ঈদুল আযহা ও ইসলাম বিদ্বেষীদের পশুপ্রেম

0
487
ঈদুল আযহা ও ইসলাম বিদ্বেষীদের পশুপ্রেম

ঈদুল আযহা ও ইসলাম বিদ্বেষীদের পশুপ্রেম

মুসলিম মিল্লাতের ঘরে ঘরে এখন সমাগত ঈদুল আযহার ঘনঘটা। শহুরে মানুষ ইতোমধ্যে ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। হাটে-বাজারে পশু কেনার ধুম।

তো এই কুরবানির ঈদ এলেই দেশের একশ্রেণির ‘মানুষের’ মনে তীব্র পশুপ্রেম জেগে উঠে। পশুপ্রেমে গদগদ হয়ে এরা নানাবিধ প্যাথেটিক বুলি আওড়াতে থাকে। সেকুলার-বাম-রাম-সুশীল সবাই একজোট হয়ে ‘জীবহত্যা’ বিষয়ক ডায়ালগ প্রচারে ব্যস্ত হয়ে উঠে।

তো চলুন এই ‘পশুজীবী’ শ্রেণিটির কথিত পশুপ্রেমের ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

এই শ্রেণিটি কোনো না কোনোভাবে বুদ্ধের ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। (যদিও মুখে তারা এটা স্বীকার করে না)। তাদের বক্তব্য হলো, এভাবে একটা ধর্মীয় সংস্কৃতি পালনের উপলক্ষে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পশু হত্যা করাটা অবশ্যই অমানবিক। পশুদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাদেরও অনুভূতি আছে। আঘাতে তাদের দেহ থেকেও রক্ত ঝরে।

বেশ ভালো কথা। তাদের এই বক্তব্যকে সঠিক ধরেই আর্গুমেন্ট দাঁড় করানো যাক।

এই শ্রেণিটি তাদের ছেলে-মেয়েদের বিবাহ অনুষ্ঠানে অতিথিদের নিশ্চয়ই আলুভর্তা দিয়ে আপ্যায়ন করে না। গরু-খাশি-মুরগির রোস্ট-নানা কিসিমের মাছ – এমন বাহারী আইটেমের খাবারের সমাহারে বিয়েবাড়ি ঘ্রাণারণ্যে পরিণত হয়। আমাদের প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে ‘জীবহত্যা’ দর্শন কোথায় থাকে ওই পশুজীবীদের? বিরোধিতা শুধু ইসলামের বেলায়ই?

ফি-বছর ১৫ আগস্ট মুজিবের নামে দেশব্যাপী যে ভোজের আয়োজন করা হয়, সেখানে হাজার হাজার গরু জবাই করা কি পশুহত্যা না? তখন তো ঠিকই শেয়ালের মতো হুক্কাহুয়া ডাক তুলে কুকুরের মতো লেজ উঁচু করে দৌড়ে চলে যায় ওইসব ভোজে অংশ নিতে। কোথায় থাকে তখন পশুপ্রেম?

বঙ্গভবনে নৈশভোজে গোশত-পোলাওয়ের দাওয়াত পেলে ছুটে যায় কারা?

বৈশাখ আসলে সেকুলারদের একটা কথা খুব বেশি বলতে শোনা যায়। ‘আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি।’ অর্থাৎ বাঙালি মাছ আর ভাত খেয়ে জীবন ধারণ করে।

সেকুদের কাছে প্রশ্ন, জীবহত্যা কি শুধু পশুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? মাছেরও তো জীবন আছে। কাটার পরে মাছের দেহ থেকেও তো রক্ত ঝরে। মাছেরও তো বেঁচে থাকার রাইট আছে। তাহলে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটা ডি-হিউম্যানাইজিং হয়ে যায় না? তারউপর পহেলা বৈশাখে যেভাবে ইলিশ-হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় বাঙালিয়ানার নামে, সেটা কেন বর্বরতা হবে না?

এছাড়া গাছেরও তো জীবন আছে। তাহলে শাকসবজি-ভাত-রুটি খাওয়া এ সবকিছুই তো জীবহত্যার অন্তর্ভুক্ত।

মূলত সেকুদের এই পশুপ্রেমটা ভারতপ্রেমের নির্যাস।

সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি নেতা অর্জুন সিং দেশটির হাইকোর্টে এই মর্মে উকিল-নোটিশ পাঠিয়েছে যে, কুরবানির ঈদে পশুদের যাতে কষ্ট না দেয়া হয়; আদালত যেন আইন করে গোহত্যা নিষিদ্ধ করে।

অথচ এই হিঁদুরাই বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ-পূজায় হাঁকডাক করে পশুবলি দেয়। পশুবলির সেই নির্মম চিত্র যে কেউ দেখলে আহত হবে।

আর এই হিন্দুরাই নাকি মুসলিমদের কুরবানিকে পশুহত্যা প্রমাণে আদালতে ধরনা দিচ্ছে? সত্যিই সেলুকাস!

এমনকি হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলোতেও  ‘পশুবলির’ অনুমোদন দেওয়া আছে।

‘মাংসাশনং য়ে কুর্বন্তি তৈঃ কার্যং পশুহিংসনম্। মহিষাজনরাহাণাং বলিদান বিশিষ্যতে’ (1)

‘যারা মাংসাশী, তারা দেবীর পূজায় পশু বলি দিতে পারবে; এবং এর জন্য – মহিষ, ছাগল ও বুনো শুয়োর উত্তম।’

তাহলে এক্ষেত্রে কেন পশুপ্রেমে ভক্তি উপচে পড়ে না? কেন ডাবলস্টান্ডার্ড নীতি?

মূলত কুরবানি ইসলামের একটি আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক ইবাদত। একদিকে পশু জবাই করে আল্লাহ তা’য়ালার সামনে ত্যাগের নমুনা পেশ করা (যদিও এর গোশত-রক্ত কোনোটিই তিনি গ্রহণ করেন না), অপরদিকে এর মাধ্যমে নিজের পরিবার, আত্মীয়-অনাত্মীয় এবং দরিদ্র মানুষদের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা।

কুরবানির হুকুম-আহকামগুলো অত্যন্ত সুবিন্যস্ত, সুবিবেচিত। রাসুল সা. পশু জবাই থেকে শুরু করে গোশত বণ্টন পর্যন্ত সবকিছু অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন।

ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করা, যাতেকরে পশুর কষ্ট না হয়; এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই না করা।

রাসুল সা. বলেছেন:

عَنْ أَبِي يَعْلَى شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه و سلم قَالَ: “إنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ”.
[رَوَاهُ مُسْلِمٌ].

নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তায়ালা সমস্ত জিনিস উত্তম পদ্ধতিতে করার বিধান দিয়েছেন। সুতরাং যখন তুমি হত্যা করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করবে আর যখন তুমি যবেহ্ করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে যবেহ্ করবে। তোমাদের প্রত্যেকের উচিৎ যবেহর পূর্বে ছুরি ধার দিয়ে নেওয়া; যে জন্তুকে যবেহ্ করা হবে তার কষ্ট লাঘব করা। (2)

এছাড়াও গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, মুসলিমদের পশু জবাই প্রক্রিয়া সবচেয়ে উত্তম প্রক্রিয়া। এভাবে জবাই করায় একদিকে যেমন পশুর কষ্ট কম হয়, অন্যদিকে দেহের রক্ত ঝরে পড়ায় গোশত জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়।

অপরদিকে হিন্দুদের পশুবলি নিছক বর্বরতা ছাড়া আর কি? পশুকে নির্মম পদ্ধতিতে হত্যা করা, পশুর দেহ গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া- এসব অনিষ্ট নয় কি? গৃহপালিত পশু মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক। এই রিযিকের অনিষ্ট করার অধিকার তাদেরকে কে দিয়েছে? অথচ এরাই নাকি মুসলিমদের পশু জবাই নিয়ে আদালতে মামলা করে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, কুরবানি মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুম। কোনো যুক্তি-তর্ক-আর্গুমেন্ট-লজিক ব্যতিরেকে বিনাবাক্যে আমরা মহান রবের এই হুকুমের সামনে আত্মসমর্পণ করি; ইসলাম-বিদ্বেষী রাম-বাম-নাস্তিকরা এতে যতোই ক্ষিপ্ত হোক না কেন, যতোই ঘেউ ঘেউ করুক না কেন, আমরা এর থোরাই কেয়ার করি।

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

‘আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সলাত আদায় করুন; আর কুরবানি করুন।’ (3)

আল্লাহ্‌ তা’য়ালা আরো বলছেন:

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

‘তোমরা নিজেরা তা থেকে খাও এবং দুঃস্থ অভাবীকে আহার করাও’ (4)

فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

‘তোমরা নিজেরা তা থেকে খাও এবং আহার করাও এমন লোকদের যারা তোমাদের কাছে চায়, আবার এমন লোকদের যারা মুখফুটে চাইতে পারে না। এভাবে আমি সেগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো’। (5)

রাসুল সা. বলেন: ‘তোমরা খাও, খাওয়াও এবং অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণ করে রাখ।’ (6)

হাদিসে ‘খাওয়াও’ শব্দটি দ্বারা আত্মীয়-অনাত্মীয়, দরিদ্র-অভাবীদের কুরবানির গোশত হাদিয়া দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অন্য হাদিসে রাসুল সা. বলেন,

حَدَّثَنَا أَبُو عَمْرٍو، مُسْلِمُ بْنُ عَمْرِو بْنِ مُسْلِمٍ الْحَذَّاءُ الْمَدَنِيُّ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ نَافِعٍ الصَّائِغُ أَبُو مُحَمَّدٍ، عَنْ أَبِي الْمُثَنَّى، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ إِنَّهَا لَتَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلاَفِهَا وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الأَرْضِ فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا ‏”

আল্লাহর নিকট কুরবানির দিনে আমল সমূহের মধ্যে রক্ত প্রবাহ তথা কুরবানি হতে অধিক প্রিয় অন্য কোনো আমল নেই। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ পাক কুরবানিকৃত পশুকে তার শিং,পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করবেন। কুরবানির পশুর রক্ত জমিনে গড়িয়ে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়। অতএব তোমরা খুশিমনে কুরবানি করো। (7)

উপর্যুক্ত আয়াত এবং হাদিসসমূহ কুরবানির অপরিহার্যতাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে। তাই মুসলিমরা আনন্দচিত্তে এই ইবাদত পালনে ব্রত থাকবে; হোক সেটা কাফির-মুনাফিকদের নিকট অপছন্দের।

সর্বোপরি কথা হলো, এই সেকুলার শ্রেণিটি ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রতিই বিদ্বেষাত্মক মনোভাব পোষণ করে। এরা নর্দমার কীটের চেয়েও মূল্যহীন। দ্বিচারিতাই এদের সুপ্রিম ভার্চু। হিন্দুয়ানাই এদের একমাত্র দর্শন।

সমগ্র পৃথিবীতে যখন মুসলিমদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, বোম্বিং করে মুসলিম শিশুদের কচি শরীরটাকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হচ্ছে, মুসলিমদেরকে চরমভাবে ডি-হিউম্যানাইজ করা হচ্ছে, তখন এই সেকুলার রাম-বাম-সুশীলরা মুখে কুলুপ এঁটে গোঁফে তেল ডলায় ব্যস্ত রয়েছে। এসব হত্যাযজ্ঞ দেখেও না দেখার ভাণ করছে। এমনকি কখনো কখনো পশ্চিমা আর ভারতীয় হিন্দু প্রভুদের সুরে সুর মিলিয়ে এসব গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইছে।

এদের প্রেম-মানবিকতা সব উথলে পড়ে কেবল পশুর বেলায়। এদের কাছে মুসলিমদের রক্তের চেয়ে পশুর রক্তের মূল্য বেশি।

এটা পশুপ্রেম নয়; এটা ভারতপ্রেম। এটা গোপূজার নতুনরূপ; এটা সুস্পষ্ট ইসলাম-বিদ্বেষ।

  1. শ্রীমদ্ দেবী ভাগবতম্, ০৩/২৬
  2. সহিহ মুসলিম
  3. সুরা কাউসার, আয়াত-২
  4. সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২৮
  5. সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৬
  6. সহিহ বুখারি
  7. তিরমিযি

    লেখক: উসামা মাহমুদ, প্রতিবেদক, আল-ফিরদাউস নিউজ।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন