কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন বহু কাশ্মীরি, আহাজারি সাধারণ মুসলিমদের।

0
330

গত ৫ আগস্ট ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ ও স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয় সন্ত্রাসী ভারত সরকার। বিষয়টির প্রতিবাদে লাখো কাশ্মীরি রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের গেরুয়া সন্ত্রাসী ভারত প্রশাসনের কড়া হস্তক্ষেপে তা আর সফল হয়নি।

সেদিন থেকেই ১৪৪ ধারা জারিসহ কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বিশ্ব থেকে। ধরপাকড় করা হয় স্বাধীনচেতা, মুক্তিকামী, আন্দোলনকর্মী, বিক্ষোভকারীদের। এ ছাড়া স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।

বিবিসি বাংলার বরাতে জানা যায় কাশ্মীরে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সেই বিক্ষোভে আটকদের অনেককে এখনও ফিরে পায়নি তাদের পরিবার।

এ বন্দিদের অনেককে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। যে কারণে পরিবারের সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ নেই তাদের।

সম্প্রতি সাংবাদিক ভিনিত খারে উত্তরপ্রদেশের এমনই একটি কারাগার পরিদর্শন করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

যানা গেছে, কাশ্মীর থেকে ৭০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আগ্রা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন বেশ কয়েকজন কাশ্মীরি।

আগ্রার সেই কারাগারে ৮০ জনেরও বেশি কাশ্মীরিকে বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে এক সাংবাদিককে জানিয়েছে কারাগারের এক কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘আগ্রা কারাগারে চরম দুর্ভোগে আছেন এসব বন্দি কাশ্মীরি। কারণ কাশ্মীর উপত্যকা থেকে আসা এসব বন্দির আগ্রার প্রচণ্ড গরম ও ধুলোবালিময় আবহাওয়া মোটেই সহনীয় নয়। কাশ্মীরে যেখানে সেপ্টেম্বর মাসের তাপমাত্রা ১৮ সেন্টিগ্রেডের নিচে থাকে, সেখানে আগ্রায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। এমন গরম কাশ্মীরিদের ধৈর্যসীমা ছাড়িয়ে নিচ্ছে।’

শুক্রবার আগ্রার কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্ধ গেটের বাইরে একটি বিশাল ওয়েটিং এই গরম উপেক্ষা করে বেশ কিছু কাশ্মীরিকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

সবাই কারাদণ্ড পাওয়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন বলে সাংবাদিককে জানান।

সংবাদদাতা ভিনিত খারে বলেন, কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা আগ্রা কেন্দ্রীয় কারাগারটি ভীষণ গরম আর দুর্গন্ধে ভরা। ওয়েটিং হলে বসেই টয়লেটের দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এই দুর্গন্ধের কারণে বন্দি সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করাও বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল তাদের। সবাই নাকে-মুখে কাপড় দিয়ে বসেছিলেন আর ঘাম মুছছিলেন।’

ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন এক কাশ্মীরি। কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পুলওয়ামা শহর থেকে এসেছেন তিনি।

আগ্রা কারাগারে তার ভাইকে আনা হয়েছে সে খবর জানলেন কীভাবে? এ প্রশ্নে সেই কাশ্মীরি বলেন, ৪ আগস্টের রাতে ভারতীয় সন্ত্রাসী বাহিনী আমার ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কাশ্মীরের আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্রতা ছিল না।

সন্ত্রাসী পুলিশ বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছুড়েছিলেন আমার ভাই। তিনি একজন সাধারণ গাড়িচালক।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় এক মাস ধরে আমরা জানতামই না যে আমার ভাইকে কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। ভাইয়ের খোঁজ জানতে আমি সন্ত্রাসী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার দেখা করেছি। অনেক খোঁজখবরের পর তারা জানায়, আমার ভাইকে শ্রীনগরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

কিন্তু শ্রীনগরে গিয়েও ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি বলে জানান তিনি।

এর পর অনেক চেষ্টা করার পর ভাইকে আগ্রায় আনা হয়েছে বলে জানতে পারেন তিনি।

জানার পর পরই ২৮ আগস্ট আগ্রায় পৌঁছলে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, ‘বিষয়টি প্রমাণ করতে কাশ্মীরের স্থানীয় পুলিশের কাছ থেকে একটি ভ্যারিফিকেশন লেটার আনতে হবে। সেই চিঠি আনতে আবারও পুলওয়ামায় যান তিনি এবং আজ চিঠিটি নিয়ে আগ্রায়ে ফিরেছেন।’

এখন শুধু ভাইকে একনজর দেখার অপেক্ষায়।

আপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আগ্রার এই গরমে মনে হচ্ছে আমিই মরে যাব। আর কারাগারের ভেতরে ভাই আমার কেমন আছেন আল্লাহ জানেন।’

সাক্ষাৎকালে সাংবাদিক তার নাম জিজ্ঞেস করলে স্মিত হাসি দিয়ে সেই কাশ্মীরি বলেন, ‘আমাদের কারও নাম জিজ্ঞেস করবেন না। আমরা তা হলে ঝামেলায় পড়ে যাব।’

কাশ্মীরের কুলগাম শহর থেকে ছেলে এবং ভাগ্নের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন দিনমজুর শ্রমিক আবদুল ঘানি।

তবে কোনো ভেরিফিকেশন লেটার আনতে পারেননি বলে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তিনি।’

তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে-পায়ে ধরে জানতে পেরেছি আমার ছেলে ও ভাগ্নে এখানে বন্দি। তাই ১০ হাজার রুপি খরচ করে এখানে এসেছি। এখন সেই চিঠি না হলে ওরা দেখা করতে দেবে না ভেবে আমি উদ্বিগ্ন।’

কী কারণে তার ছেলে ও ভাগ্নেকে আটক করা হয়েছে সে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রাত ২টার দিকে ঘুমের মধ্যে তাদের তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীর সদস্যরা। কেন তাদের সেদিন তুলে নেয়া হয়েছিল, তার কারণ আজও জানতে পারিনি। তারা কখনই এই বাহিনীর দিকে পাথর নিক্ষেপ করেনি।’

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন