ইন্দো-বাংলা সীমান্তে হত্যা বন্ধে বিএসএফের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি

0
774
ইন্দো-বাংলা সীমান্তে হত্যা বন্ধে বিএসএফের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি

হত্যা চলছে এবং এখনো নিরপরাধ ও নিরস্ত্র নাগরিকদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে বালাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত। ট্রিগার-হ্যাপি ভারতের সীমান্ত সন্ত্রাসীবাহিনী (বিএসএফ) এখনো বাংলাদেশী নাগরিকদের উপর গুলি বন্ধ করেনি এবং এমন কোন দিন নেই যেদিন সীমান্তের এপারে পরিবারগুলোর জন্য নতুন কোন ট্রাজেডি সৃষ্টি হয়না।

অনেক অযুহাতের মধ্যে বিএসএফের একটি বড় অযুহাত হলো তারা অবৈধ গরু পাচারকারীদের লাগাম টানতে চায়। পরিহাসের বিষয়, বিএসএফ কর্মকর্তারাই অবৈধ অর্থ কামাতে এই অবৈধ তৎপরতায় লিপ্ত। এ কথা এখন সবাই জানে।

অতি সম্প্রতি তিন ভারতীয় ব্যবসায়ীসহ এক বিএসএফ কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গরু পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ধরা পড়েছে।

বিএসএফ ৩৬ ব্যাটালিয়নের সাবেক কমান্ডার সতীশ কুমারকে তার সাঙ্গপাঙ্গসহ ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাকড়াও করেছে। তার ও আরো তিনজনের বিরুদ্ধে ২১ সেপ্টেম্বর মামলা দায়ের করা হয়েছে কলকাতার দুর্নীতি দমন বিভাগে।

মালদা ও মুর্শিদাবাদের সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত সতীশকে চিহ্নিত করে ভারতের কেন্দ্রিয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)। সিবিআই ২০১৮ সালের একটি গরু চোরাচালনের ঘটনা তদন্ত করছে।

সীমান্তে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর আগেও বিএসএফ কমান্ডেন্টদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরকম একটি লেনদেন থেকে ৪.৫ মিলিয়ন রুপি ঘুষ গ্রহণের দায়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কমান্ড্যান্ট ম্যাথুকে গ্রেফতার করা হয়।

বিএসএফের এসব অসৎ লোকেরা শুধু গরু চোরাচালানই নয়, মানব পাচার, মাদক চোরাচালানসহ আরো অনেক অবৈধ উপায়ে টাকা কামাই করছে। কিন্তু দায়ি করা হয় শুধু বাংলাদেশীদের। আর হত্যা করে তাদেরকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়। মৃত্যু ব্যক্তি কিছু বলে না।

দুঃখের বিষয়, এমন কি যখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক চলে তখনও হত্যাকাণ্ড থেমে থাকে না। একদিকে করমর্দন ও অন্যদিকে হত্যাকাণ্ড, বাংলাদেশীদের লাশের স্তুপ।

চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলনে অংশ নিতে ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তারা যখন সীমান্ত পার হচ্ছিল তখনও বিএসএফের গুলিতে নিহত এক বাংলাদেশীর লাশ দিনাজপুর সীমান্তে পরেছিলো।

দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয় লাশটি ছিলো তরুণ বাংলাদেশী জাহাঙ্গীর আলমের, যাতে পচন ধরেছিলো। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ৫০০ গজ দূরে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে লাশটি পরেছিলো। বিডিআর-বিএসএফ পতাকা বৈঠকের পর বিকেলে তার লাশটি নিয়ে আসা হয়। জাহাঙ্গীর আলমের পরিবার জানান তাকে বিএসএফ হত্যা করেছে।

এটা বেদনাদায়ক, আবার বেদনাদায়ক নয়ও। কারণ চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সীমান্ত এলাকায় ৪০ বাংলাদশীকে হত্যা করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন-ও-সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায় যে এদের ৩২ জনকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করেছে। পাঁচজনকে বিএসএফ নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। বাকি দুই জনের নিহত হওয়ার কারণ জানা যায়নি। কারণ তাদের লাশ পচে যাওয়ায় কিছু বুঝা যায়নি।

আসকের রেকর্ড অনুযায়ী, গত বছর জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর মেয়াদে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে ২৮ বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি বছর মার্চে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সীমান্তে কোন হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। কিন্তু এটা সাময়িক বিরতি মাত্র। এপ্রিলেই বিএসএফের গুলিতে ৩ জন নিহত হয়। মে’তে নিহত হয় ১ জন। জুনে হত্যা করা হয় ৭ জনকে। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিলো ৩, আগস্টে ৫ ও সেপ্টেম্বরে ৪ জনকে হত্যা করা হয়।

সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে বলে ভারতের প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও এসব হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ে পিএইচডি গবেষক ও মানবাধিকার অ্যাকটিভিস্ট সজল আহমেদ বলেন, হত্যাকাণ্ড শূন্য হয়নি, তাদের প্রতিশ্রুতিটাই শূন্য হয়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, তারা প্রাণঘাতি অস্ত্র দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েই চলেছে। তাদের মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোন লক্ষণ নেই।

এদিকে, ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়। বৈঠকে বিজিবি’র ডিজি মেজর জেনারেল মোঃ সাফিনুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের বাংলাদেশী প্রতিনিধি দল ও বিএসএফ ডিজি রাকেশ আসতানার নেতৃত্বে ৬ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।

মিডিয়ার সঙ্গে আলাপকালে বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, বিজিবির অবস্থান হলো ‘হত্যা করা যাবে না, গুলি করা যাবে না’।

হত্যা কমছে না

আসক জানায়, ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৫২২ বাংলাদেশীকে ভারত সীমান্তে হত্যা করা হয়েছে। এদের ৩২৪ জনকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করেছে। ১৫৯ জনকে বিএসএফ সদস্যরা নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। ২০১৯ সালে এই হত্যাকাণ্ড বাড়তে শুরু করে। এখনো তা ঘটেই চলেছে।

সেপ্টেম্বরে এ পর্যন্ত ৪ জনকে হত্যা

সীমান্তে সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত ৪ বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ।

মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টদের মতে এই হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকার পেছনে কারণ দায়মুক্তি। যেসব বিএসএফ সদস্য বাংলাদেশীদের হত্যা করে তাদেরকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। এর বড় উদাহরণ মর্মান্তিক ও আইকনিক ফেলানির হত্যাকাণ্ড। এমনকি ভারতের মানবাধিকার গ্রুপগুলোকে ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য লড়াই করেছে। কিন্তু এখনো অবিচারটিই বিরাজ করছে।

আত্মরক্ষার জন্য গুলি করেছে বলে বিএসএফ যে অযুহাত দেয় তা কোনভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। নিহতরা সবাই নিরস্ত্র ও নিরপরাধ গ্রামবাসী। তারা যদি অনুপ্রবেশ করে থাকে, এমনকি চোরাকারবারও করে, তারপরও এসব অপরাধ দমনের জন্য আইন আছে। বাংলাদেশের এসব নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা করার অধিকার কারো নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেশীদের বশ্যতা হারানোর আশঙ্কা করে ভারত ‘ক্ষতে প্রলেপ’ দেয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণের সময় এসেছে তাদের। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এটা শুধু শত্রুতা বাড়াবে।

ভারত সীমান্তে প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত থাকা ও হত্যাকাণ্ড শূন্যে নামিয়ে আনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি না রাখলে, দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়বে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন