ভারতের মুসলিম বিরোধী সিএএ’র বিরুদ্ধে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থলে আতঙ্কে ভুগছে মুসলিমরা

0
167

উত্তর ভারতে গত মাসে নিজের ভাই গুলিতে মারা যাওয়ার পর থেকে আতঙ্কের মধ্যে বাস করছেন মোহাম্মদ ইমরান। মালাউন পুলিশের হাতে আটক হওয়ার আতঙ্ক সবসময় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে।

দেশের সবচেয়ে জনবহুল ১.৫ মিলিয়ন মানুষের রাজ্য উত্তর প্রদেশের মিরাট শহরের অন্যান্য অধিবাসীদের সাথে ইমরানও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। তিনি জানান, ২০ ডিসেম্বর বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়ার পর থেকে রাতের বেলা পুলিশের অভিযানের বিষয়টি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই দিন পাঁচজন নিহত হয়। নতুন নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে এ যাবত যত সংঘর্ষ হয়েছে, তার মধ্যে এটা ছিল অন্যতম সহিংস।

২৯ ডিসেম্বর ইমরান জানান, “আমাদেরকে জেগে থাকতে হয় কারণ আমরা সবসময় আতঙ্কে আছি কখন পুলিশ আমাদেরকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা মুসলিমরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছি। সব জায়গায় আতঙ্কের পরিস্থিতি বিরাজ করছে”।

উত্তর প্রদেশ – যেখানকার জনসংখ্যা রাশিয়ার চেয়ে বেশি – যেখানকার জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হলো মুসলিম – সেখানে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বাধীন পার্লামেন্টে গত ১১ ডিসেম্বর এই আইনটি পাস হয়। এই আইনে প্রতিবেশী আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদেরকে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

‘ঘৃণার বিষ’

নয়াদিল্লী ভিত্তিক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশানের সিনিয়র ফেলে নিরঞ্জন সাহু রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে বই লিখেছেন। তিনি বলেন, “ধর্মের বিবেচনায় যে সমাজের মধ্যে এমনিতেই বিভাজন রয়েছে, এই ধরনের বিক্ষোভ প্রতিবাদের মাধ্যমে সেই বিভাজন আরও প্রকট হবে। ঘৃণা আর অবিশ্বাসের যে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা প্রবলভাবে চোখে পড়ছে”।

রাজ্যের রাজধানী লাক্ষ্ণৌ এবং মিরাট শহরের দুই ডজনের বেশি মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেছে যে, উত্তর প্রদেশের বহু মুসলিম খুবই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। এই রাজ্যের ক্ষমতায় রয়েছে মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সারা দেশে বিক্ষোভ চলাকালে যে ২৬ জন নিহত হয়েছে, এর মধ্যে শুধু এই রাজ্যে নিহত হয়েছে ১৯ জন। পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, উত্তর প্রদেশে এক হাজারের বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছে। এ সংখ্যাটাও ভারতের অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে বেশি।

লাক্ষ্ণৌতে নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ওয়াকিল ১৯ ডিসেম্বর ফার্মাসি যাওয়ার পথে নিহত হয়। তার শোকাহত বাবা মোহাম্মদ সরফুদ্দিন জানান, “সে গোলমালের মাঝখানে পড়ে গিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছে। তার তলপেটে গুলি লেগেছিল”।

পুরনো শহরে ভাড়া বাড়ি থেকে তিনি জানান, তার ২৮ বছর বয়সী ছেলে বিক্ষোভে যায়নি। “ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে আমার স্ত্রী এখন পর্যন্ত কোন কথা বলেনি”।

‘প্রতিশোধ’ গ্রহণ

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, হিন্দু পুরোহিত ও ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতা সন্ত্রাসী যোগি আদিত্যনাথ ঘোষণা দেয় যে, রাজ্যে সরকারী সম্পদ ধ্বংসের জন্য যাদেরকে দোষি পাওয়া যাবে, তাদের কাছ থেকে এর মূল্য নিংড়ে নেয়া হবে। তার এই ঘোষণার একদিন পরেই মিরাটে দাঙ্গা বাঁধে। তার অফিস থেকে সহিংসতার জন্য ‘অপরাধী আর রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে’ দোষারোপ করা হয়। তারা আরও বলেছে যে, পুরো রাজ্যের ২৫০ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৬২ জন বিক্ষোভকারীদের ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছে। অথচ, পরে একটি পত্রিকার সরেজমিন রিপোর্টে প্রকাশ পায়, কেবলমাত্র ১জন পুলিশ আহত হয়েছে।

‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’

লাক্ষ্ণৌয়ের হুসাইনবাদে নিজের বাড়িতে এমব্রয়ডারির কাজ করেন মোহাম্মদ রাসুল। তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা এখন আমাদের সাথে কাজ করতে চাচ্ছেন না”। বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে মানুষ এখন এই এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না।

মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক আমলা হার্শ মান্দের – যিনি তথ্য অনুসন্ধানের জন্য উত্তর প্রদেশে সহিংসতার জায়গা ঘুরে দেখেছেন, তিনি জানান যে, পুলিশ সেখানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে।

মান্দের ২৬ ডিসেম্বরে নয়াদিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “নাগরিকদের একটা অংশের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধে নেমেছে সরকার”। ভুক্তভোগীদের সাথে কথোপকথন এবং সহিংসতার স্থান পরিদর্শনের তথ্য তুলে ধরে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মিরাটে ইমরানের মাথায় এখন তার ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভরণপোষণের বোঝা। মুসলিমদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে পুলিশ যে আশ্বাস দিয়েছে, তাতেও তার বিশ্বাস নেই। তিনি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে মিরাট পুলিশের অতিরিক্ত সুপার সিং মুসলিম বিক্ষোভকারীদেরকে পাকিস্তান চলে যেতে বলছেন।

ইমরান বললেন, “তারা একটা পুরো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপব্যবহার করছে। এর থেকে আমরা কি বুঝবো?”

সূত্র: ব্লুমবার্গ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন