
দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে তুরাগ নদের অস্তিত্ব। দখল, দূষণ আর নাব্যতাই এর মূল কারণ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও বনায়ন করার জন্য নদের উভয় পাশে স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। নদের দিকে তাকালে মনে হয়, এ যেন ময়লার ড্রেন! নদের পাশে ঘেরা ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে নাক চেপে।
আর এসব ময়লা-আবর্জনার কারণে পচে যাওয়া পানির দুর্গন্ধে অসুস্থ হচ্ছে অনেকেই। তাই নদের পানি পরিষ্কারের ব্যবস্থা এবং নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। নদের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে বিআইডব্লিউটির পক্ষে থেকে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করলেও আসলে কতটা তা বাস্তবায়িত হবে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন এখন জনমনে। খবরঃ বিডি প্রতিদিন
১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ব্রহ্মপুত্রের শাখানদী লবলং সাগর, যা শেরপুর থেকে মধুপুর গড়, অর্থাৎ প্রাক্তন ময়মনসিংহ জেলাকে তিন ভাগে ভাগ করে প্রবহমান ছিল, তা বন্ধ হয়ে যায় এবং যমুনা নদীর সৃষ্টি হয়। হিমালয় থেকে ধাবমান নদী তিস্তা ও ধরলা এসে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হলেও তা দেশের পূর্বাংশে ময়মনসিংহ দিয়ে প্রবলভাবে প্রবাহিত না হয়ে গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জের পশ্চিম তীরে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল জেলা এবং দক্ষিণে মানিকগঞ্জ ও রাজবাড়ীর সীমানায় পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রবাহিত হয়। এই যমুনা নদী জামালপুরে শেষ হয়ে টাঙ্গাইল অংশে প্রবেশ করে ভূঞাপুর, গোপালপুর অঞ্চল থেকে পূর্ব দিকে টাঙ্গাইল জেলার মধ্য দিয়ে সখীপুর ও মির্জাপুর উপজেলার ওপর দিয়ে বংশী নদী নামকরণপূর্বক যমুনার শাখানদী হিসেবে প্রবহমান। এই বংশী নদী গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর এলাকায় এসে দুই ভাগে ভাগ হয়ে এক ভাগ দক্ষিণে বংশী নদী হিসেবে সাভারে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অন্যটি তুরাগ নাম ধারণ করে বরইবাড়ী, বোয়ালী, চা-বাগান, মির্জাপুর, কাউলতিয়া, মধ্যপাড়া, কোনাবাড়ী, বামন, কাশিমপুর, গাছা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, উত্তরা (তুরাগ থানা), বিরুলিয়া, মিরপুর হয়ে কামরাঙ্গীর চর এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রবহমান। তুরাগ প্রবাহের সময় ইছরকান্দি এলাকায় এসে দুই ভাগে ভাগ হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে, যার পূর্ব দিকে প্রবাহিত শাখা সাবেক টঙ্গী পৌরসভার ভাদাম, ভাকরাল। এই ভাদাম ও ভাকরালকে আবার দুই ভাগে ভাগ করে মুদাফা বড় দেওড়াকে উত্তরে রেখে বিশ্ব ইজতেমার পশ্চিমে কহর দরিয়া নামকরণ করে বালু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। একসময় এই তুরাগ নদ দিয়ে নৌযান চলাচল করত। এই নদে গোসল কিংবা এর পানি দিয়ে রান্নাবান্না করা হতো
নদীতে মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে গোসল কিংবা পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, ময়লা-আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে নদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো জো নেই। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার মানুষ ট্রলারে করে ঐতিহ্যবাহী টঙ্গী বাজার আসত কেনাকাটা করতে। নৌপথে আসা বিভিন্ন মামামাল কিংবা চলাচলের সুবিধার্থে টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় কয়েক বছর আগে প্রায় পাঁচ কোটি ব্যয়ে নির্মিত হয় নদী বন্দর। দখল, দূষণ আর নাব্যতার কারণে তুরাগ নদ সরু হওয়ার ফলে নদীবন্দরটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর। নদীবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। এতে করে টঙ্গীর ওই নদীবন্দরটি এখন মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় উলুখোলার এক বাসিন্দা, টঙ্গী সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতন অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষ ওয়াদুদুর রহমান বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ট্রলারে করে টঙ্গী বাজারে আসতাম বাজার করতে। সেই নদের পানি এখন আর নেই। পানিতে ময়লা-আবর্জনা আর দুর্গন্ধের কারণে এখন অনেকেই টঙ্গী বাজারে আসে না বাজার করতে। ’ টঙ্গী বাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন সরকার বলেন, নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ শুধু স্থাপনা ভাঙার কাজ করছে। নদের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে দূষণ রোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। এরপর খননকাজ করতে হবে। ওয়াকওয়ে করে কী লাভ পচা পানির দুর্গন্ধে মানুষ নদের পাশ দিয়ে হাঁটতে না পারলে?