
আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
সোমালিয়ায় পশ্চিমা সমর্থিত মোগাদিশু প্রশাসন যখন রাজনৈতিক সংকটে ভুগছে, তখন বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছে প্রতিরোধ বাহিনী হারাকাতুশ শাবাব আল-মুজাহিদিন। বিশেষ করে মধ্য সোমালিয়ার হিরান রাজ্যের মাক্সাস জেলার প্রভাবশালী হাওয়াদলী গোত্রের প্রবীণ নেতাদের সাথে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত বন্ধের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর এই সত্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এটি এই অঞ্চলে একটি চুক্তির চেয়ে বেশি কিছু।
হিরান প্রদেশের মাক্সাস জেলায় যা ঘটেছে, তাকে কেবল একটি স্থানীয় শান্তি চুক্তি বললে সত্যের অপলাপ হবে। গত ৩০ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা আলোচনার পর আশ-শাবাব এবং হাওয়াদলে গোত্রের প্রবীণের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৫ দফা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, এই চুক্তি আসলে পশ্চিমা সমর্থিত মোগাদিশু প্রশাসনের গত তিন বছরের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কৌশলের ব্যর্থতার এক করুণ দলিল। যে হাওয়াদলে গোত্রের মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘মাকাওয়িসলে’ ২০২২ সালে আশ-শাবাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত মোগাদিশু বাহিনীর আগ্রাসনে অগ্রভাগে ছিল, আজ সেই গোত্রের প্রতিনিধিরাই আশ-শাবাবের সাথে “ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়নে সহযোগিতার” অঙ্গীকার করছে। এই পরিবর্তন কেন হলো এবং এর পরিণতি কী হতে পারে- তার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ আজ জরুরি।
।। প্রথম অধ্যায়: ২০২২-এর আশা থেকে ২০২৫-এর হতাশা ।।
২০২২ সালে পশ্চিমা বিশ্ব, মিত্র আফ্রিকান জোট ও তুরস্কের মতো নামধারী মুসলিম দেশগুলোর সামরিক সহায়তা নিয়ে মোগাদিশু প্রশাসন আশ-শাবাবের বিরুদ্ধে বিজয়ের নতুন আশা সঞ্চার করে। বিজয়ের এই আশা দেখিয়ে মোগাদিশু বাহিনী স্থানীয় হাওয়াদলে, আবগালসহ বিভিন্ন গোত্রের মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করে আশ-শাবাব নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। মোগাদিশু বাহিনীর এই আগ্রাসনে প্রধান সহায়ক মিলিশিয়া গোষ্ঠী ছিলো হাওয়াদলে গোত্রের ‘মাকাওয়িসলে’ গোষ্ঠী, যারা কেন্দ্রীয় সোমালিয়ার বহু এলাকা আশ-শাবাব থেকে দখল করে এবং মোগাদিশু বাহিনীর জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া সরবরাহ রুট খুলে দেয়। এটি ছিল একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক মডেল, যেখানে রাষ্ট্র ও মিলিশিয়ারা একসাথে লড়েছিল।
কিন্তু মোগাদিশু বাহিনী এই সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। বরং কয়েক বছরের মধ্যেই আশ-শাবাব তাদের হারানো ভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যার মধ্যে ‘মাকাওয়িসলে’ মিলিশিয়া গোষ্ঠীর প্রধান শহর মাক্সাস জেলাও রয়েছে। মোগাদিশু বাহিনীর এই পরাজয়ের পিছনের কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো:
১. আর্থিক বঞ্চনা:
মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো টাকার বিনিময়ে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, যেখানে আশ-শাবাব নিজেদের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ করে গেছে। ফলে আশ-শাবাবের তীব্র আক্রমণে যখন মোগাদিশু প্রশাসন আর্থিক চাপে পড়ে, তখন হাওয়াদলে যোদ্ধাদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা হয়নি। একই সময় স্থানীয়ভাবে আদায়কৃত করের (tax revenue) ভাগাভাগি নিয়েও মোগাদিশু ও হিরশাবেলে রাজ্যের সাথে বিরোধ তৈরি হয়।
২. রাজনৈতিক অবহেলা: হিরশাবেলে রাজ্যের নেতৃত্ব এবং হিরানে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ফেডারেল সরকার ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। সেপ্টেম্বর মাসে হাওয়াদলে প্রবীণরা প্রকাশ্যে নির্বাচন স্থগিত করার দাবিতে বিক্ষোভ করে। মিলিশিয়ারা যখন মাঠে জীবন হারাচ্ছিল, রাজনীতিবিদরা তখন মোগাদিশুতে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
৩. সামরিক শূন্যতা: মোগাদিশু বাহিনী ও স্থানীয় মিলিশিয়ারা যখন সম্পদের ভাগবাটোয়ারা আর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে সমন্বয়হীনতায় ভুগছে, সেই সুযোগে আশ-শাবাব পাল্টা আক্রমণ শুরু করে, যাতে ৭ হাজারেরও বেশি সেনা ও মিলিশিয়া সদস্যসহ শীর্ষ সামরিক অফিসাররা নিহত হয়। আর এর চূড়ান্ত পরিণতি ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সামনে আসে, যেদিন আশ-শাবাব যোদ্ধারা ইস্তেশহাদী হামলার মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে সামরিক অপারেশন শুরু করে এবং স্থল অভিযানের মাধ্যমে মাক্সাস শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন।
মাক্সাসের পতন শুধু একটি শহরের পতন ছিলো না, বরং এটি ছিল মোগাদিশু প্রশাসনের প্রতি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর আস্থার পতন।
।। দ্বিতীয় অধ্যায়: ১৫ দফা চুক্তি ও মোগাদিশু প্রশাসনের জন্য বিপদ সংকেত ।।
আশ-শাবাব সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হাওয়াদলে গোত্রের বিশিষ্ট নেতা নাবাদুন আব্দুশ শাকুর ইলমি উগাস চুক্তি পাঠ করছেন। এই ১৫ দফা চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
– পক্ষ পরিবর্তন: হাওয়াদলে প্রতিনিধিরা FGS ও আফ্রিকান ইউনিয়ন বাহিনীর বিরুদ্ধে আশ-শাবাবের যুদ্ধকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
– আত্ম-নিরস্ত্রীকরণ: হাওয়াদলে অঞ্চলে চাঁদাবাজির জন্য স্থাপিত সকল চেকপয়েন্ট উঠিয়ে ফেলা এবং মাকাওয়িসলে মিলিশিয়া গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা। এর অর্থ হলো, আশ-শাবাব বিরোধী সশস্ত্র কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং অস্ত্র জমা দেওয়া, যা তারা এতোদিন মোগাদিশু প্রশাসন থেকে পেয়েছিল।
– বৈধতা প্রদান:
আশ-শাবাবকে শান্তি ও শরিয়াহ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার অঙ্গিকার এবং আশ-শাবাবকে একটি বৈধ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
।। তৃতীয় অধ্যায়: হিরশাবেলে ও মোগাদিশু প্রশাসনে এর প্রভাব ।।
এই চুক্তির প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে হিরশাবেলে রাজ্যের জন্য। কেননা হিরশাবেলে প্রশাসনের নিরাপত্তা কাঠামো মূলত হাওয়াদলে গোত্রের মিলিশিয়াদের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে হিরানে মোগাদিশু প্রশাসনের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। রাজ্যটির রাজধানী জওহরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আর মোগাদিশু প্রশাসনের পুরো ‘Somali-led, community-supported’ মডেল এখন প্রশ্নের মুখে। যদি সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হাওয়াদলে গোত্রই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে অন্যান্য গোত্র- যেমন গালমুদুগের বা লোয়ার শাবেলের গোত্রগুলো— কেন মোগাদিশু সরকারের উপর ভরসা রাখবে? আশ-শাবাব এখন এই উদাহরণ দেখিয়ে অন্যান্য সম্প্রদায়কেও একই পথে আনার চেষ্টা করবে। তখন যুদ্ধটা আর মাঠে থাকবে না, যুদ্ধটা হবে বৈধতা ও আস্থার।
।। শেষ কথা: সামরিক সমাধান নাকি রাজনৈতিক সমাধান? ।।
এটি স্পষ্ট যে, মাক্সাস চুক্তি হাওয়াদলে গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটি পশ্চিমা সমর্থিত মোগাদিশু প্রশাসনের রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। কেননা যোদ্ধাদের পেটে ক্ষুধা রেখে মোগাদিশু প্রশাসন যেই দেশপ্রেমের গল্প শুনিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করেছে, তা এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে।
তাছাড়া শুধু সেনা পাঠিয়ে এই যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়। কেননা ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে মোগাদিশু প্রশাসন জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রকে দূরে সরে দিচ্ছে।সেখানে আশ-শাবাব শরিয়াহ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ইসলামি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে, শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রতিযোগীতা, পুরুষ্কার আর স্কলারশিপের ব্যবস্থা করছে। জনসেবায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কয়েক ডজন চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করেছে।
মাক্সাস চুক্তি মোগাদিশু প্রশাসনের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সংকটকে পাশ কাটিয়ে শুধু বন্দুক দিয়ে আশ-শাবাবকে হারানো যাবে না। তাই বলা যায়, মাক্সাস হচ্ছে মোগাদিশু প্রশাসনের জন্য প্রথম ডমিনো, শেষ নয়।


