তথ্য সন্ত্রাস : পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে সন্ত্রাস করে

9
6581
তথ্য সন্ত্রাস : পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে সন্ত্রাস করে

বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ—এ কথাটি যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো—বর্তমান যুগ তথ্য সন্ত্রাসের যুগ। তথ্য যদি হয় সম্পদ, তবে সেই সম্পদের দখল নেওয়ার জন্য চলছে সন্ত্রাস, চলছে তথ্যের অপব্যবহার।

বিশ্বের কোথাও কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটলে, মুহূর্তের মধ্যেই সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। বিশ্বের এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে বসে জানতে পেরে আমরা আনন্দিত হই। অথচ ঘটনার ঠিক ততটুকুই আমরা জানতে পারি, যতটুকু মিডিয়া জানায়। আর মিডিয়া ঠিক ততটুকুই জানায়, যতটুকু জানালে তাদের স্বার্থোদ্ধার হয়। এ হিসেবে, যারা পশ্চিমা মিডিয়ার দেওয়া তথ্যের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে কথা বলে, তারা আসলে পশ্চিমাদের একজন এজেন্টে পরিণত হয়। পশ্চিমারা যেভাবে দুনিয়াকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে চায়, এসব লোকেরা ঠিক সেভাবেই দুনিয়াকে দেখে এবং মানুষকেও সেভাবে দেখার আহ্বান জানায়।

সংবাদমাধ্যমগুলো বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করার কথা বলে থাকে। এটা তাদের চরম মিথ্যা কথা। এমন কোনো সংবাদমাধ্যম দেখা যায় না, যারা নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে। আসলে এটা অনেকটা অসম্ভবও। আপনার আদর্শের প্রভাব আপনার লেখায় পড়বেই। আপনার আদর্শ যদি সত্য হয়, তবে মানুষকে এই আদর্শের দাওয়াহ দেওয়া আপনার কর্তব্য। এটা দোষণীয় না; তবে দোষণীয় হলো নিরপেক্ষতার নামে ধোঁকাবাজি করা। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচারের কথা বলে মিথ্যাচার করে, মানুষকে ধোঁকা দেয়। এরা প্রধানত দুইভাবে মানুষকে ধোঁকা দেয়, মানুষের মগজ ধোলাই করে।

১. সরাসরি মিথ্যাচার করা:

এর জঘন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ২০১৮ সালের ৯ই আগস্ট বিবিসির প্রচারিত একটি নিউজ। সেখানে তারা সুস্পষ্টভাবে মিথ্যাচার করেছে। প্রথমে তারা নিউজের শিরোনাম দেয়, ‘ইসরায়েলী বিমানহামলায় নারী ও শিশু নিহত’। নিউজটির মূল বিষয় ছিল, গাজায় ইসরায়েলী বিমান হামলায় এক গর্ভবতী নারী এবং শিশুসহ তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
নিউজটি ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নজরে পড়লে সে বিবিসিকে অতিদ্রুত তা সরিয়ে ফেলার আদেশ দেয়। এ আদেশের কিছু সময় পরই বিবিসি এই শিরোনাম ও নিউজ সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়। নতুনভাবে শিরোনাম করে যে, ‘গাজার বিমানহামলায় ইসরায়েলে নারী ও শিশু নিহত’। বিবিসির এই ধোঁকাবাজি নিয়ে এরপর অনলাইনে ব্যাপক সমালোচনা হয়।[১]
এই ঘটনা এসব হলুদ মিডিয়ার বাস্তব রূপ উন্মোচন করে দিয়েছে। এভাবেই হলুদ মিডিয়াগুলো প্রতিনিয়ত মুজাহিদিন এবং মুসলিমদের নিয়ে নানারকম মিথ্যাচার করে থাকে।

২. কৌশলে নিজেদের মতবাদ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার করা:

এটা তারা করে থাকে তিনভাবে।

ক. শিরোনামের মাধ্যমে:
‘মসজিদে ইমামের কক্ষে তিন শিশুর লাশ’(২) শিরোনাম দেখে মনে হবে, ইমাম নিজে হত্যা করেছেন; হয়তো ধর্ষণ করার পর হত্যা করেছেন ইত্যাদি। শিরোনাম আগে থেকেই পাঠকের মাথায় একটি চিন্তা গেঁথে দেবে। হাজার হাজার লোক ফেসবুকে নিউজফিডে শুধু এই শিরোনাম দেখে হয়তো ইমামদের ২টা করে গালি দেবে। কিন্তু মূল খবর হলো ইমামের সন্তান আর দুই ভাতিজা ভুলক্রমে সৌর বিদ্যুতের লাইনের পানি খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। এটা হলো শিরোনামের মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা।

আরেকটি উদাহরণ দেখুন, ‘মুখে খাবার তুলে দেয়া উপকারীকেই হত্যা করলো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা’ এরকম একটি রিপোর্ট করেছিল ঢাকাট্রিবিউন (৩)। এখানে শিরোনাম দেখে মনে হবে রোহিঙ্গারা সাহায্যকারী বাঙ্গালিদের পরিকল্পনা করে খুন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিহত ব্যক্তির বাবা বলেছে এলাকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ খুন করিয়েছে। আর এই কাজে হয়তো রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করেছে। কিন্তু এই বাস্তবতা শিরোনাম দেখে বুঝার কোনো উপায় নেই। হাজার হাজার মানুষ এই শিরোনাম দেখে রোহিঙ্গাদের গালি দিয়েছে। এটা হলো শিরোনামের মাধ্যমে তথ্য সন্ত্রাসের আরেকটি উদাহরণ।

খ. ভাষার মাধ্যমে:
কাশ্মীরে মালাউন হিন্দুদের সাথে যুদ্ধের সময় ভারতীয় মিডিয়াগুলো লেখে,
‘পুলওয়ামা এনকাউন্টারে নিকেশ এক জঙ্গি, পাল্টা হামলায় শহিদ সেনা জওয়ান’(৪)
এখানে একজন স্বাধীনতাকামী মুসলিম শহিদ হওয়ার বিষয়টিকে তারা নিকৃষ্টভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। আর তাদের মালাউন মুশরিক সেনা নিহত হওয়ার বিষয়টিকে বলছে শহিদ!

একইভাবে মুজাহিদিনের ব্যাপারে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি শব্দের ব্যবহার ভাষার মাধ্যমে তথ্য সন্ত্রাসের অন্যতম উদাহরণ। আরেকটি উদাহরণ হলো সিটিটিসির মনিরুল যেমন সবসময় বলে, কথিত জিহাদ। সে কিন্তু জিহাদ বলে না। এর মাধ্যমে মনিরুল মূলত আমাদের জিহাদের দাওয়াহকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।

৩। খবর বাছাই:

সারাবিশ্বে দৈনিক কত ঘটনা ঘটে? নিশ্চয়ই অগণিত; এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু এসব ঘটনার সবগুলো কি আমরা জানতে পারি? অবশ্যই না, বরং আমরা সেসব ঘটনাই জানতে পারি, যা মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। অর্থাৎ, একজন সাধারণ দর্শক মিডিয়ার মাধ্যমেই দুনিয়াকে দেখে। যে খবর মিডিয়া চেপে যাচ্ছে, সেটা হয়তো দর্শকের চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন অবশ্য তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার একটি প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এখনো এ ময়দানে হলুদ মিডিয়ার প্রভাব অনেক বেশি। তাই হলুদ মিডিয়া এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত তথ্য সন্ত্রাস চালিয়ে যায়। কোনো একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্রমাগত খারাপ সংবাদ পরিবেশন করে মানুষের মন ঐ গোষ্ঠীর প্রতি বিষিয়ে তুলে। এ বিষয়ে অন্যতম একটি উদাহরণ হলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিডিয়াগুলোর চালানো প্রোপাগান্ডা। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ দখল করে নেবে, বাংলাদেশের সব খাবার খেয়ে ফেলবে, ওদের কারণে দুর্ভিক্ষ হবে—এমন ধরনের রোহিঙ্গাবিদ্বেষী নিউজ একযোগে প্রচার করেছে সবগুলো মিডিয়া।
আর এর প্রভাবও আমরা বাস্তবে দেখেছি। যে মানুষগুলো রোহিঙ্গাদেরকে প্রথমে খাবার-পানি দিয়ে সহযোগিতা করেছিল, কিছুদিন পর দেখা গেল তারাই রোহিঙ্গাদেরকে হিংস্র বৌদ্ধ সেনাদের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে। এটি ক্রমাগত একই ধরনের খবর প্রচারের মাধ্যমে হলুদ মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাসের একটি উদাহরণ।

উপরোক্ত আলোচনায় হলুদ মিডিয়ার ধোঁকা দেওয়ার তিনটি পদ্ধতি সম্পর্কে আশা করি স্পষ্ট ধারণা হয়েছে। এভাবেই মূলত পশ্চিমা হলুদ মিডিয়াগুলো নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের নামে তথ্য সন্ত্রাস চালিয়ে থাকে। সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য; বিশ্বসন্ত্রাসীকে শান্তিপ্রতিষ্ঠাকারী, আর শান্তিপ্রতিষ্ঠাকারীকে মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী হিসেবে এরাই মানুষের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়। আর তাদের এসব তথ্য সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ধ্বংসের পথে পা বাড়ায় অনেক অবুঝ মানুষ; শত্রুকে বন্ধু ভেবে আপন করে নেয়, আর বন্ধুকে শত্রু মনে করে দূরে ঠেলে দেয়। তাই, শত্রু-মিত্র নির্ধারণে একজন মুসলিমকে আরো সচেতন হতে হবে। আধুনিক তথ্য সন্ত্রাস যেন আমাদের পথচ্যুত না করে, সেদিকে খেয়াল থাকতে হবে।


Footnote:
১। BBC bows to pressure from Israel and changes Gaza headline, August 10, 2018, Middle East Monitor; https://cutt.ly/wjXG1Hp
২। মসজিদে ইমামের কক্ষে তিন শিশুর লাশ, ৩০শে আগস্ট, ২০১৯, কালের কণ্ঠ; https://cutt.ly/yj3ke7c
৩। মুখে খাবার তুলে দেয়া উপকারীকেই হত্যা করলো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা, ২৩শে আগস্ট, ২০১৯, ঢাকা ট্রিবিউন; https://cutt.ly/zj3cur9
৪। পুলওয়ামা এনকাউন্টারে নিকেশ এক জঙ্গি, পাল্টা হামলায় শহিদ সেনা জওয়ান, ১২ই আগস্ট, ২০২০, ডেইলি হান্ট; https://cutt.ly/Uj3cMrb

9 মন্তব্যসমূহ

  1. মাশাআল্লাহ খুবই সুন্দর, তথ্যবহুল ও গোছানো আলোচনা । আল্লাহ লেখকের কলমে বারাকাহ দান করুন আমীন। আর ভাই, সম্পাদকীয়টা নিয়মিত হলে ভালো হয়… অন্যান্য পত্রিকা গুলোতে আমরা অনেকে নজর বুলাই অধিকাংশ সময় সম্পাদকীয় পড়ার জন্য। তো এখন যদি আমাদের ঘরের মানুষের লেখা সম্পাদকীয় থাকে, তাহলে বাহিরে যাওয়ার আর কী দরকার!!!

  2. আলহামদুলিল্লাহ! মুহতারাম ভাইয়ের লেখাটা অনেক গোছানো।
    এর বিপরীতে মুসলিমদের যেসব বিষয় খেয়াল রেখে সংবাদ পড়তে হবে এবং লিখতে হবে সেটাও যদি থাকত উম্মাহ আরো বেশি উপকৃত হত ইনশাআল্লাহ!
    আল্লাহর কাছে আপনার এই সুন্দর কাজের পূর্ণ জাযা কামনা করছি।

  3. মুহতারাম মডারেটর ভাইদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষন করছি………
    আশা করি আমার কমেন্ট টি পাবলিশ করবেন, কারন এটি আপনার এই প্রতিবেদন এর সাথে খুবই প্রাসঙ্গিক। গতকাল সময় টিভির একটি নিউজ দেছিলাম সেখানে একটি ভিডিও দেখিয়ে বলতেছে যে আফগানিস্তানে সাধারন মানুষ নাকি তালিবান এর ভয়ে পালাচ্ছে !! অথচ ভিডিও তে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে সাধারন মানুষ তালিবান এর পতাকা হাতে নিয়ে বিজয় উদযাপন করছে !! অথচ এই ভিডিও দেখিয়ে এই দাজ্জালি সাংবাদিক রা বলছে যে সাধারন মানুষ পালাচ্ছে !! আমি পুরোপুরি অভাক হয়ে গেলাম ! এমন একটি হাস্যকর মিথ্যা অরা কিভাবে প্রচার করছে !! তাই ভাই আপনাদের কাছে একান্ত অনুরুধ সময় টিভির এই নিউজ টা নিয়ে আপনারা সুন্দর রকটি প্রতিবেদন করবেন ইনশা-আল্লাহ।
    নিউজ লিঙ্কঃ https://www.youtube.com/watch?v=qE_qB4PgXNY

  4. এখন আমার কাছে মনে হয় এ প্রতিবেদনটা ভাইরাল করা দরকার আর সাথে সাথে ওদের প্রত্যেকটা সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে আমাদের কঠিনভাবে নিরীক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা দরকার ৷ এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা আপলোড করা দরকার ফেসবুক টুইটার ইত্যাদিতে এগুলোর পর্যালোচনা ও সমালোচনা তুলে ধরা দরকার অর্থাৎ যে সব গণমাধ্যমে মানুষ সাধারণত সংবাদগুলো পায় এসব এর ব্যাপারে তাদের কাছে ধারাবাহিক পর্যালোচনা গুলো পোঁছা দরকার ৷

Leave a Reply to ahchanhabib প্রতিউত্তর বাতিল করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন