মিরসরাই ও ফেনীতে সেচ প্রকল্পে ৫শ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে ২শ কোটি লুটপাট

0
8

চট্টগ্রামের মিরসরাইসহ ফেনীর ৬ উপজেলায় ৫৬২ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পে বিশাল দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। সেচ পাম্পের মাধ্যমে নদী থেকে ফসলি জমিতে পানি সরবরাহে ৮৫০টি সেচ পাম্পের মধ্যে ৩৩৩টির কোনো হদিস নেই। বাকি ৫১৭টির মধ্যে ১৫০টি সেচ পাম্প চালু করা গেলেও নির্দিষ্ট জমির চেয়ে অনেক কম এলাকায় সেচ দেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের সরঞ্জামাদি দিয়ে এসব পাম্প চালু করা হয়। দৈনিক যুগান্তর জানায়, এমন অনিয়ম-দুর্নীতির নজিরবিহীন তথ্য বেরিয়ে এসেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফেনীতে মুহুরী সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৫৩৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে ৮৫০টি সেচ পাম্প চালুর সিদ্ধান্ত হয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৫৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। ৯টি প্যাকেজে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের সুবিধাভোগী কৃষকদের কাছ থেকে জমির পারিমাণ অনুযায়ী নামমাত্র হিস্যা নিয়ে পানি সরবরাহের পরিকল্পনায় এটি চালু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ফেনীর পাঁচটি উপজেলা এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। অনিয়ম-দুর্নীতি এবং নিম্নমানের সরঞ্জামাদি সরবরাহের কারণে এখন পর্যন্ত সেচ সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৩ হাজার হেক্টর জমি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন প্রকল্পটি সমাপ্ত দেখিয়ে ৫০৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ঠিকাদারদের পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তদন্তে ১৬ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে।

তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানায়, নিম্নমানের সরঞ্জামাদি দিয়ে কোনোরকমে কিছু সেচ পাম্প চালু করা হয়। এছাড়া ৩৩৩টি সেচ পাম্পের অনুকূলে বরাদ্দ থেকে ঠিকাদারদের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদসহ ১৬ কর্মকর্তা অন্তত ২০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে। পর্যায়ক্রমে এই টাকা এডিবিকে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে।

১২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ, দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সার্বিক মতামতে বলা হয়, ‘এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, বর্ণিত প্রকল্পটিতে কখনোই ৮৫০টি স্কিম কমিশনিং করার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। কাগজে-কলমে বুঝে নেওয়া হয়েছে। কনসালটেন্টনির্ভর এ প্রকল্পে কনসালটেন্টরা সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন, যা নৈতিকতাবিরোধী। তাছাড়া প্রকল্পটিতে জনগণের উপকারের কথা চিন্তা করার ছিল। বাস্তবে তা হয়নি। প্রকল্প চালু না করেই সমাপ্ত রিপোর্ট দাখিল করায় বৈদেশিক অর্থের অপচয় করা হয়েছে। সরকারের কাছে অসত্য তথ্য দেওয়া ছাড়াও বহুসংখ্যক কৃষককে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে সেচ সুবিধা দিলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন হতো। এর সুফল থেকে দেশকে বঞ্চিত করা হয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘প্রাক্কলনের বাইরে নিম্নমানের ও কম থিকনেসের পানি সঞ্চালন পাইপ ব্যবহারের ফলে সহজে ভেঙে যায়। কয়েকটি স্কিমে মাটি খনন করে পাইপ চেক করার চেষ্টা করা হয়। ডিস্ট্রিবিউশন পাইপের প্রকৃত লে-আউট (বিন্যাস) না থাকায় পাইপ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিম্নমানের ইটের তৈরি ছোট আকারের এয়ারভেন্ট তৈরি করা হয়, যে কারণে পানি উপচে পড়ে। এছাড়া প্রাক্কলনের বাইরে নিম্নমানের ইট ও কনস্ট্রাকশন সামগ্রী দিয়ে পাম্পহাউজ নির্মাণ এবং নিম্নমানের ইট দিয়ে হেডার ট্যাংক নির্মাণ, নিম্নমানের ফিটিংস, ওয়্যারিং ও স্যাকশন পাইপ সংযুক্ত করা হয়।’ প্রকল্পের ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের সরঞ্জামাদি সরবরাহের প্রমাণ পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণের এক স্থানে বলা হয়, ‘প্রকল্পের ঠিকাদারের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত হয়েছিল, যা নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট। প্রয়োজনে সে প্রতিবেদন অবলোকন করা যেতে পারে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি সেচ স্কিমও পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ছিল না, যেমন : কাভারেজ এরিয়া প্রতি সেচ পাম্পের অনুকূলে ২০ হেক্টর থাকলেও বাস্তবে ৭-৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছায়নি। কমিটির সদস্যরা সরেজমিন ৫৯১টি সেচ স্কিম বন্ধ অবস্থায় পেয়েছেন। অস্বাভাবিক হারে ট্রান্সফরমার চুরির বিষয়টিও তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

জানা যায়, শুরু থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪ জন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে পাউবো থেকে অবসরে গেছেন। তারা হলেন মো. শাহাবুদ্দিন, রফিকুল আলম ও রিয়াজুল আলম।

প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানায়, রাফিউস সাজ্জাদ পিডি হিসাবে যোগদান করেই প্রকল্পটির সর্বনাশ করে। সে টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে। প্রতিটি প্যাকেজের কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করে কমিশন বাণিজ্য হাতিয়েছে। প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছে। কাজের অগ্রগতির চেয়ে অতিরিক্ত বিল দিয়ে কমিশন নিয়েছে। যে সাবস্টেশন বসাতে খরচ হওয়ার কথা ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা, সেখানে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পছন্দের ঠিকাদারকে। প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি মূল্যে জার্মানির একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়। ঠিকাদারসহ এদের ধরতে পারলে সাগরচুরির তথ্য পাওয়া যাবে।


তথ্যসূত্র:
১। ৫শ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে ২শ কোটিই লুট
– https://tinyurl.com/27tf89a4

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধলালমনিরহাটে ডেকে নিয়ে বাংলাদেশি কৃষককে গুলি করল বিএসএফ, বিক্ষুব্ধ বাংলাদেশিরা ধরে আনল ভারতীয়কে
পরবর্তী নিবন্ধগাজার আল-মাগাজি ও খান ইউনিসে বর্বর ইসরায়েলি হামলায় নারী-শিশুসহ ১২ শহীদ