
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলমান এ সংকটের কারণে বাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে। আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দাম দিয়েও মিলছে না রান্না করার এ গ্যাস।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যম বণিক বার্তা’য় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলপিজি অপারেটরদের একটি অংশের দাবি, এ অঞ্চলে এলপি গ্যাস সরবরাহকারী কয়েকটি বিদেশী ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এলপিজিবাহী জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। এতদিন যেসব প্রতিষ্ঠান ও জাহাজ দক্ষিণ এশিয়াসহ বাংলাদেশে বড় পরিসরে এলপিজি সরবরাহ করত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
তবে এলপিজি ব্যবসায়ীদের আরেকটি অংশ ভিন্নমত দিচ্ছেন। তারা বলছেন, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে এলপিজি আমদানি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। সে কারণেই সরকার নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ মূল্য দিয়েও গ্রাহকরা এলপিজি পাচ্ছেন না। আবার অন্য একটি অংশ বলছে, এলপিজি আমদানি বাড়াতে সরকারের কাছে আবেদন করেও অনুমতি পাওয়া যায়নি।
এলপিজি খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু গত ডিসেম্বরে তা নেমে আসে প্রায় ৮৫ হাজার টনে। চাহিদা কমে যাওয়ায় নয়, বরং সরবরাহ ঘাটতির কারণেই অন্তত ৩০ হাজার টনের বেশি এলপিজির সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।
অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বরে এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজ, এ খাতের কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পর থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ায় এলপিজি সরবরাহ করতে পারছে না। ডিসেম্বর থেকে আমদানিতে সংকট শুরু হলেও চলতি মাসে এর সরাসরি প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) শীর্ষ নেতারা অবশ্য জানান, শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি থাকে। তার ওপর কয়েকটি কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে। দ্রুত আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এলপিজির বিদেশী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়েছে কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় লোয়াবের সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হকের কাছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে, বিষয়টি ঠিক নয়। এখন শীত মৌসুম, এ সময় এলপিজির একটু ঘাটতি থাকেই। তবে ঘাটতির আরো কারণ হলো দেশে বেক্সিমকো, বসুন্ধরাসহ বড় পাঁচটি কোম্পানি এখন এলপিজি আমদানি করছে না। তাদের অবর্তমানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে অন্য কোম্পানিগুলোকে আমদানি করতে হবে। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না। এ সংকট কাটাতে আমরাসহ (ডেল্টা এলপি গ্যাস) পাঁচটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলাম, কিন্তু কাউকে অনুমতি দেয়া হয়নি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গত ২০ নভেম্বর ৪৮ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে তালিকায় রয়েছে সিঙ্গাপুর, ইরান ও ভারতের ১৪ ব্যবসায়ী, ২৪টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০টি এলপিজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বহনকারী জাহাজ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এবং তারা দক্ষিণ এশিয়ায় এলপিজি ও জ্বালানি তেল সরবরাহের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। নিষেধাজ্ঞার ফলে এসব ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাজারে।
এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরাসরি ইরান থেকে এলপিজি আমদানি না করলেও দেশটির উৎপাদিত গ্যাস বিভিন্ন বিদেশী ট্রেডারের মাধ্যমে, নথিপত্র ও রুট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসত। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় এখন অপারেটররা সে উৎস এড়িয়ে চলছেন। ফলে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ চ্যানেল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দেশের বাজারে সরবরাহকৃত এলপিজির প্রায় ৫০ হাজার টন আমদানি হয় ভারতের ওড়িশার ধামরা বন্দর দিয়ে। আরো প্রায় ২০ হাজার টন আসে যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশে পরিচালিত একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বাকি প্রায় ৫০ হাজার টন বিভিন্ন মধ্যবর্তী উৎস হয়ে ইরানসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসত। নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় এ অংশের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এলপিজি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান থেকে এলপিজির বৈশ্বিক সরবরাহকারীরা এখন মারাত্মক সংকটে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ওই বাজার থেকে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপি গ্যাসের আকস্মিক সংকটের প্রধান কারণ মূলত পণ্যটি পরিবহনে এ খাতের বিদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। এছাড়া বেশকিছু জাহাজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে তিন মাস আগে থেকে যারা এলপিজি আমদানির ক্রয়াদেশ দিয়েছে, তারাও পণ্য আমদানিতে অসুবিধায় পড়েছে। বাজারে ফ্রেশ এলপিজির যে পরিমাণ সেলস ভলিউম, তার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম আমদানি করতে পারছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেয়া না গেলে এ সংকট তৈরি হবেই। আর এলপিজির আমদানি কমে গেলে এক ধরনের সংকট দেখিয়ে খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি হবে—এটাই তো স্বাভাবিক।’
এলপিজি মূলত বিউটেন ও প্রোপেনের মিশ্রণ। বিশ্ববাজারে দুটি পণ্যের দাম গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নিম্নমুখী ছিল। তবে গত নভেম্বর থেকে দাম বাড়তে শুরু করে। নভেম্বরে টনপ্রতি বিউটেন বিক্রি হয় ৪৬০ ডলারে, আর প্রোপেন ৪৭৫ ডলারে। তার আগের মাস অর্থাৎ অক্টোবরে তা ছিল যথাক্রমে ৪৯০ ও ৫২০ ডলার। চলতি জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি বিউটেনের দাম ৫২০ ও প্রোপেন ৫২৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানি করা হয় বলে সৌদি আরামকো সিজি প্রাইজকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশের বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণ হয়। আগামীকাল দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের দাম ঘোষণার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এবার পণ্যটির দাম বাড়ানো হবে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে। ডিসেম্বরের জন্য সংস্থাটি প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
বাজার থেকে হঠাৎ করেই এলপিজি সংকট তীব্র হয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। গৃহস্থালিতে রান্নায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ায় ১ হাজার ২০০ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার টাকা দিয়েও মিলছে না। ভোগান্তিতে পড়া গ্রাহকদের অভিযোগ, গত সপ্তাহ ধরেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে গ্যাসের দাম। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ফলে বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে অতি মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, শীতকালে স্বাভাবিকভাবে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সে তুলনায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। চাহিদা ও জোগানের এ অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন না বিক্রেতারাও। তাই আবাসিক থেকে চায়ের দোকান—কোথাও প্রয়োজনীয় সরবরাহ দিতে পারছেন না বলে জানান।
কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্টোরের মালিক জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার দোকানে গত পাঁচদিন ধরে সিলিন্ডার নেই। ডিলারের কাছে গেলে বলে গ্যাস নেই। আবার ভেতরে গিয়ে দেখা যায় সিলিন্ডারের স্তূপ। আমি মূলত পেট্রোম্যাক্স, আইগ্যাস ও বসুন্ধরার সিলিন্ডার বিক্রি করি। এক সপ্তাহ আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ২৫০ টাকা ছিল, গত তিনদিন ধরে সেটা ২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। আমাদেরই কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। পুরো কারওয়ান বাজারে গ্যাস নেই। এখানে সিন্ডিকেট করে সংকটটা দেখানো হচ্ছে।’
দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এলপিজি আমদানি ও বিপণনের জন্য বর্তমানে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেও বাজারে আছে ২৮টির মতো কোম্পানি। দেশের বাজারে এলপিজির বড় সরবরাহকারী এখন ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। তবে তাদের কোনো সরবরাহ সংকট নেই বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শুনছি বাজারে এলপিজির সংকট তৈরি হয়েছে। তবে ওমেরা-প্রিমিয়ার এলপিজির কোনো সরবরাহ সংকট নেই। হয়তো অন্য কোম্পানিগুলো সরবরাহ সংকটে পড়েছে। কী কারণে এ সংকট তৈরি হলো তা খোঁজ নেয়া জরুরি। তাহলেই সঠিক কারণটা জানা যাবে।’
তথ্যসূত্র
– https://tinyurl.com/yj9z8ys6


