কোভিড-১৯ : জরুরি টেস্ট হচ্ছে না বাংলাদেশে, কী ঘটতে পারে সামনে?

0
562
করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের নিশ্চিত সংখ্যা

ওপরের গ্রাফগুলো দেখুন।

করোনাভাইরাস শনাক্ত হবার শুরুর দিন থেকে মার্চ মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে গ্রাফগুলোতে।  দেখুন, সবদেশেই একই ধাঁচে এগিয়েছে করোনা ভাইরাস। ভাইরাস শনাক্তকরণের প্রথম দিন থেকে চতুর্থ এবং পঞ্চম সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে গ্রাফের লাইন সোজা ছিল। মানে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তেমন বাড়েনি। কিন্ত তারপর হঠাৎ করেই গ্রাফ উর্ধ্বমুখী হয়ে গিয়েছে, প্রায় ৯০ ডিগ্রী কোণে।
এর মানে কী?
এর মানে হলো চতুর্থ বা পঞ্চম সপ্তাহে এসে ব্যাপক আকারে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়া শুরু করেছে।
এবার বাংলাদেশের গ্রাফের দিকে তাকান। তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। গ্রাফ, শুরুর দিনগুলোর মতোই সমান্তরাল। অন্যান্য দেশের মতো ঊর্ধ্বমুখী হয়নি। তার মানে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়েনি।
স্বস্তির খবর তাই না?
কিন্তু দুটি কারণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই।

প্রথমত আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে মার্চের ৮ তারিখে। আজ মার্চের ২৯ তারিখ। তার মানে আমরা তৃতীয় সপ্তাহ পার করে চতুর্থ সপ্তাহে পা দিয়েছি। অন্যান্য দেশগুলোর ট্রেন্ড অনুসারে আগামী ১৪ দিনের মধ্যে আমাদের দেশের গ্রাফও ৯০ ডিগ্রী কোণে ওপরের দিকে উঠে যাবার কথা। আর তখনই কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবো আমরা।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে করোনা টেস্টের সংখ্যা খুবই খুবই কম হওয়াতে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই।

আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদি সাবরিনা বারবার বলে যাচ্ছেন, বাংলাদেশ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে চলছে। সেই সাথে পর্যাপ্ত করোনা টেস্ট করা হচ্ছে।
কিন্তু করোনা টেস্টের সংখ্যা বলছে ভিন্ন কথা। গত দুইমাসে কোভিড-১৯ এর টেস্ট করার জন্য হটলাইনগুলোতে ফোন করেছে ৮ লাখেরও বেশী মানুষ। শুধু আইইডিসিআরের হটলাইনেই এসেছে ৭০ হাজারেরও বেশী ফোন। কিন্তু করোনা টেস্ট করা হয়েছে শুধুমাত্র ১১০০ মানুষের। যার মধ্যে করোনা আক্রান্ত পাওয়া গিয়েছে ৪৮ জনকে।

এর অর্থ হলো সবচাইতে কম করোনা টেস্ট করা হচ্ছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটা। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলেছে করোনা ভাইরাস বহনকারীদের শনাক্ত করার জন্য যতোবেশী সম্ভব করোনা টেস্ট করতে হবে। এতে করে বোঝা যাবে কোন অঞ্চলে ভাইরাস বেশী ছড়াচ্ছে।

কম টেস্ট করার ফলে করোনা সংক্রমণের ব্যাপারে ভুল ধারণা পাচ্ছে মানুষ। একই সাথে আরেকটা ব্যাপারেও ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যু হার সবচাইতে বেশী বাংলাদেশে। এমনকি করোনার কারণে ১০ হাজারেরও বেশী মানুষ মারা যাওয়া ইতালীর চাইতেও বেশী। ইতালীতে যেখানে মৃত্যুহার ১০.২ সেখানে বাংলাদেশে ১০.৪ ।
কোনো সন্দেহ নেই, কম সংখ্যক করোনা টেস্টের কারণেই এই রোমহর্ষক ডাটা দেখতে হচ্ছে বাংলাদেশীদের।
মীরজাদি অবশ্য বলছেন এখনো মৃত্যুহার হিসেব করার সময় আসেনি।

মার্চের ৮ তারিখে প্রথম করোনা রোগী ধরা পড়লো বাংলাদেশে। এর পরের ৫ দিন নতুন কোনো করোনা রোগী পাওয়া গেলোনা। মার্চের ১৪ তারিখে এসে পাওয়া গেলো দুজনকে। পরের দিন আবার ধরা পড়লো না কোনো রোগী। কয়েকজন নতুন রোগী পাওয়া গেলো মার্চের ১৬ তারিখ থেকে ২৪ তারিখের মাঝে। ২৩ এবং ২৪ তারিখে সর্বোচ্চ ৬ জন করে করোনা রোগী সনাক্ত হলো। ২৫ তারিখে নতুন কোনো করোনা কেস নেই। মাঝের দুইদিন, ২৬ এবং ২৭ তারিখে করোনা পাওয়া গেলেও ২৮ এবং ২৯ তারিখে নতুন কোনো করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলোনা।
কিন্তু এতে খুশি হবার কোনো কারণ নেই। সবচাইতে বেশী করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছে ইতালী,আমেরিকা, স্পেন, ফ্রান্স , দক্ষিণ কোরিয়া বা জার্মানিতে। এ দেশগুলোতেও প্রথম তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহেও এমন অনেক দিন গিয়েছে যেদিন নতুন কোনো করোনা রোগী পাওয়া যায়নি।

ইতালীর কথা ধরুন। পৃথিবীর সবচাইতে বেশী প্রাণহানী হচ্ছে ইতালীতে। ইউরোপের সবচেয়ে বেশি করোনা রোগীর সংখ্যাও ইতালীতে। প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর টানা ছয়দিন নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। অষ্টম দিনে এসে একজন শনাক্ত হলো। পরের দুই সপ্তাহে পাওয়া গেলোনা একজনও। এরপর অবস্থা বদলে গেলো খুব দ্রুত। ভয়ঙ্কর গতিতে বাড়তে থাকলো করোনা রোগীর সংখ্যা। ২৯ তারিখ পর্যন্ত ইতালীতে আক্রান্ত হয়েছে ৯২,৪৭২ জন। মারা গিয়েছে ১০,০২৩ জন। এমনকি দিনে ৯০০ লোকেরও বেশী মানুষ মারা গিয়েছে ইতালীতে।
বাংলাদেশের মতো ইতালী খুবই কম করোনা টেস্ট করেছে। এবং কোন কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেটা বের করতে পারেনি।

রোগ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ বলছেন, ‘আমরা বলতে পারিনা যে গত ২৪ ঘন্টায় কোনো মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়নি, বরং আমাদের বলা উচিত, আমরা নতুন কোনো রোগী সনাক্ত করতে পারিনি। আর এর কারণ হলো, কম সংখ্যক টেস্ট করা’। যদি দেশজুড়ে বেশী সংখ্যক টেস্ট করা হতো তাহলে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন নতুন করোনা রোগী পাওয়া যেতো। আর এর ফলে আমরা যেমন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণের সুযোগ হারাচ্ছি তেমনি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছি’।

অন্যান্য দেশগুলোর অবস্থা থেকে এটি একদম স্পষ্ট যে করোনা মোকাবেলার সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে টেস্টিং এর সামর্থ্যের ওপর।
দক্ষিণ কোরিয়া করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে খুব চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক আকারে করোনা টেস্ট শুরু করে তারা। তিন লাখেরও বেশী টেস্ট করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। ইতালী, স্পেন এবং ইরান খুবই কম করোনা টেস্ট করেছে। এই একটি ভুলের কারণে চরম মূল্য দিচ্ছে দেশগুলো। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর ইউরোপের দেশগুলো এখন টেস্ট করার ব্যাপারে জোর দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে করোনা কেসের সংখ্যা।

দক্ষিণ কোরিয়াতে যেখানে এক হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৭ জনের করোনা টেস্ট করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ১০ লাখ মানুষের ভেতর ৬ জনের টেস্ট করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সাবেক ভাইস চ্যাঞ্চেলর, virology এর প্রফেসর নজরুল ইসলাম সতর্ক করছেন,
‘টেস্টিং ক্যাপাসিটি বাড়ানো না হলে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে হবে। এখন পর্যন্ত এক হাজারের কিছু বেশী করোনা টেস্ট করা হয়েছে। এটা খুবই কম। বড় আকারে যদি করোনা টেস্টিং ক্যাপাসিটি না বাড়ানো হয় তাহলে বিরাট সর্বনাশ হয়ে যাবে’।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন