আফগানে আফিম নিয়ন্ত্রণে তালেবানের ভূমিকা : প্রথম আলোর মিথ্যাচারের জবাব

2
1820
আফগানে আফিম চাষে তালেবানের ভূমিকা : প্রথম আলোর মিথ্যাচারের জবাব

বর্তমান কুফুরি বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের প্রায় সকল দেশ মাদক সেবনকে বৈধতা দান করেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত হলো মাদকসেবীদের স্বর্গরাজ্য। মাদকের সেই স্বর্গরাজ্যে বসে ব্রহ্ম চেলানি নামক এক হিন্দুত্ববাদী আফগানিস্তানের মাদক ব্যবসা সম্বন্ধে একটি আগাগোড়া মিথ্যাচারে ভরপুর কলাম লিখেছে। আর তার সেই কলাম অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে হিন্দুত্ববাদের সেবাদাস কুখ্যাত হলুদ মিডিয়া প্রথম আলো। এ ধরনের মিথ্যাচার প্রচার-প্রসারে প্রসিদ্ধি লাভ করায় অনেকে প্রথম আলোকে বিভিন্ন ব্যঙ্গায়িত বিশেষণে বিশেষায়িত করে থাকেন। যেমন: প্রথম কালো, প্রথম অন্ধকার, প্রথম আলু, প্রথমালু ইত্যাদি।

ইসলামি শাসনব্যবস্থা নিয়ে অপরাধীচক্রের আখড়া এই পত্রিকাটির সমস্যা এর জন্ম থেকেই। আফগানিস্তানে যেহেতু মুসলিমরা ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে ইসলামি ইমারত গড়ে তুলেছেন, তাই ইসলামি ইমারতের নামে জঘন্য মিথ্যাচারে লিপ্ত রয়েছে প্রথম আলো। তারই অংশ হিসেবে প্রথম আলো গত ১৬ই নভেম্বর ব্রহ্ম চেলানির একটি কলাম ‘মাদক ব্যবসা ছাড়তে পারবে না তালেবান’ শিরোনামে অনুবাদ করে প্রকাশ করে।

ব্রহ্ম চেলানি তার লেখায় তালেবানের ব্যাপারে যে দাবিগুলো করেছে, তার কয়েকটি হলো, তালেবান সরকারের উচ্চপদে রয়েছেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ও মাদকসম্রাটেরা, আফগানিস্তানে বিশ্বের ৮০ ভাগ আফিম চাষ হয় আর এ কারণে তালেবান সবচেয়ে বড়ো মাদকব্যবসায়ী এবং আফিম চাষ ও পাচার সংক্রান্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তালেবান, তালেবান মাদক ব্যবসা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, তালেবান আইএসের শত্রু কারণ আইএস নাকি তালেবানের মাদকব্যবসায় বাঁধা দেয়, তালেবান বিশ্বের অন্যান্য জিহাদি সংগঠনের সাথে মাদকব্যবসা সংক্রান্ত সম্পর্ক রাখে ইত্যাদি।

ব্রহ্ম চেলানি তার এসব দাবির সপক্ষে কোনো ধরনের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। তাই তার এসব মুখস্থ মিথ্যাচারের জবাবে আসলে বেশিকিছু বলার দরকার নেই। তবে সাধারণ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আফগানিস্তানে আফিম চাষ এবং এ ব্যাপারে আফগানিস্তান ইসলামি ইমারতের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কিছু কথা বলা জরুরি মনে হচ্ছে।

আফগানে মাদকব্যবসার নেপথ্যে কে?

আফগানিস্তানে ঐতিহাসিকভাবেই আফিম উৎপাদন হয়। তবে আফিমের উৎপাদন বেড়েছিল ১৯৭০ সালে মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারের আমলে। এরপর ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে ইসলামি ইমারতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ২০০১ সালে মার্কিন হামলার আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানকে আফিমমুক্ত করতে চেষ্টা চালান ইসলামি ইমারত। এ সময় তারা আফিম উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা, ইসলামী বিধি-নিষেধের প্রচার-প্রসার, আফিমের বিকল্প হালাল পণ্যের উৎপাদনে উৎসাহিতকরণের মাধ্যমে আফগানিস্তানকে অনেকাংশে আফিমমুক্ত করতে সক্ষম হন। তখন আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এরপর ২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসন শুরু হলে আবারও খুব দ্রুত আফিম উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এমনকি মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ২০০৬ সালে আফগানিস্তানে বিশ্বের ৯০ শতাংশ আফিমের চাষ হয় এবং আফিম উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত থাকে। আর এই আফিম উৎপাদন ও পাচারে জড়িত ছিল আমেরিকার মদদপুষ্ট ক্ষমতাচ্যুত আফগান সরকার।

এ বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের অনলাইন পোর্টালে ২০১৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী ‘Tasked With Combating Opium, Afghan Officials Profit From It’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটিতে হেলমান্দ প্রদেশে সরকারের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলাকায় আফিমের চাষ সম্বন্ধে বলা হয়, “বিগত পপি চাষের ঋতুতে আফিমের সবুজ ডাঁটা ও স্ফীত কন্দ সরকারী ভবনসমূহের চোখের নাগালে মোটা ও উঁচু হয়ে বেড়ে ওঠছিল। এটি সরকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্থানীয় মাদকরাষ্ট্রের লক্ষণ।”

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, গরমশির জেলায় পপি চাষ ছিল স্থানীয় সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস। সেখানে সরকারী কর্মকর্তারা আফিম চাষীদের উপর কর আরোপ করতো। তৎকালীন আফগান সরকার যে মাদক ব্যবসায় সরাসরি জড়িত ছিল গরমশির জেলা তার একটি উদাহরণ মাত্র।

এভাবে ২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়ে ২০২১ সালের ১৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মার্কিন মদদপুষ্ট আফগান সরকার আফগানিস্তানে মাদক ব্যবসার প্রসারে সরাসরি জড়িত ছিল। যার ফলাফলস্বরূপ বর্তমানে বিশ্বের আফিমের শতকরা ৮০ভাগই যোগান দেয় আফগানিস্তান। মার্কিন মদদপুষ্ট আফগান সরকার যে মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে, সেটির দায়ভার এখন নতুন ক্ষমতায় আসা ইসলামি ইমারতের উপর চাপানো হচ্ছে! অথচ, এই ইসলামি ইমারতই আগের শাসনামলে আফগানিস্তানকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আফিমমুক্ত করেছিলেন এবং বর্তমানে ক্ষমতায় এসেও আফগানিস্তানকে আফিমমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

আফিমমুক্ত আফগানিস্তান গড়তে ইসলামি ইমারতের পদক্ষেপসমূহ:

গত ১৫ই আগস্ট কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইসলামি ইমারত আফগানিস্তানের সংস্কৃতি ও তথ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী মুহতারাম জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ হাফিজাহুল্লাহ বলেছেন, “দেশে আফিম চাষ থাকবে না, মাদক ব্যবসা কিংবা চোরাচালান থাকবে না। আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি, আমাদের যুবকেরা মাদকে চরমভাবে আসক্ত। এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে।”

ইসলামি ইমারত ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হলো, মাদকাসক্তদের রাস্তা থেকে তুলে এনে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে তাদের উপার্জনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা। এছাড়া, আফিম চাষ বন্ধের ঘোষণা দেয়ায় আফগানিস্তানে মাদকের দাম বেড়ে গেছে বলে গণমাধ্যম জানিয়েছে। এটাও মাদক নির্মূলে ভূমিকা রাখবে। কারণ, কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সেটির যোগান কমে যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেটা দুর্লভ হয়ে যাওয়া। কোনো খারাপ বিষয় থেকে জনসাধারণকে দূরে রাখতে অনেকেই এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করেন। কিন্তু এই বিষয়টিকেও প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইসলামি শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের ইমান-আমলের যত্ন নেওয়ার উত্তম পরিবেশ থাকে এবং সকল অপরাধ-অপকর্মের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে ইসলামি শাসনব্যবস্থা দুনিয়ার সকল অপরাধীদের জন্য আতংকের নাম। প্রথম আলোর মতো হলুদ মিডিয়াগুলো যেহেতু অগণিত অপরাধের আসামি, তাই ইসলামি শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাদের এত মাথাব্যথা।

লেখক: সাইফুল ইসলাম


তথ্যসূত্র:

১. Tasked With Combating Opium, Afghan Officials Profit From It; 15 February 2016, The New York Times; https://cutt.ly/yTGepPW

২. Afghanistan ‘will not be a country of cultivation of opium anymore’, Taliban insists; 18 August 2021, Independent; https://cutt.ly/nTGe61J

৩. Opium production in Afghanistan : Is the US or the Taliban responsible?; https://cutt.ly/cTGeJZx

৪. Photos show homeless heroin addicts in Afghanistan rounded up and forced into grim rehab by the Taliban; 10 October 2021, Business Insider; https://cutt.ly/wTGrNZn

2 মন্তব্যসমূহ

  1. এসব হলুদ মিডিয়া তাদের প্রভুদের পরাজয় বরণ করতে না পেরে এখন বিজয়ীদেরকে নানা ভাবে গালি দিচ্ছে। এছাড়া তো তাদের করারও কিছু নেই। বেচারা!!!!!!!

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন