
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগে আওয়ামী মদতপুষ্ট দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাভোগী বিচারকরা এখনো বহালতবিয়তে রয়েছে। সামান্য কিছু অদলবদল আর অবসরের ফাঁকে পার পেয়ে যাচ্ছে এদের বেশিরভাগ।
দলকানা এসব বিচারকের বিরুদ্ধে রয়েছে বিগত ১৬ বছরে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের জেল-জুলুম ও রিমান্ড অনুমোদনের পাহাড়সম অভিযোগ। রয়েছে দলীয় পরিচয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার ঘটনা। অভ্যুত্থানের এক বছরেও এসব বিচারক সম্পর্কে নেই কোনো তদন্ত বা শাস্তি।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসন টিকিয়ে রাখতে সহায়তাকারী এসব বিচারককে বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে অভ্যুত্থানের পরপরই। গত বছরের ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া উচ্চ আদালতের দলবাজ বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবি করে। পরে সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে ৩০ সেপ্টেম্বর বার ভবনের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ২৯ জন দলীয় দুর্নীতিবাজ বিচারপতির তালিকা প্রকাশ করে তাদের পদত্যাগের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। ১৬ অক্টোবর জুডিশিয়াল ক্যু চেষ্টার অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করা হয়। ওই ঘটনার পর হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতিকে কোনো বেঞ্চ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি পদত্যাগ করে। এরও কয়েক মাস পর বিচারপতি খিজির হায়াতকে ১৮ মার্চ এবং বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানকে ২২ মে অপসারণ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর অতিক্রান্ত হলেও বেঞ্চ ফেরত বাকি অভিযুক্ত বিচারপতিদের বিষয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে এখনো তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। এ তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউই কিছু বলতে পারছে না। আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী আরো যে চিহ্নিত ২৯ জন বিতর্কিত বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করা হয়েছিল, তাদের বিষয়ে কোনো ধরনের তদন্তের উদ্যোগের কথা জানা যায়নি।
অভিযুক্ত এসব বিচারপতির মধ্যে রয়েছে জিয়াউর রহমানকে ‘ডাকাত’ হিসেবে গালি দেওয়া, জুলাই বিপ্লবে পুলিশকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশদাতা কিংবা খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা বিচারপতিরাও। আছে আওয়ামী দলীয় ক্যাডার তালিকায় নিয়োগ পাওয়া নাঈমা হায়দার, যার বিরুদ্ধে রয়েছে প্রকাশ্য দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ। আছে আওয়ামী ক্যাডার হিসেবে পরিচিত বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম। আরো আছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুনের মামলার প্রধান আসামি রুহুল কুদ্দুস বাবু। প্রধান বিচারপতির দরজায় লাথি মারা ও ভাঙচুরে অভিযুক্ত এই বিচারপতি।
দলীয় কোটায় নিয়োগ পাওয়া কট্টর আওয়ামীপন্থি বিচারপতি জেবিএম হাসান। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে উপরোক্ত কারো বিরুদ্ধেই কোনো ধরনের তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি।
নিম্ন আদালত
উচ্চ আদালতের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা নিম্ন আদালতে। কখনো সাবেক ছাত্রলীগ, কখনো আনিসুল হক বা তার বান্ধবী তৌফিকা করিমের সঙ্গে যোগসাজশের ভিত্তিতে কিংবা কামরুল ইসলামের লোক পরিচয়ে বিগত দেড় যুগ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত বিচারকদের সবাই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঢাকার সাবেক সিএমএম জুলফিকার হায়াত। আওয়ামী লীগের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সচিব গোলাম সরওয়ারের প্রিয়ভাজন হিসেবে পরিচিত ছিল। সে ঢাকায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, আইন কমিশন, ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের মতো লোভনীয় পদগুলোয় কাজ করেছে। সিএমএম ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে থেকে দলীয় ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্ত কামিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিষ্ঠাতা আদিলুর রহমান খানকে দুই বছরের সাজা দিয়ে হাসিনা সরকার কর্তৃক পুরস্কার হিসেবে সচিব গোলাম সরওয়ারের আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সফরসঙ্গী হয়। অথচ বহু বিচারক পুরো চাকরিজীবনে একবারও বিদেশ সফর পায়নি।
আসসামস জগলুল হোসেন, নওগাঁ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। সে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ এবং সাবেক সচিব গোলাম সরওয়ারের প্রিয়ভাজন হওয়ায় ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে নারায়ণগঞ্জের জেলা জজ পদ বাগিয়ে নেয়। এর কিছুদিন পরই ঢাকার মহানগর দায়রা জজ হয়ে সাবেক আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যোগসাজশের ভিত্তিতে অবাধে দুর্নীতির মামলাসহ অন্যান্য মামলায় জামিন দিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় অন্যায়ভাবে ছাত্রদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিল সে। এতকিছুর পরও বর্তমানে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঢাকার সাবেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সত্যব্রত চৌধুরী। চরম দুর্নীতিবাজ এই বিচারক আইনমন্ত্রীর চেম্বারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় আওয়ামী আমলে গাজীপুরসহ বিভিন্ন লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নেয়। ওই সময় তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার জামিন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকার সাবেক সিএমএম হাফিজুর রহমান। সিএমএমের দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আইনমন্ত্রীর চেম্বারের তৌফিকা করিমের সঙ্গে এসব অর্থের ভাগবাঁটোয়ারা করে বারবার রাজধানী ঢাকায় পোস্টিং বাগিয়ে নেয় সে। সে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাসহ বিডিআর হত্যা মামলারও ট্রায়াল করেছিল।
হাসিবুল হক, সাবেক অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্টেট ছিল। অত্যন্ত ধূর্ত ও বর্ণচোরা হিসেবে পরিচিত ও সাবেক ছাত্রলীগার। আইনমন্ত্রীর বান্ধবী তৌফিকা করিমের ফরমায়েশমতো জামিন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আন্দোলনরত ছাত্রদের রিমান্ড মঞ্জুরসহ বিভিন্নভাবে হেনস্তায় অভিযুক্ত। দুর্নীতির মাধ্যমে ঢাকার শান্তিনগরসহ কয়েকটি জায়গায় তার একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। বিলাসবহুল জীবনযাপন করা এই বিচারক জুলাই-আগস্টের পর ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে দোসরদের অবাধে জামিন দিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতকিছুর পরও বর্তমান সরকারের সময়ও সে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছে।
ঢাকার সাবেক দুর্নীতিবাজ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুর রহমান বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত রয়েছে। বিগত সময়ে সে নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা দাবি করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। এখন নিজেকে ছাত্রদলের নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে সরাসরি গোপনে আইনজীবীদের চেম্বারে গিয়ে টাকার লেনদেন করত বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে।
নরসিংদীর সাবেক জেলা জজ জুয়েল রানা শুধু সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের জুনিয়র হিসেবে পরিচিত বিপ্লবের সঙ্গে খাতির থাকার কারণে নরসিংদী জেলা জজ পদ বাগিয়ে নেয়। বিপ্লবের মাধ্যমে সারা দেশে তদবির বাণিজ্যসহ ঘুষ দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকা এ বিচারকের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ধরনের তদন্তের কথা জানা যায় না।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নোয়াখালীর বিচারক আবদুর রহিম ফেনী জেলার সিজেএম থাকাকালে আওয়ামী এমপি নিজাম হাজারীর ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে প্রচুর অবৈধ অর্থ কামানোর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। তার স্ত্রীও জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা ফাতেমা ফেরদৌস ঢাকার বিভিন্ন পদে কাজ করাকালে নির্লজ্জভাবে ঘুষ গ্রহণ করত বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা দুজন বিপুল সম্পদের মালিক এবং তাদের দুই সন্তান কানাডায় পড়াশোনা করছে বলে জানা গেছে। এরাও বর্তমানে বহালতবিয়তে আছেন।
মুন্সী মশিয়ার রহমান, বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ঢাকায় কর্মরত। আওয়ামী লীগের দোসর এই কর্মকর্তা চট্টগ্রামের সিজেএম থাকাকালে চট্টগ্রাামের বিভিন্ন জুডিশিয়াল কিলিংকে বৈধতা দেয়। সে কুষ্টিয়ার জেলা জজ, নারায়ণগঞ্জের জেলা জজ ও হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবেও কর্মরত ছিল। নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের দায়িত্ব পালনকালে আনিসুল হকের মাধ্যমে নিয়োগ ও জামিন বাণিজ্য করে প্রচুর টাকার মালিক হয়েও বর্তমানে ধরাছোঁয়ার বাইরে ও বহালতবিয়তে আছে।
চট্টগ্রামের চিফ জডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম। বাড়ি গোপালগঞ্জ থাকায় সে ধরাকে সরা জ্ঞান করত। আইন মন্ত্রণালয়ের ডিএস হিসেবে কাজ করাসহ ঢাকার লোভনীয় পদে ছিল। চট্টগ্রামে সীমাহীন দুর্নীতি করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে এখনো চট্টগ্রামের সিজিএমের দায়িত্বে আছে।
অসীম কুমার দে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ। কয়েক মাস আগে তাকে মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হলেও অদৃশ্য কারণে তার পছন্দসই জেলায় পোস্টিং দেওয়া হয়। সে ইসকন নেতা, নারী ও অর্থ কেলেংকারি নিয়ে বিচারাঙ্গনে পরিচিত। তার বদলিতে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এএইচএম মাহমুদুর রহমান ২০২৩ সালে সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও তার কথিত বন্ধু আওয়ামী লীগ নেতা জহিরুল ইসলাম নকীবের সুপারিশে ভোলা জেলায় জেলা জজ হিসেবে বদলি হয়ে আসে। ইতঃপূর্বে সে ভোলায় যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে চাকরি করে গেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার জেলা জজ বদলি করা হলেও সে আছে বহালতবিয়তে।
সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো বিকাশ কুমার সাহার অন্যতম আস্তাভাজন হিসেবে পরিচিত আপিল বিভাগের সাবেক রেজিস্ট্রার ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান। উচ্চ আদালতে হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী এই কর্মকতাও ৫ আগস্টের পর বহালতবিয়তে আছে।
জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগের সময় সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে যারা উচ্চ আদালতের প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিল, ৫ আগস্টের পরও তাদের অনেকেই স্বপদে ক্ষমতা নিয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. পার পেয়ে যাচ্ছেন আওয়ামী মদতপুষ্ট বিচারকরা
– https://tinyurl.com/4r2nz7b5


