
আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
আমেরিকা তার গোলাম রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম, খুন, অমানুষিক নির্যাতন করে অসংখ্য মুসলিমকে। মুসলিম হওয়ার কারণে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ আমেরিকা ও তার দোসর রাষ্ট্রগুলোর বিভীষিকাময় জুলুমে পতিত হয়েছে! তেমনি আমেরিকার জুলুমের শিকার একজন ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক মোয়াজ্জাম বেগ। ২০০১ এর অক্টোবরে আফগানিস্তানের কাবুলের উপর মার্কিন বোমারু বিমানের কার্পেট বোম্বিং থেকে বাঁচতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সেখান থেকে নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় গভীর রাতে ঘুমন্ত পরিবারের কাছ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। তারপর শুরু হয় এক বিভীষিকাময় যাত্রার! ইসলামাবাদ, কান্দাহার হয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বাগরাম কারাগারে, যেখানে বন্দী ছিলেন আফিয়া সিদ্দিকীসহ আরও অনেকে। তারপর সেখান থেকে তাঁর দুঃস্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় গুয়ান্তানামোতে, তথাকথিত আমেরিকান সভ্যতার পচাগলা চেহারাটা যেখানে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় মোয়াজ্জাম বেগের।
ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বর্বর হামলার প্রেক্ষিতে তাঁর জীবনের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ ও পাকিস্তানি আর্মির বর্বরতার নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়…
”পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আফগানিস্তানে বোমা হামলার জন্য তাদের মাটি, সমুদ্রবন্দর এবং আকাশপথ ব্যবহার করতে দিয়েছিল। আমি কাবুলে ছিলাম যখন মার্কিন ক্রুজ মিসাইল আঘাত হানে। আমি সেখানে ছিলাম যখন মার্কিন বিমান বোমা বর্ষণ করছিল।
পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আমেরিকার নির্দেশে খাইবার পাখতুনখোয়ায় (KPK) কাবায়েলি অঞ্চলে ইসলামী শরিয়াহ প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত হাজারো মুজাহিদ ও বেসামরিকদের শহীদ করেছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং আইএসআই হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন করেছে এবং পুরস্কারের টাকার বিনিময়ে আমেরিকানদের কাছে বিক্রি করেছে।
ফিলিস্তিনি আবু জুবায়দাহ তাদের মধ্যে ছিলেন। আফিয়া সিদ্দিকী এবং তাঁর সন্তানরাও তাঁদের মধ্যে ছিলেন।
আমিও তাঁদের মধ্যে ছিলাম!
তাদের সিআইএ প্রভুদের সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে তারা আমার বাড়িতে ঢুকে পড়ে, এবং আমার স্ত্রী ও ছোট ছোট সন্তানের সামনে বন্দুকের মুখে আমাকে তুলে নিয়ে যায়- ওরা আতঙ্কিত হয়ে সবকিছু দেখছিল।
বছরের পর বছর কেটে গেছে, কিন্তু যাদের তারা আফগানিস্তানে বিক্রি করেছিল, তাঁরাই আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে, সবর ও জিহাদের মাধ্যমে আমেরিকা ও তার মিত্রদের পরাজিত করেছে।
এখন তাঁরাই (মুজাহিদিন) দেশ শাসন করছে।
অতীতের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য অনুতাপ করা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার বদলে, অন্তর্নিহিত দুর্নীতি ও হিংসা সহ্য করতে পারেনি যে, আফগানিস্তান নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছে! ইসলামী ইমারাত সমৃদ্ধি ও উন্নতির দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্বের সামনে নিজেদের সামরিক শক্তি, অস্ত্রভাণ্ডার এবং পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে গর্ব করলেও, গত ৩০ বছরে পাকিস্তান তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে মূলত নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধেই।
এদিকে কাশ্মীর দখলেই রয়ে গেছে- সেখানে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি হিন্দু*ত্ববাদী শক্তির হাতে নারীরা লাঞ্ছিত, পুরুষদের বন্দী ও হত্যা করা হচ্ছে।
গাজা, পশ্চিম তীর এবং আল-কুদস দখল ও ধ্বংসের শিকার, আর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাদের অকার্যকর আরব ও তুর্কি মিত্রদের সঙ্গে কেবল মুখের কথা বলে বা নামমাত্র প্রতিবাদের মেকি অভিনয় করে, কিন্তু শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও গাজাকে রক্ষা করে না।
তাদের কোনো ব্যালিস্টিক মিসাইল, দীর্ঘ-পাল্লার বোমারু বিমান বা যুদ্ধবিমান হত্যাকারী জায়োনিস্ট রাষ্ট্রকে হুমকি দেয় না। তাদের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয় না বা ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় পাঠানো হয় না।
বরং, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক তোষামোদী আচরণের একটি হিসেবে পাকিস্তানের নেতা শাহবাজ শরীফ গাজা গণহত্যার পরপরই সন্ত্রাসী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছিল- যখন গোটা পৃথিবীর নিকট এটা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন এবং নানাভাবে সমর্থন করে।
মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর আমি বহুবার আফগানিস্তান ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছি। আমার কাজ ছিল গুয়ান্তানামোর মতো মার্কিন কারাগার থেকে বন্দিদের মুক্ত করার চেষ্টা করা, যেখানে আফগান মুহাম্মদ রহিমের মতো মানুষ ২৪ বছর ধরে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন। তাকেও পাকিস্তান টাকার বিনিময়ে সিআইএ-এর হাতে তুলে দিয়েছিল। যখন তার ছোট সন্তানরা শেষবারের মতো তাদের বাবাকে দেখতে চেয়েছিল, তখন আইএসআই এজেন্টরা তাদের মারধর করে এবং সিঁড়ি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়।
ওটাই ছিল তাদের বাবাকে শেষবার দেখার মুহূর্ত। এখন তারা বড় হয়ে গেছে। তারা সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে।
আমার অনুসন্ধান আমাকে আফগানিস্তানের মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে গেছে, যেখানে আমি যুদ্ধজনিত মানসিক আঘাত, অবহেলা ও বিষণ্নতা থেকে সৃষ্ট আসক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছি। এই কেন্দ্রগুলোর কাজের গুরুত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এখানে এসে মানুষের জীবন বদলে গেছে, এবং মার্কিন দখলদারির সময় যে মাদকাসক্তির মহামারি ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল, তা এই হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে নির্মূল করা হয়েছে।
এইসব স্থানে পাকিস্তানের হামলা স্পষ্টত যুদ্ধাপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও কাপুরোষোচিত হামলা।
কিন্তু এটাই নতুন নয়, পাকিস্তানের অতীত কর্মকাণ্ডও যুদ্ধাপরাধ।
এক সময় পাকিস্তানের সম্ভাবনা ছিল ন্যায়বিচার, সম্মান, বিশ্বাস এবং মর্যাদার আদর্শ হওয়ার, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে তা তার বিপরীতটাই প্রমাণ করেছে। সেই স্বপ্ন আপাতত মৃত।
দুর্নীতি, জাতীয়তাবাদ এবং নীতিহীনতার ক্যান্সার তাকে গ্রাস করেছে। এর প্রয়োজন সংস্কার, পরিবর্তন এবং নতুন সূচনা।
যেদিন সেই দিন আসবে, সবকিছু চিরতরে বদলে যাবে।
আমি দোয়া করি, সেই দিনটি যেন শীঘ্রই আসে।”
- মোয়াজ্জাম বেগ


