
আওয়ামী দুঃশাসনের নির্মম দিন ছিল ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট। সন্ধ্যার দিকে যশোরের চৌগাছা থানার এসআই মোখলেস, এএসআই মাজেদসহ কয়েক পুলিশ সদস্য মিলে উপজেলার বুন্দলিতলায় একটি মোটরসাইকেল থামায়। তারা পাকড়াও করে দুই তরুণ রুহুল আমিন এবং ইসরাফিল হোসেনকে। পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি করে ওই দুজনের কাছ থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অর্থ সংগ্রহের রসিদ ও মাসিক সাংগঠনিক রিপোর্ট পায়। এ অভিযোগে তাদের আটক করা হয় এবং একদিন পর একই স্থানে তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে তাদের পায়ে গুলি করা হয়। পরে তাদের একটি করে পা কেটে ফেলতে হয়।
ফ্যাসিবাদী সরকার বিতাড়নের পর এ ঘটনার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) শরণাপন্ন হন ইসরাফিল এবং রুহুল। ঠান্ডামাথায় গুলি করে দুই তরুণের পা নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলামসহ ছয়-সাতজনকে। এ মামলায় পুলিশ কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে গত ১০ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেয়।
ইসরাফিল এবং রুহুল গণমাধ্যমকে বলেন, সাংগঠনিক কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাদের ধরে প্রথমে চৌগাছা থানায় নেয়। সেখানে এক রাত তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চলে। পরদিন সকালে বাড়ি থেকে পাঠানো নাস্তা খান তারা। দুপুরে তাদের আদালতে হাজির করার নামে যশোর ডিবি অফিসে নেয় থানার তখনকার এসআই আকিকুল ইসলাম। সেখান থেকে সন্ধ্যায় ফের চৌগাছার উদ্দেশে তাদের নিয়ে রওনা হয় পুলিশের গাড়ি।
তারা আরো বলেন, যশোর-চৌগাছা সড়কের কয়ারপাড়া এলাকায় দুজনের চোখ বেঁধে হাত পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাপ পরানো হয়। এর কিছু সময় পর যেখান থেকে তাদের আটক করা হয়েছিল, সেই বুন্দলিতলার নির্জন মাঠে নিয়ে তাদের একটি করে পায়ে গুলি করে পুলিশ। এরপর চোখ থেকে কাপড় খুলে তা পায়ের হাঁটুতে বেঁধে দেওয়া হয়। গুলি করার পর পুলিশ সদস্যরা চিৎকার করে গালাগালি করতে থাকেন। এতে আশপাশের কিছু লোক সেখানে এলে এসআই আকিকুল আহত দুজনকে না চেনার ভান করে তাদের নাম জিজ্ঞাসা করতে থাকে।
ভুক্তভোগীরা জানান, এরপর তাদের প্রথমে নেওয়া হয় চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে। তৃতীয় দিন তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল)। সেখানে সাতদিনের মাথায় তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পা দুটি কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা। এরপর দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা অস্ত্র মামলায় আদালতের মাধ্যমে তাদের যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওই বছরের ৩১ অক্টোবর দুজনকে জামিনে মুক্তি দেয় আদালত।
রুহুলের প্রসঙ্গ তুলতেই তার মা রোজিনা খাতুন ডুকরে কেঁদে ওঠেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘আমি সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়েছি। অনেক কষ্টে পড়ালেখা করিয়েছি। পুলিশ গুলি করে ছেলেটাকে খোঁড়া বানিয়ে দিয়েছে।’
তথ্যসূত্র:
১. গুলিতে চিরদিনের জন্য পঙ্গু দুই শিবির নেতা
– https://tinyurl.com/2dcuh92f


