টানা পাঁচ মাসের ধারাবাহিক পতনে স্থবির বাংলাদেশের রপ্তানি খাত; অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ

0
93

দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক ছিল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে টানা পাঁচ মাস কমল রপ্তানি আয়। অব্যাহত পতনে রপ্তানিতে স্থবিরতা কাটছেই না। নেতিবাচকে এই ধারা নতুন করে দেশের অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। এ মাসে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৬২ কোটি ডলার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ রিপোর্টে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইপিবির তথ্য বলছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের পণ্য রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পণ্য রপ্তানি নেমে এসেছে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২ হাজার ৪৫২ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে বার্ষিক হিসাবে রপ্তানি কমলেও মাসিক হিসাবে কিছুটা বেড়েছে। ডিসেম্বরে রপ্তানি গত নভেম্বরের চেয়ে বেড়েছে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং নভেম্বর মাসে বেড়েছিল অক্টোবরের তুলনায় ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪৭৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু আগস্টে রপ্তানি তিন শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩৯২ কোটি ডলারে, যেখানে আগের বছর একই মাসে রপ্তানি ছিল ৪০৩ কোটি ডলার। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আরো কমে ৩৬৩ কোটি ডলারে নেমে আসে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ কম। অক্টোবরে ৩৮২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই মাসে রপ্তানি কমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। নভেম্বরে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে টানা পাঁচ মাস কমল রপ্তানি আয়।

রপ্তানিতে চলতি মাসেও তৈরি পোশাক খাত শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতের রপ্তানি কমলে সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও প্রভাব পড়ে। চলতি বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে, যা চলমান রপ্তানি সংকটকে আরো গভীর করেছে। এ সময় এই খাতে রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দুই দশমিক ৬৩ শতাংশ কম। একক মাস হিসেবে ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা ডিসেম্বর ২০২৪ সালের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। নভেম্বরে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমার হার ৫ শতাংশ। অক্টোবরে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩০২ কোটি ডলার, আগের বছরের একই মাসে ছিল ৩৩০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম। একই সময়ে রপ্তানি আদেশ কমেছে আগের মাসের চেয়ে ২০ শতাংশ। রপ্তানি আদেশ কম এসেছে ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। আগস্ট মাসে রপ্তানি কম হয় আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ১১ কোটি ডলার। রপ্তানির পরিমাণ নেমে আসে ৩৯২ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের আগস্টে ছিল ৪০৩ কোটি ডলারেরও বেশি। পোশাক রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ৩১৭ কোটি ডলারে, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ৩৩৩ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে রপ্তানির পরিমাণ নেমে আসে ৩৬৩ কোটি ডলারে, যা গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৩৮০ কোটি ডলারেরও বেশি। পোশাক রপ্তানি ১৭ কোটি ডলার কমে পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮৪ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল ৩০১ কোটি ডলার।

পোশাক খাতের সামগ্রিক আয় কমার কারণ হিসেবে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চীন ও ভারতের আগ্রাসী রপ্তানি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনেক বেশি শুল্কের কারণে তারা কম দামে ইইউতে রপ্তানি করছে। এ কারণে সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে।

ইএবি সভাপতি জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ট্যারিফের বর্ধিত অংশ আমাদের ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। এতে সম্মত হতে না পারায় বাল্ক অর্ডারগুলো আমেরিকার বাজার থেকে আসছে না। এর বাইরে অন্য বড় কারণের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়া।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখনো স্থিতিশীলতা আসেনি। বাড়তি শুল্ক আদায়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের দর বেড়েছে। তাদের চাহিদা কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশের মতো। ব্যাংক লুটপাট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। এর মধ্যে কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রপ্তানিকারকদের ভোগান্তির চেষ্টা করেন।

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খাতভিত্তিক নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় ক্যাটাগরিতেই রপ্তানি কমেছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় ৩ দশমিক ২২ শতাংশ কম। অন্যদিকে, ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার, কমেছে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ।


তথ্যসূত্র:

https://tinyurl.com/4urb7b6k

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধমৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে থানাপুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধপাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য পথ বন্ধের পর কান্দাহারে দেশীয় উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি