চীনে উইঘুর মুসলিমদের ইসলাম থেকে সরাতে ভয়ংকর কৌশল : গোপন তথ্য ফাঁস

0
571

চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়কে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ থেকে সরিয়ে আনতে ভয়ংকর কৌশল নিয়েছে চীনা সরকার। সম্প্রতিক উইঘুরদের নির্যাতনের নথি ফাঁস হয়েছে। আর এসব নথি উদ্ধৃত করে বিবিসি এমন তথ্য জানিয়েছে।

এমনকি ফাঁস হওয়া ওই নথির উদ্ধৃত্তি দিয়ে বিবিসি আরো জানিয়েছে, উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের দাড়ি রাখা, বোরকা পরা, বিদেশ যাত্রার ইচ্ছায় পাসপোর্টের আবেদন কিংবা শুধু ইন্টারনেটে বিদেশি ওয়েবসাইট ব্রাউজিংয়ের কারণেই লাখ লাখ চীনা উইঘুর মুসলিমদের বিভিন্ন অন্তরীণ শিবিরে নিয়ে যায় এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য গোপনে তাদেরকে আটকে রাখা রাখে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি বলছে, শিনজিয়াং প্রদেশের শিবিরগুলোতে লাখ লাখ মুসলমানের ভাগ্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের দেখা নথিটিকে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

যদিও নথিতে চীনের দূর পশ্চিমাঞ্চল শিনজিয়াংয়ের তিন হাজারেরও বেশি বাসিন্দার ব্যক্তিগত ও তাদের দৈনন্দিন জীবনাচরণের বিস্তৃত তথ্য রয়েছে।

আর ১৩৭ পৃষ্ঠার এই নথিতে থাকা সারি ও কলামে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের প্রার্থনার সময়, ধরন, কীভাবে তারা পোশাক পরেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের আচরণ কেমন সেসব বিষয়ও লিপিবদ্ধ আছে।

তবে কোনো সরকারি সিল বা চিহ্ন না থাকলেও নতুন এ নথিকে ‘আসল’ বলেই মনে করছেন শিনজিয়াংয়ে চীনা নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ওয়াশিংটনভিত্তিক ভিক্টিমস অব কমিউনিজম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড. আদ্রিয়ান জেনজ।

আর তিনি বলছেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চার কারণেই বেইজিং যে নির্যাতন করছে ও শাস্তি দিচ্ছে তার অসাধারণ এই নথিই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে।

এদিকে পশ্চিমা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশ দীর্ঘদিন ধরেই চীনা নাগরিক উইঘুর মুসলমানদের ওপর চীন সরকারের নির্যাতন ও নিপীড়ন নিয়ে অভিযোগ করে আসছে।

ওদিকে চীন উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে পড়েছে।

বিবিসি’র প্রতিবেদন আরো বলছে, ফাঁস হওয়া নথির যেসব তথ্য তারা বের করতে পেরেছে তার মধ্যে যেসব অংশে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লংঘনের সম্ভাবনা রয়েছে, প্রকাশের পূর্বে সেসব আড়াল করে দেয়া হয়েছে।

আর ওই নথিতে দক্ষিণ শিনজিয়াংয়ের হুতার শহরের নিকটবর্তী কারাকাক্স এলাকার ৩১১ জনের অতীত তথ্য, তাদের ধর্ম চর্চা এবং আত্মীয়, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তারিত তথ্য আছে।

কিন্তু অন্তরীণ শিবিরে থাকাদের এখানে রাখা হবে নাকি ছেড়ে দেয়া হবে এবং শিবির থেকে ছাড়া পাওয়াদের ফের নিয়ে আসা হবে কিনা, সে বিষয়ক সিদ্ধান্ত নথিটির একেবারে শেষ কলামে লেখা আছে যাকে ‘রায়’ বলছে বিবিসি।

আর এসব কেন্দ্রকে চীন যে ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, নতুন এ নথির তথ্য তার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক বলেও জানিয়েছে বিবিসি।

তবে নথির ৫৯৮ নম্বর সারিতে ৩৮ বছর বয়সী এক নারীর বিস্তারিত তথ্য আছে, যেখানে কয়েক বছর আগে মুখমণ্ডল কাপড়ে ঢেকে চলাফেরার কারণে হেলসেম নামের ওই নারীকে চীনের এই তথাকথিত ‘পুনঃশিক্ষণ শিবিরে’ পাঠানো হয়েছিল।

বাস্তবিক অর্থে তেমন ঝুকিঁ নেই এমনটা লেখা থাকা সত্ত্বেও ৩৪ বছর বয়সী মেমেত্তোতিকে অন্তরীণ করা হয়েছে কেবল পাসপোর্টের আবেদন করার কারণে। বেইজিং কর্তৃপক্ষ যে এখন শিনজিয়াং থেকে বিদেশ যাত্রার আকাঙ্ক্ষাকেও ‘উগ্রবাদের লক্ষণ’ হিসেবে দেখছে। আর মেমেত্তোতিকে আটক তার নজির বলছে বিবিসি।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কাউকে কাউকে শিবিরগুলোতে নেওয়া হয়েছে ‘ঘন দাড়ি’ রাখায় কিংবা ধর্মীয় পাঠচক্র আয়োজনের কারণে । আর ২৩৯ নম্বর সারিতে থাকা নুরমেমেতকে পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয় ‘ওয়েবলিংকে ক্লিক করে নিজের অজান্তে বিদেশি একটি ওয়েবসাইটে চলে যাওয়ায়’। আর ২৮ বছর বয়সী এ যুবকের আচরণে অন্য কোনো সমস্যা নেই বলেও তাকে নিয়ে থাকা সারি ও কলামগুলোতে লেখা রয়েছে।

এদিকে, ১৭৯, ৩১৫ ও ৩৪৫ এ বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে ৬৫ বছর বয়সী ইউসুফের। তার রেকর্ডে লেখা রয়েছে- ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দুই মেয়ের নেকাব ও বোরকা পরা, ছেলের ইসলামী রাজনীতির প্রতি ঝোঁক এবং পরিবারের সদস্যদের হানবিরোধী মনোভাবের কথা। রায়ের ঘরে লেখা রয়েছে- প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা।

বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, জিনজিয়াংয়ের ওই শিবিরগুলোতে ২০ লাখের বেশি উইঘুরকে আটক রাখা হয়েছে যার মধ্যে বেশীরভাগই মুসলিম।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন