
চীনের সঙ্গে সরাসরি স্থল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের সামনে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অগ্রগতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাদাখশানের দুর্গম ওয়াখান পর্বতমালার মধ্য দিয়ে ১২১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের ফলে আফগানিস্তান এখন চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলিত এই ঐতিহাসিক যোগাযোগপথ পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেশটির বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও শিল্পশক্তি। পূর্বদিকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক দুর্গমতা ও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আফগানিস্তানের সঙ্গে দেশটির সরাসরি স্থল যোগাযোগ এতদিন কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। গত পাঁচ বছরে দুই দেশের সম্পর্ক ও পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পরিবহনপথ বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর আফগানিস্তানের বাণিজ্যিক যোগাযোগ অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। এ পরিস্থিতিতে ইমারাতে ইসলামিয়া বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় চীনের সঙ্গে ওয়াখান করিডরের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবেও বাদাখশান অঞ্চলটি মধ্য এশিয়া ও চীনের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। প্রাচীন বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত সিল্ক রোডের বিভিন্ন শাখা এই বৃহত্তর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমকে যুক্ত করেছিল। ফলে ওয়াখান করিডরের আধুনিক সড়ক যোগাযোগ কেবল নতুন একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবনের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন সড়কটি বাদাখশানের ওয়াখান জেলার ব্রোগিল এলাকা থেকে চীনের সীমান্তের শূন্যবিন্দু পর্যন্ত বিস্তৃত। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে নির্মিত এ সড়কের ফলে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ সড়কব্যবস্থার সঙ্গে চীন সীমান্তের সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই যোগাযোগ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতদিন পাকিস্তানের বন্দর ও স্থলপথের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য বিভিন্ন সময় সীমান্ত পরিস্থিতি ও পাকিস্তানের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। চীনের সঙ্গে নতুন স্থলপথ চালু হলে আফগানিস্তানের সামনে বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের একটি বিকল্প পথ তৈরি হবে। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও বহুমুখী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে নতুন এই করিডর পাকিস্তানের ওপর আফগানিস্তানের বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আফগানিস্তানের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ যত বাড়বে, একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীলতা তত কমবে। এর ফলে আফগানিস্তান নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বাণিজ্যিক প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
চীনের জন্যও ওয়াখান করিডর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সরাসরি স্থল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য চীনের বাজারে পৌঁছানোর পাশাপাশি চীন থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্য, শুল্কব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন, ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চীন ও আফগানিস্তানের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়াখান করিডর আফগানিস্তানের জন্য শুধু একটি নতুন বাণিজ্যপথ নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নতুন দ্বার। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে এই পথই ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র
1.Wakhan: The Beginning of a New Economic Path
– https://tinyurl.com/2s3c3dt7

