বাংলাদেশে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বেতন বাড়ানোর সুপারিশ

0
19

নবম পে কমিশনের প্রস্তাবিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দুই থেকে আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

দৈনিক আমার দেশ এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপালে ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর নজির রয়েছে। ব্যতিক্রম হিসেবে বাংলাদেশেই ১০০ থেকে প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে কমিশন।

পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে অবাধ লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বিদেশি ঋণের বোঝাসহ নানা অনিয়মে বিপর্যস্ত অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসেনি। অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা বিরাজ করছে। বিনিয়োগে বড় ধরনের স্থবিরতা, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, এডিপি বাস্তবায়নে অর্থের কাটছাঁট, ব্যয় মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধির এ সময়ে উচ্চহারে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেতন বাড়ানোর সুপারিশের বিষয়ে জানতে দৈনিক আমার দেশের সংবাদকর্মীরা পে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থ সচিব জাকির হোসেনের হোয়াটসঅ্যাপে গত ২৮ জানুয়ারি ফোন করলে সে তা রিসিভ করেনি। পরবর্তী ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বেতন বৃদ্ধির হারের যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হয়। বার্তা পাঠানোর দুই ঘণ্টা পর সে ফোন করে এ প্রতিবেদককে পরের দিন নিজ থেকে ফোন করে মতামত দিবে বলে জানায়। কিন্তু সে আর ফোন করেনি। বরং কয়েকদফা ফোন করেও তার কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।

তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, ভারতের অষ্টম পে কমিশন তাদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের যে সুপারিশ করেছে তাতে আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ২০২৭ অর্থবছরে এটি বাস্তবায়ন হতে পারে। এর আগে দেশটিতে ২০১৬ সালে ৭ম কমিশনের সুপারিশে সাড়ে ২৩ শতাংশ বেতন বেড়েছিল। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো পে কমিশন কাজ করে না পাকিস্তানে। দেশটিতে বাজেট কাঠামোর মধ্যে বেতন বাড়ানোর বিষয়টি সুপারিশ করা হয়। সবশেষ ২০২৫-২৬ সালে ঘোষিত বাজেটে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের ১০ শতাংশ ও অবসরপ্রাপ্তদের ৭ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে বৈষম্য কমাতে অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ ভাতা ও সাময়িক পরিস্থিতির কারণে ১০ শতাংশ ভাতা দেওয়া হয়। অপরদিকে নেপালে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সবশেষ বেতন বাড়ানো হয় এবং বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০১৫ সালে অষ্টম পে কমিশনের সুপারিশে ৯১ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হয়। বেতন কাঠামোর পরিবর্তন না হলেও প্রতি বছরই মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানো হয়।

গত ২১ জানুয়ারি সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে জাতীয় বেতন কমিশন। পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বাড়তি এ অর্থের জোগান কোথা থেকে হবে- এটিই বড় প্রশ্ন।

তবে কমিশনের এ সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করবে না বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। এটি বাস্তবায়নের বিষয়টি আগামীতে নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ঋণ নিয়েছে ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। যা এ অর্থবছরের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই এর অর্ধেকের বেশি ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে।

অপরদিকে, ব্যয় সামলাতে গিয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১৩ দশমিক দুই শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হলে আগামীতে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ধরনের বরাদ্দ কমার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সরকারের অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ কমবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে জানায়, সরকার তো আর টাকা ছাপিয়ে বেতন বাড়াতে পারবে না। আবার বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েও এটা করতে পারবে না। তাহলে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্থায়ন কোথা থেকে হবে? সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। কিন্তু আমাদের রাজস্ব আয়ের হার কর-জিডিপির তুলনায় খুবই কম। এ অবস্থায় এ ধরনের বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হবে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়লে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বেতন বৃদ্ধির চাপ পড়বে। আবার জাতীয়করণের যে দাবি আছে সেগুলো আরো জোরালো হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ আমার দেশকে জানায়, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিনিয়োগ কম, মূল্যস্ফীতিও বেশি, সরকারের রাজস্ব আহরণেও দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের নভেম্বর মাসে এলডিসি উত্তরণেরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের বেশি। ব্যাংকের সুদের হারও বেশি। এ সময়ে যদি আরো বাড়তি খরচ যুক্ত হয় তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং এ ধরনের একটি সময়ে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ কতটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হচ্ছে-এটি একটি বড় প্রশ্ন।


তথ্যসূত্র:
১। পাশের দেশগুলোর তুলনায় বেতন কয়েক গুণ বাড়ানোর সুপারিশ
– https://tinyurl.com/mtsdwsws

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধঝিনাইদহে যৌথবাহিনীর অভিযানে ১২ ককটেল উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধ২০২৫ সালে সারা দেশে ৪০০ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ইমারাতে ইসলামিয়া