজধানীর শান্তিনগরে ফ্লাইওভারের ওপর মোটরসাইকেলচালক মিলনকে একটি মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের জন্য নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ২৭ আগস্ট যশোরের সাতমাইল এলাকায় হাসানুজ্জামান নামের এক গাড়িচালকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ১৮ আগস্ট পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় এনে ধর্ষণের পর কমলাপুরে ট্রেনের পরিত্যক্ত বগিতে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় মাদরাসার ছাত্রী আসমা আক্তারকে। গ্রেপ্তারের পর তার কথিত প্রেমিক বাঁধন জবানবন্দিতে বলেছে, ধর্ষণের কারণে কান্নাকাটি করেছিল আসমা। এ কারণে তাকে হত্যা করে সে। নেত্রকোনার পূর্বধলায় কলেজছাত্রী ইয়াসমিন আক্তারকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে ধর্ষণ করে আলমগীর নামের এক দুর্বৃত্ত। ওই পাশবিকতায় গত ২৫ আগস্ট হাসপাতালে ওই ছাত্রীর মৃত্যু হয়। গত ৫ আগস্ট নাটোরের সিংড়ায় রেশমি খাতুন নামের এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে তার চাচা শাহাদাৎ। গত ১৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার গাংধোয়ার চর গ্রামে নানার বাড়ি বেড়াতে গেলে নবম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ পাওয়া যায়।

আইনের রক্ষক পুলিশের বিরুদ্ধেও উঠেছে আলোচিত ধর্ষণের অভিযোগ। খুলনার জিআরপি থানার ভেতরে এক তরুণীকে গণধর্ষণের অভিযোগে থানার ওসি ওসমান গনি পাঠানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ৪ আগস্ট ধর্ষিতা আদালতে মামলা করে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্যাতনসংক্রান্ত প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১১টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ১১টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) গত আড়াই বছরে ৩৮ হাজার ১২৪ জন নারী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪২৮ জনই যৌন পীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতেই চিকিৎসা নিয়েছে তিন হাজার ৬০১ জন নারী ও শিশু। সেখানকার তত্ত্বাবধায়ক বিলকিস বেগম বলেছে, ‘অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এখানে চিকিৎসার আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। ধর্ষণ বাড়ছে কি না, সেটা বলা যাবে না, তবে ধর্ষণের সঙ্গে নির্যাতনের আলামত পাচ্ছি আমরা। ’

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছে ৪৯৬ জন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, চলতি বছরের ছয় মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয়েছে ২৬ শিশুর। ২০১৮ সালে পুরো বছরে ৩৫৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এর মধ্যে মারা যায় ২২ জন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭৩২টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬৩ জনকে। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে তিন নারীকে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২০৩টি। শিশু

ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮১টি। গত জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৯১টি। এ সংখ্যা আগের এক বছরের চেয়েও বেশি। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৬ জনকে। চেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে একজনকে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৮৪টি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩২৩টি। ২০১৭ সালে ধর্ষণের মোট সংখ্যা ছিল ৮১৮ এবং ২০১৬ সালে ৭২৪টি।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বেড়েছে কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ। এ বছর এই পরিসংখ্যান আরো অনেক বেড়ে যাবে।

অপরাধ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে এক হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। হালনাগাদ তথ্য আগে পুলিশের ওয়েবসাইটে থাকলেও এখন নেই। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বলেছে, ‘আপডেট করা হয়নি। কাজ চলছে। ’

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

2 মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন