প্রতিবেদন || আমেরিকার সাথে চুক্তি আলোচনার সময় আল-কায়েদার সাথে নিয়মিত পরামর্শ ও সমন্বয় করে গেছে তালিবান – জাতিসংঘের দাবি

0
1619
প্রতিবেদন || আমেরিকার সাথে চুক্তি আলোচনার সময় আল-কায়েদার সাথে নিয়মিত পরামর্শ ও সমন্বয় করে গেছে তালিবান – জাতিসংঘের দাবি

(সম্প্রতি তালিবান ও আল-কায়েদার মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের আলোকে বলা হয়েছে, তালিবান এখনো আল-কায়েদার সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই দুই দলের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পরামর্শ, সমন্বয় ও সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের সেই প্রতিবেদনের লিঙ্ক –
এই প্রতিবেদন নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন পশ্চিমা মিডিয়া বিশ্লেষণী রিপোর্ট করেছে। আমরা বাংলাভাষাভাষী পাঠকের সুবিধার জন্য এমন একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম। লং ওয়ার জারনাল নামক নিউজ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিশ্লেষণের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত অনুবাদ আমরা পাঠকের সামনে তুলে ধরছি। উল্লেখ্য লং ওয়ার জারনাল একটি নিউজ ওয়েবসাইট যা বিশেষভাবে বৈশ্বিক জিহাদী আন্দোলনের খবরাখবর নিয়ে বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট করে থাকে। সাধারণ নিউজ মিডিয়ার সাথে এই সাইটের পার্থক্য হল এটি ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসি (এফডিডি) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত।
এফডিডি একইসাথে একটি থিংক-ট্যাংক, লবি গ্রুপ এবং পলিসি ইন্সটিটিউট হিসাবে কাজ করে। যার অর্থ তারা আমেরিকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায়। এই প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার রাজনীতির নব্যরক্ষণশীল ধারার (নিও-কনজারভেটিভ) সাথে যুক্ত। যার ফলে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত নিউজ ওয়েবসাইট লং ওয়ার জারনাল অন্য দশটি মিডিয়ার মতো করে তথ্য উপস্থাপন করে না। বরং তারা গবেষণা করে বৈশ্বিক জিহাদী আন্দোলনের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য তুলে আনার চেষ্টা করে, যাতে করে এ ব্যাপারে আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা যায়। ফলে লং ওয়ার জারনালের প্রতিবেদনসমূহ সাধারণ পশ্চিমা মিডিয়ার রিপোর্টের তুলনায় তথ্যবহুল হয়ে থাকে। বিশেষ করে তারা মুজাহিদিনের অফিশিয়াল মিডিয়া থেকে প্রকাশিত সংবাদ এবং মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্র বাহিনীদের সূত্রে পাওয়া সংবাদের ভিত্তিতে তাদের প্রতিবেদনগুলো তৈরি করে থাকে।
তবে এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা সত্ত্বেও আল-ফিরদাউস, এই বিশ্লেষণকে শতভাগ সত্য হিসাবে গ্রহণ করছে না। আমরা একে শতভাগ সত্য হিসাবে উপস্থাপনও করছি না। আমরা পাঠকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই আমরা জাতিসংঘের এ প্রতিবেদন এবং এর উপরে তৈরি করা বিশ্লেষণ – কোনটির সত্যায়ন করছি না, আবার মিথ্যাও বলছি না। আল ফিরদাউস কেবল প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এ বিষয়ে একটি ইংরেজি প্রতিবেদনের সংক্ষেপিত বাংলা অনুবাদ পাঠকের সামনে তুলে ধরছে। – সম্পাদক, আল ফিরদাউস)

জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক দল সম্প্রতি নতুন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টটিতে তারা এমন একটি বিষয় তুলে ধরেছে, যা ২৯শে ফেব্রুয়ারীতে সম্পাদিত আমেরিকা-তালিবান শান্তি চুক্তির কিছু ধারার ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলের প্রকাশিত প্রতিবেদনের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনাকালীন আল-কায়েদার সাথে নিয়মিত পরামর্শ করেছে তালিবান। পাশাপাশি তালিবান ও আল-কায়েদার মধ্যে যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান সেই সম্পর্কের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের নিশ্চয়তাও দিয়েছেন তাঁরা। প্রকাশিত রিপোর্টে তালিবান ও আল-কায়েদার মধ্যে সম্পর্ক চলমান থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
আলোচ্য প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় মে মাসের ২৭ তারিখে, অর্থাৎ দোহায় আমেরিকা ও তালিবান একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় দুই মাস পর। চুক্তিতে আগ্রাসী সেনা প্রত্যাহারের সময় নির্ধারণ এবং আরো কিছু শর্ত দেওয়া হয় মার্কিন পক্ষকে। বিপরীতে আল-কায়েদার মতো দলগুলোকে তালিবান নিজেদের ভূখণ্ডে কাজ করতে দিবে না, এবং আমেরিকা ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আল-কায়েদার হুমকিকে অনুমোদন দিবে না—এমন শর্তে তালিবান সম্মত হয়েছে বলে মনে করা হয়।
কিন্তু, চুক্তির এ অংশের ভাষা অস্পষ্ট। আর আল-কায়েদার উপস্থিতি, পাশাপাশি আমেরিকার প্রতি দলটির হুমকির ব্যাপারে তালিবান বার বার মিথ্যা বলেছে। অথচ ১৯৯০ সাল থেকেই আল-কায়েদা আমেরিকার জন্য হুমকি। আমেরিকা ও তালিবানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত এই চুক্তিতে তালিবান চুক্তির শর্ত মেনে চলছে কি না তা যাচাই করার কোন পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়নি। তালিবান যদি চুক্তির শর্ত মেনে না চলে তাহলে কীভাবে তাঁদের তা মানতে বাধ্য করা হবে, বা আদৌ বাধ্য করা হবে কি না, তা নিয়েও কিছু উল্লেখ করা হয়নি। যদিও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের দাবি হল, চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না—তা পর্দার আড়ালে থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তালিবান ও আল-কায়েদার মাঝে চলমান সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করেছে। এই প্রতিবেদনে উঠে আসা অনেক তথ্যই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ জাতিসংঘের এধরনের প্রতিবেদনে সূত্র হিসেবে কেবল ‘সদস্য রাষ্ট্র’ এর কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আর ‘সদস্য রাষ্ট্র’গুলো সাধারণত এধরনের বিষয়ে তাদের কাছে থাকা তথ্যগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করে না।
টাইম ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন মিডীয়াতে জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনের তথ্য আলোচিত হয়েছে।
পর্যবেক্ষক দলের তথ্য মতে, আল-কায়েদার সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এখনো আফগানিস্তানেই আছেন। একইভাবে শত শত সশস্ত্র যোদ্ধাও সেখানে কাজ করছেন। এর মধ্যে আছে আল-কায়েদা উপমহাদেশের (একিউআইএস) সদস্যবৃন্দসহ যারা তালিবানের সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছেন, এবং অন্যান্য আরো কিছু বিদেশী জিহাদি সংগঠনের সদস্য যারা তালিবানের সাথে বিভিন্নভাবে যুক্ত।
এমনকি, পর্যবেক্ষক দলের রিপোর্ট তৈরির কাজ চলাকালীন সময়েও আফগানিস্তানে আল-কায়েদার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবি জাতিসংঘের।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি জালমাই খলিলজাদ আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তালিবান আল-কায়েদার সাথে “সম্পর্কচ্ছেদ” করবে, এমনকি আমেরিকার সাথে মিলে আল-কায়েদাকে “ধ্বংস” করার লক্ষ্যে কাজও করবে। কিন্তু, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক ভিন্ন অবস্থা দেখতে পাচ্ছেন। তারা দেখেছেন, আল-কায়েদার সাথে তালিবানের, বিশেষ করে হাক্কানী নেটওয়ার্কের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তাদের মধ্যে রয়েছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার দীর্ঘ ইতিহাস। সেই সাথে বন্ধুত্ব, মতাদর্শিক সহানুভূতি এবং বৈবাহিক সম্পর্কের বন্ধন।

আল-কায়েদা ও তালিবানের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মিটিং
‘সদস্য রাষ্ট্রগুলো’ তাদের পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলকে জানিয়েছে, ২০১৯ থেকে শুরু করে ২০২০ এর শুরু পর্যন্ত তালিবান ও আল-কায়েদার মধ্যে অনেকগুলো মিটিং হয়েছে। এসব মিটিং এ আলোচিত হয়েছে, বিভিন্ন অপারেশনের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং আফগানিস্তানের ভিতরে তালিবানের পক্ষ থেকে আল-কায়েদার সদস্যদের নিরাপদ ঘাঁটি দেয়ার মতো বিষয়গুলো।
জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত ১২ মাসে আল-কায়েদা ও তালিবানের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মধ্যে ৬টি উচ্চ-পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন থেকে উসামা বিন লাদেনের পুত্র ও আদর্শিক উত্তরাধিকারী হামযা বিন লাদেনের ব্যাপারে চমকপ্রদ একটি তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ এর বসন্তে হামজা বিন লাদেন আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের হেলমান্দ প্রদেশের সারওয়ান কালাহ জেলায় কয়েকজন তালিবান প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। তালিবানের প্রতিনিধিগণ ছিলেন সদর ইবরাহিম, মোল্লা মুহাম্মাদজাই এবং গুল আগা ইশাকজাই। এর মধ্যে গুল আগা ইশাকজাই বাল্যকাল থেকে তালিবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা উমরের কাছের লোক, এবং অন্যতম বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা। তাছাড়া তিনি তালিবানের অর্থনৈতিক বিভাগের প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তালিবানের এই তিনজন প্রতিনিধি হামজা বিন লাদেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন তাঁকে “ব্যক্তিগতভাবে এই আশ্বাস দিতে যে, ইসলামী ইমারত কোনো কিছুর বিনিময়েই আল-কায়েদার সাথে তাঁদের ঐতিহাসিক বন্ধন ছিন্ন করবে না”।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে হামজা বিন লাদেনকে হত্যা করার তথ্য প্রকাশ করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউজ এ তথ্য নিশ্চিত করে। তবে, হামজার মৃত্যুবিষয়ক বেশিরভাগ বিবরণই অস্পষ্ট। হামজার উপর কখন এবং কোথায় হামলা করা হয়েছিল তা ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানায়নি। হোয়াইট হাউজ বলেছিল, “হামজা বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা এবং বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনার জন্য দায়ী”। তবে হোয়াইট হাউজের বক্তব্য সুনির্দিষ্ট কোনো দলের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে বলেছে যে, ফেব্রুয়ারি ২০২০ এ স্বয়ং আইমান আল জাওয়াহিরি হাক্কানী নেটওয়ার্কের সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করেন। হাক্কানীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন হাফিজ আজিজউদ্দিন হাক্কানী ও ইয়াহইয়া হাক্কানীর মতো ব্যক্তিরা। ইয়াহিয়া হাক্কানী হলেন তালেবান নেতৃত্বাধীন ইসলামী ইমারতের ডেপুটি আমির এবং হাক্কানী নেটওয়ার্কের আমির সিরাজউদ্দিন হাক্কানীর শ্যালক। “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ও শান্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে” হাক্কানী প্রতিনিধি দল আইমান আল-জাওয়াহিরির সাথে “পরামর্শ” করেছিল। উল্লিখিত সভাটি কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এবং এতে আর কী কী বিষয় আলোচিত হয়েছিল—তা পরিষ্কার নয়।

ইয়াহইয়া হাক্কানী জাতিসংঘ ঘোষিত একজন ‘সন্ত্রাসী’। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়াহইয়া হাক্কানী আল-কায়েদার সাথে কাজ করে আসছে। তাঁর সম্পর্কে জাতিসংঘ বলছে, ইয়াহইয়া একসময় হাক্কানী নেটওয়ার্ক এবং আল-কায়েদার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার কাজ করেছে। আর আল-কায়েদার সাথে তাঁর সম্পর্ক কমপক্ষে ২০০৯ সাল থেকে। ইয়াহইয়া ঐ অঞ্চলে” আল-কায়েদার সদস্যদের ব্যক্তিগত খরচের জন্য অর্থ সরবরাহ করেছে”। পাশাপাশি আরব, উজবেক এবং চেচেনসহ অন্যান্য বিদেশী যোদ্ধাদের (মুহাজির) সাথে হাক্কানী নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে যোগাযোগের প্রাথমিক সূত্র হিসাবেও কাজ করেছেন ইয়াহইয়া হাক্কানী।
কাছাকাছি সময়ে তালিবানের সাথে আল-কায়েদার আরো কয়েকজন নেতা সাক্ষাত করেছেন। জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দলের মতে তাঁরা হলেন—আহমাদ আল-কাতারি, শায়খ আব্দুর রহমান, হাসান আল মাসরি ওরফে আব্দুর রউফ এবং আবু উসমান (যাঁকে বিশ্লেষকরা ‘আল-কায়েদার একজন সৌদি আরবিয়ান সদস্য’ বলে উল্লেখ করেছেন)।

তালিবানের পতাকাতলে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আল-কায়েদা
আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে পিছু হটার পর আল-কায়েদা নিজের নিরাপদ আশ্রয়স্থলের নিশ্চয়তা লাভ করার চেষ্টা করবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরে আল-কায়েদার উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হবার ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, বহু বছর আগে থেকেই আল-কায়েদা নেতৃবৃন্দ আফগানিস্তানে তালিবানের পতাকাতলে গোপনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিপুল তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট যে এতো বছরের যুদ্ধের পর আজও আল-কায়েদা বহাল তবিয়তে আফগানিস্তানে টিকে আছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলের কাছে আসা তথ্য বলছে আল-কায়েদা নীরবে আফগানিস্তানে শক্তি সঞ্চয় করে যাচ্ছে। পাশাপাশি তালিবানের সাথে মিলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
আফগানিস্তানের মোট ১২টি প্রদেশে আল-কায়েদা গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রদেশগুলো হলো—বাদাখশান, গজনী, হেলমান্দ, খোস্ত, কুনার, কুন্দুজ, লোগার, নানগারহার, নিমরুজ, নুরিস্তান, পাকতিয়া এবং জাবুল। খুব সম্ভবত অন্যান্য জায়গাতেও দলটি সক্রিয়। আফগানিস্তানে আল-কায়েদার মোট কতোজন সদস্য আছে তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, জাতিসংঘ পরিদর্শক দলের মতে “৪০০ থেকে ৬০০ জনের মতো সশস্ত্র যোদ্ধা বিদ্যমান”।
বাস্তবতা হল আফগানিস্তানে আল-কায়েদার উপস্থিতির প্রকৃত মাত্রা অজানা। তাদের উপস্থিতির প্রকৃত মাত্রা জানতে হলে বিভিন্ন জাতিনির্ভর (যেমন উজবেক, চেচেন ইত্যাদি) জিহাদি সংগঠনের সাথে তাদের যে সম্পর্ক রয়েছে তা আমলে নিতে হবে। সেই সাথে এই পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জিহাদি সংগঠনের সাথে আল-কায়েদার সম্পর্কও বিবেচনা করতে হবে। তাছাড়া আল-কায়েদা তালিবানের ইসলামী ইমারতের পতাকাতলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যার অর্থ হল আল-কায়েদা আফগানিস্তানে আমেরিকার উপর বিভিন্ন হামলা চালালেও সেগুলোর দায় আল-কায়েদার নামে স্বীকার করে না। এর একটি সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলটি গত বছরের বাগরামে হওয়া হামলার কথা উল্লেখ করেছে। হামলাটি চালিয়েছিলেন আল-কায়েদার যোদ্ধারা, কিন্তু দায় স্বীকার করেছিল তালিবান।

আল কায়েদা-হাক্কানীর নতুন যৌথবাহিনী?
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক টিম বলছে, সম্ভবত আল-কায়েদা ও হাক্কানী নেটওয়ার্ক আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে একটি যৌথবাহিনী গড়ে তুলেছে। অনির্ধারিত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্লেষকরা লিখেছেন যে, আল-কায়েদার অর্থায়নে ও তাদের সহযোগিতায় ২ হাজার সশস্ত্র যোদ্ধাদের সমন্বয়ে একটি নতুন যৌথ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে হাক্কানী নেটওয়ার্কের সিনিয়র ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
নবগঠিত এই বাহিনী দুটি অপারেশনাল জোনে বিভক্ত হবে। এর এক অংশের নেতৃত্বে থাকবেন হাফিজ আজিজুদ্দিন হাক্কানী, তাঁর অপারেশনাল জোনের অন্তর্ভুক্ত প্রদেশগুলো হলো—খোস্ত, লোগার, পাকতিকা এবং পাকতিয়া। আর কুনার এবং নুরিস্তান নিয়ে গড়া দ্বিতীয় অপারেশনাল জোনের নেতৃত্বে থাকবেন হাক্কানী নেটওয়ার্কের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শের খান মাঙ্গা। এছাড়াও এক ‘সদস্য রাষ্ট্র’ দাবি করেছে যে, আল-কায়েদা আফগানিস্তানের পূর্ব দিকে নতুন প্রশিক্ষণ শিবির প্রতিষ্ঠা করছে।
এই প্রস্তাব কী গৃহীত হয়েছে, এমন কোন যৌথবাহিনী কী গঠিত হয়েছে, তাঁরা কি কার্যক্রম শুরু করেছে—তা স্পষ্ট নয়। এর আগে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চলে আল-কায়েদা একটি ‘ছায়া বাহিনী’ গড়ে তুলেছিল। ২০০১ সালের পর থেকে লস্কর আল জিল নামের এই বাহিনী বিভিন্ন সময়ে পুনঃসংগঠিত হয়েছে। সম্ভবত জাতিসংঘের রিপোর্টে উঠে আসা এই যৌথ বাহিনী, লস্কর আল-জিলের নতুন রূপ।

চুক্তি নাকি বিজয়?
পর্যবেক্ষক দলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, “আল-কায়েদা গোপনে আফগানিস্তানে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁরা তালিবানের সাথে গভীর সম্পর্ক রেখেছে”।
‘সদস্য রাষ্ট্রদের’ দেয়া তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আপাতভাবে মনে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন না হয়ে বরং আল-কায়েদার সাথে তালিবানের সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে”। এক ‘সদস্য রাষ্ট্র’ বলেছে, আল-কায়েদা এবং তালিবানের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মাঝে অনুষ্ঠিত নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হয় আসছে, কাজেই তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হবে এটি কল্পনামাত্র। একই সূত্র আরো জানিয়েছে যে, “তালিবান ও আল-কায়েদার মাঝে সম্পর্ক গভীর। তাঁরা বিয়ের মাধ্যমে এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সুদৃঢ় বন্ধনে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আবদ্ধ”।
এছাড়া আল-কায়েদার বিভিন্ন “শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টামণ্ডলীর একটি নেটওয়ার্ক আছে” যারা তালিবানের ভিতরে থেকে (embedded) কাজ করেন। তাঁরা তালিবান যোদ্ধাদের পরামর্শ, দিকনির্দেশনা এবং আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন”। জাতিসংঘের রিপোর্ট মতে, ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে গজনী শহরে তালিবানের হামলা ছিলো আল-কায়েদার কার্যকর সহায়তার অন্যতম উদাহরণ।
আজ পর্যন্ত, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) তালিবান এবং আল-কায়েদার মধ্যে বিচ্ছেদের কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। অন্যদিকে আল কায়েদার অফিশিয়াল মিডিয়াতে দোহায় অনুষ্ঠিত ২৯শে ফেব্রুয়ারির চুক্তি জিহাদীদের জন্য “মহান বিজয়” আখ্যায়িত করা হয়েছে।


আহমাদ উসামা আল-হিন্দ, নির্বাহী সম্পাদকঃ আল ফিরদাউস নিউজ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন