সড়কে চাকা ঘুরলেই চাঁদা, জড়িত পুলিশ বাহিনীও

0
147

বেপরোয়া পরিবহন চাঁদাবাজরা। টার্মিনালভিত্তিক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে অর্থ আদায়। এরা সবাই এক সুতোয় বাঁধা। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি, অসাধু সন্ত্রাসী পুলিশ কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন সন্ত্রাসী আওয়ামীলীগের নেতা।

মাসে নগরীর ৪ টার্মিনাল, বিভিন্ন পয়েন্ট ও সড়ক থেকে আদায় হচ্ছে ৬০ কোটি টাকা। প্রতিদিন আদায় হচ্ছে দুই কোটি টাকা।

গণপরিবহন, অবৈধ লেগুনা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে এ অর্থ। এর ভাগ যাচ্ছে অনেক দূর।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কে গাড়ির চাকা ঘুরলেই গুনতে হয় চাঁদা। মহাখালী, ফুলবাড়িয়া, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক এই সিন্ডিকেট। এ চক্রের হাতে জিম্মি ২০ লক্ষাধিক পরিবহন শ্রমিক।

বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মহাসচিব আলী রেজা যুগান্তরকে বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা কোম্পানি খুলে জিপির (গেট পাস) নামে হরিলুট চালাচ্ছে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে কোম্পানি সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।

এ ছাড়া বন্ধ হবে না। ব্যাঙের ছাতার মতো শ্রমিক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন না দিয়ে সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণেরও আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে আওয়ামী দালাল পেটুয়া বাহিনী পুলিশের নামেও পরিবহন থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন সড়কে লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকেও তোলা হচ্ছে চাঁদা।

জানা গেছে, গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে ৩৪টি কোম্পানির ১ হাজার ৬৮৮টি বাস বিভিন্ন রোডে চলাচল করে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে চলাচল করে সাড়ে তিন হাজার গাড়ি। একইভাবে মহাখালী থেকে আড়াই হাজার, গুলিস্তান থেকে ১২০০, মিরপুর থেকে ৭০০, আজিমপুর থেকে ৫০০, মতিঝিল কমলাপুরে ৪০০, গাবতলী টার্মিনালে ৩ হাজার ২০০, ভাসমান আরও ১ হাজার ৩০০ গাড়ি চলাচল করে। সব মিলিয়ে ১৫ হাজার গাড়ি (গণপরিবহন) চলাচল করে নগরীর বিভিন্ন রোডে।

প্রতিটি গাড়ি থেকে জিপি (গেট পাস) দিনে আদায় করা হয় গড়ে ১ হাজার ১০০ টাকা করে। এ খাতে প্রতিদিন মোট আদায় হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেশি। শুধু জিপি থেকেই মাসে আদায় ৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া মালিক সমিতি, ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি, হরতাল ভাংচুর ভর্তুকি, ইফতার, অফিস ক্রয়, কমিউনিটি পুলিশ, বোবা ফান্ড (কমন ফান্ড) সুপারভাইজার, কাঙালি, লাঠি বাহিনীর নামে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হচ্ছে। মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে গণপরিবহন থেকেই মাসে আদায় ৬০ কোটি টাকা। এ ছাড়া লেগুনা, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে জোর করে টাকা আদায় হচ্ছে।

গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে ৩৪টি কোম্পানির ১ হাজার ৬৮৮টি বাস বিভিন্ন রোডে চলাচল করে। বাসগুলো থেকে গড়ে ১ হাজার ১০০ টাকা হিসাবে জিপি (গেট পাস) আদায় করা হয় দিনে ১৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকার বেশি। এ ছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ৩০ টাকা হারে আদায় হয় দিনে ৫১ হাজার টাকা, মাসে ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের নামে আদায় হয় দিনে ৮৫ হাজার টাকা। মাসে ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

মালিক সমিতির নামে মাসে ৩ কোটি ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ টাকা, ঢাকা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ৪০ লাখ ৫১ হাজার ২০০ টাকা, হরতাল ভাংচুর ভর্তুকির নামে ১০ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা, অফিস ক্রয়ের নামে ১০ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা, কমিউনিটি পুলিশের নামে ১০ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা, কমন ফান্ড বা বোবা ফান্ডের নামে ১ কোটি ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা, সুপারভাইজারদের খাতে আদায় হয় ৩০ লাখ ৩৮ হাজার ৪০০ টাকা। সব মিলিয়ে ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল থেকেই আদায় হয় ১১ কোটি ৩২ লাখ ২৪ হাজার ২০০ টাকা।

একইভাবে টাকা আদায় হয় গাবতলী টার্মিনাল, মহাখালী টার্মিনাল ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে। সায়েদাবাদ টার্মিনালে গাড়িচালক বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের করার আগেই গুনতে হয় জিপির টাকা। তিনি জানান, ৮০০ থেকে শুরু করে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত জিপি আদায় করা হয় বিভিন্ন পরিবহনে।

এনায়েত উল্লাহ বলেন, সড়কে চাঁদাবাজি বলতে কোম্পানির নামে যে জিপি আদায় করা হয় তা মারাত্মক। প্রতিটা বাস থেকে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়।

এদিকে সরেজমিন দেখা গেছে, গুলিস্তান থেকে আবদুল্লাহপুর রোডের এক গাড়ির চালক গুলিস্তানে যাত্রার শুরুতেই ১ হাজার ২৮০ টাকা জিপি দিচ্ছেন।

এই চালক যুগান্তরকে বলেন, ট্রিপ নিয়ে যাওয়া এবং আসার পথেও এভাবেই চাঁদা দিতে হয়। গুলিস্তানের পর প্রেস ক্লাবের সামনে ১০ টাকা, শাহবাগে ১০ টাকা, ফার্মগেটে ৪০ টাকা, মহাখালীতে ১০ টাকা, বনানীতে ১০ টাকা, শ্যাওড়ায় ১০ টাকা, খিলক্ষেতে ১০ টাকা, আবদুল্লাহপুরে ৪০ টাকা চাঁদা দিতে দেখা যায়।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন