গেরুয়া সন্ত্রাসীদের বিদ্বেষের আগুনে জ্বলল মসজিদ-মাদরাসা

0
366

‘১৭ মিনিটে মসজিদ ভেঙেছি, আইন করতে কত সময় লাগে? আমি প্রথম রাজনীতিতে আসার পর মথুরায় বলেছিলাম, অযোধ্যা, মথুরা, কাশীর দরকার নেই, দিল্লির জামে মসজিদ ভাঙো। সিঁড়ির নীচে যদি মূর্তি না পাওয়া যায় তাহলে আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিও। ওই বক্তব্যে আমি অটল রয়েছি।’

এভাবেই উত্তেজিত ভাষণ দিচ্ছিলেন বিজেপি নেতা সচ্চিদানন্দ হরি সাক্ষী মহারাজ। এটা ২০১৮ দিল্লিতে ক্ষমতাসীন বিজেপির এক জনসমাবেশের কথা। তার একবছরের মাথায় বাবরি মসজিদ নিয়ে হিন্দুদের পক্ষে সাজানো রায় দেয়া হল হাইকোর্ট থেকে। উগ্র হিন্দুদের মনের শখ তবু পুরণ হল না যেন। তারা আরও মসজিদ ভাঙতে চায়। ধর্মান্ধতায় বুঁদ হয়ে থাকা জাতিকে উস্কে দিয়ে ভোট কামানো নেতারা ঘোষণা দিলেন, সামনে পুনরায় ক্ষমতা এলে তারা ৫৪ টি মসজিদ গুড়িয়ে দেবেন। কারণ সেগুলো সরকারি জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। তারপর যত দিন যায়, ততই এগুতে থাকে ‘মুসলিম শূন্য রামরাজ্য’ গড়ার স্বপ্ন। এগুতে থাকে একের পর এক মুসলিমবিরোধী হিংস্র পলিসি ও এজেন্ডা।

মসজিদের মিনারে হনুমানের পতাকা

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ছবি ভারতবর্ষের মুসলমানদের অস্থির করে তুলছে। ছবিটি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক সন্ত্রাসী দিল্লির একটি মসজিদের মিনার ভেঙে সেখানে প্রথমে হনুমানের ছবি সংবলিত একটি পতাকা উত্তোলন করছে। তারা মিনারে অবস্থিত একটি মাইকও ভেঙে ফেলছে। পরে সেখানে একটি ভারতীয় পতাকাও উত্তোলন করা হয়।

এর আগে শত শত সন্ত্রাসী হিন্দু দিল্লির অশোকনগর এলাকায় জড়ো হয় এবং ‘জ্যায় শ্রীড়ি আম’ বলে মসজিদে হামলা চালায় ও আগুন লাগিয়ে দেয়। শুধু অশোকনগরের ওই মসজিদে হামলার ঘটনাই নয়, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) প্রতিবাদে পুরো দিল্লি অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে।

মসজিদের মিনার ভেঙে সেখানে হনুমানের ছবি সংবলিত পতাকা উত্তোলন কিংবা ‘জ্যায় শ্রীড়ি আম’ বলে মসজিদে হামলার ঘটনা ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা বাবরি মসজিদে হামলা ও তা ধ্বংস করে দেয়ার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মুঘল সম্রাট বাবরের নির্দেশে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় ১৫২৮-২৯ সালে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সন্ত্রাসী হিন্দুদের দাবি, ওই মসজিদের নিচে হিন্দু দেবতা রামের একটি মন্দির ছিল। বাবরের সেনা কর্মকর্তা মীর বাকী তথাকথিত ওই মন্দিরের ওপরই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ৪৬৪ বছর ওই মসজিদের অস্তিত্ব থাকলেও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আহ্বানে উগ্রপন্থী হিন্দুরা সেটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতজুড়ে মুসলিম নিধন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন শত শত মানুষ। দিল্লির অশোকনগরে মসজিদে আগুন লাগানো এবং সেখানে হনুমানের ছবি সংবলিত পতাকা উত্তোলন করার ঘটনা বাবরি মসজিদের ঘটনাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল। ওই ঘটনার জের ধরে দিল্লিতে গেরুয়া সন্ত্রাসীদের গণহত্যা ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে এ পর্যন্ত ৬৯ জনের বেশি নিরীহ মুসলমান শহীদ হয়েছেন।

মসজিদ মাদরাসা : হামলার প্রথম শিকার

কী পরিমাণ মসজিদ ও মাদরাসা হিন্দুত্ববাদী হামলার শিকার হয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও ছোট্ট একটি নমুনা থেকে তা সহজেই অনুমেয়। কিছুদিন আগে ভারতের কর্নাটক রাজ্যে আরএসএসের পরিচালিত একটি স্কুলে শিশু শিক্ষার্থীদের দিয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতীকী দৃশ্য মঞ্চায়ন করা হয়েছিল। যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়, আরএসএস পরিচালিত একটি স্কুলে বাবরি মসজিদের একটি প্রতীকী ছবি তৈরি করা হয়েছে। সে ছবিটি ধ্বংস করতে ছোট ছোট ছাত্রদের বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। প্রতীকী এ বাবরি মসজিদ ভাঙতে ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। মসজিদের প্রতীকী ছবিটি ঘিরে তৈরি করা হয় বলয়। বেশকিছু শিক্ষার্থী ওই প্রতীকী ছবিটা ঘিরে রেখেছে। চারদিকে গেরুয়া পতাকা উড়ছে। কিছুক্ষণ পরই প্রতীকী ঘিরে রাখা ছাত্ররা ভেঙে ফেলছে সেটি।

যে সমাজে ছোটকাল থেকে শিশুরা গড়ে ওঠছে চরম হিংস্রতা আর উগ্রবাদের সবক নিয়ে, সে সমাজের পরিণত শ্রেণির চরিত্র যে কতটা ভয়াবহ তা বলাই বাহুল্য। এরকম একটি সমাজে সংখ্যালঘু মুসলিমদের জীবন ও ধর্ম কতটা হিংস্রতার শিকার তার কোন ইয়ত্তা নেই। সেখানে প্রাণঘাতী মুলিম নিধনের  ইন্ধন যোগানো হচ্ছে প্রকাশ্যেই। সারা বিশ্বের চোখের সামনে ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করেছে। প্রকাশ্য যোগাযোগমাধ্যমে পুরুষদের প্রতি বিজেপি নারীনেত্রীর মুসলমান নারীদের জনসম্মুখে রাস্তায় গণধর্ষণের আহ্বান, নেতার মুসলিমমুক্ত ভারত গড়ার প্রকাশ্য ঘোষণা, শাসকদলের সভাপতির ‘মুসলিম বাঙালিদেরকে’ বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার হিংস্র হুমকি, বিতর্কিত এনআরসি দিয়ে মুসলিমদেরকে বহিষ্কারের দুরভিসন্ধি, মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ ও গোমাংস ভক্ষণের ছুতোয় সত্য-মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগে যত্রতত্র মুসলমান নিবর্তন-নিধনের উসকানি–এসব যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী ভারত রাষ্ট্রে।

প্রতিকারের চেষ্টার শতগুণ বেশি সেই উসকানি। তার ওপর সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের। ভয়াবহ গণহত্যার আশঙ্কায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে সর্বদাই। বাসা-বাড়ি থেকে নিয়ে বাজার বন্দর পর্যন্ত কোথাও নিরাপত্তা বোধ করছে না ভারতীয় মুসলিমরা। অপরাধীদের নামে লোকদেখানো মামলা হচ্ছে, কিন্তু বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। কিংবা হচ্ছে না কোন মামলাই। এ সবই ঘটছে সারা দুনিয়ার সামনে। দিল্লিতে ভয়াবহ এ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে এমন সময় যখন সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সফরে এসেছে। যে নিজেও কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী। অনেকের মতে, মোদি অনেক অংশেই ট্রাম্পের রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। এ প্রসঙ্গে জনপ্রিয় ভারতীয় অনলাইন মিডিয়া Scroll-এর মন্তব্য উল্লেখ্য। মন্তব্যটা ছিল অনেকটা এ রকম- ‘Anti-Muslim sentiment permeates policies of both India and US’ (Feb 24. 2020)।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন