সংবাদ প্রচারে মালাউনদের নিষেধাজ্ঞা থাকায় কাশ্মীরের সাংবাদিক এখন দিনমজুর

0
228

ভারতের জবর দখলে থাকা কাশ্মীরে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারে কার্যত নিষেধাজ্ঞা থাকায় পেটের দায়ে অনেক সাংবাদিক এখন নিজেদের পেশা ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করছেন। পাঁচ বছর ধরে ফটো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন মুনীব-উল ইসলাম (২৯)। তার তোলা অনেক ছবি দেশে ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়েছে। আর সেই সাংবাদিক এখন কলম-ক্যামেরা ছেড়ে পেটের দায়ে রোজ ৫০০ রুপি মজুরিতে নির্মাণাধীন ভবনে ইট টানছেন।

শুধু মুনীবই নন, এমন অনেক সাংবাদিককেই এই করুণ জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

বিবিসির সাংবাদিক প্রিয়াংকা দুবেইয়েরর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জম্মু-কাশ্মীরের সাংবাদিকদের এমন দুর্বিষহ জীবনের চিত্র।

তিনি জানিয়েছেন, সংসার চালাতে কাশ্মীরের অনেক সাংবাদিকই নিজেদের মহান পেশা ছেড়েছেন। তাদের কেউ কেউ নির্মাণশ্রমিক আর দিনমজুরের পেশা বেছে নিয়েছেন।

এসবের জন্য গত বছরের ৫ আগস্ট নেয়া ভারতের মোদি সরকারের সেই ৩৭০ ধারা বিলোপের সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন কাশ্মীরিরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই আইন পাসের পর উত্তাল হয়ে ওঠে কাশ্মীর। রাজধানী শ্রীনগরসহ জম্মু ও লাদাখের অলিগতিতে বিক্ষোভ মিছিল নামে। এর পর সেই বিক্ষোভ ঠেকাতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনসহ কাশ্মীরের ল্যান্ডফোন, মোবাইল এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে কেন্দ্রীয় সরকার। বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় কাশ্মীরকে।

এর পর দীর্ঘ ১৫০ দিন পেরিয়ে গেলেও সেসব পরিষেবা চালু করেনি মোদি সরকার।

আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের সাংবাদিকরা প্রায় বেকার হয়ে বসেন।

ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ থাকায় কাশ্মীরে কী ঘটছে সে প্রতিবেদন লিখে তা বহির্বিশ্বে জানানোর উপায় হারিয়ে ফেলেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ও সরকারি নানা নিষেধাজ্ঞায় স্থানীয়ভাবেও সংবাদ প্রচারের ক্ষমতা হারান তারা।

এ সময় প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবাদিকদের বেতন দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। এসব প্রতিকূলতায় টিকতে না পেরে সাংবাদিকের স্বপ্নের চাকরি ছেড়ে এখন অন্য কাজ করে আহারের জোগান দিচ্ছেন কাশ্মীরের সাংবাদিকরা।

নিজের দুর্বিষহ জীবনের কথা জানাতে গিয়ে সাংবাদিক মুনীব-উল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, ‘আমার এলাকার নির্যাতিত মানুষের কথা বলতে আমি সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ায় আমার এই যাত্রা থেমে গেছে। এর আগে আমি সংঘাতপ্রবণ এই অঞ্চলের সংবাদ সংগ্রহে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু এখন পেটেই চলে না। তাই অন্য পথ বেছে নিয়েছি।’

এর পরও সাংবাদিকতা পেশাকে বুকে আগলে রেখে সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান মুনীব।

তিনি বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহে নিজের পকেট থেকে ৬ হাজার রুপি খরচ করে শ্রীনগরে গিয়েছিলাম। কিন্তু দ্রুত এই অর্থ শেষ হয়ে যায়। এর পর কর্মস্থল থেকে কোনো সাহায্য না পেয়ে চাকরিটা ছাড়তে হয় আমাকে।’

তিনি আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘এর পর পরিবার ও অসুস্থ স্ত্রীর খরচ চালাতে আমি মরিয়া হয়ে ওঠি। শেষ পর্যন্ত ভাইয়ের কাছে গেলে তিনি আমাকে পার্শ্ববর্তী অনন্তনাগ শহরে একটি নির্মাণাধীন ভবনে ইট বহনের কাজ পাইয়ে দেন। এখন আমি সাংবাদিক নই, দিনমজুর। মাথায় ইট নিয়ে ওপরে পৌঁছে দিই। দিনভর খাটুনি শেষে প্রতিদিন ৫০০ রুপি পাই।’

শুধু তিনিই নন, তার বেশ কয়েকজন সহকর্মী সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান মুনীব।

মুনীবের কথার সত্যতা পাওয়া গেছে। স্থানীয় এক পত্রিকার নামকরা প্রতিবেদক একটি দুগ্ধ খামারে কাজ নিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন