যাওয়ার কোন জায়গা নেই :নিপীড়িতদের মুখে দিল্লী গণহত্যা

0
352

দিল্লিতে সম্প্রতি গেরুয়া সন্ত্রাসীদের যে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। একে একচোখা দাজ্জালী মিডিয়াগুলো দাঙ্গা বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও তা আসলে দাঙ্গা নয়। প্রধানত মুসলমানরা আক্রান্ত হলেও নিহতদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে না বা প্রকাশ পেতে দেওয়া হচ্ছে না। ছবি প্রকাশেও দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। চেপে রাখা হচ্ছে নির্যাতনের প্রকৃত বাস্তবতা। এই লেখায় আমরা ভিক্টিমদের জবানিতে সহিংসতার বয়ান দেবার চেষ্টা করবো।

ফারুকিয়া মাদরাসা-মসজিদ : অসহায় নিরপরাধ কুরআনী শিশুর মৃত্যু

‘দেখুন, এখানে নিরীহ শিশুদের রক্ত পড়ে আছে। আমরা কার কী ক্ষতি করেছিলাম, আমাদের কুরআনকেও শহীদ করা হলো? নামাজ পড়তে থাকা মানুষদের ওপরও ওরা গুলি চালালো। অথচ বিপদের সময় আমরা কলোনি থেকে হিন্দু ভাইদের নিরাপদে বের করে এনেছি। তারা বাইরে থেকে মাদরাসায় পড়তে আসা ছোট ছোট বাচ্চাদের ওপরও এভাবে হামলা করে । আরএসএস সামনে, পেছনে উগ্র জনতা। ফায়ারিং করে ভয় দেখিয়ে আমাদের পিছনে ঠেলে দেওয়া হয়। তারপর জনতা এসে মসজিদের তালা ভাঙ্গে। গোটা সময়টা অন্ধকারে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশের লোকজন। কাউকে তারা বাঁধা দেওয়ার কোন চেষ্টাই করেনি।’

‘মঙ্গলবার একুশে ফেব্রুয়ারী মাগরিবের নামাজের ঠিক পর পরই এই হামলার ঘটনা ঘটে। সে দিন রাতের হামলায় মসজিদে কোরআন পাঠরত তিন-চারটে নিরীহ বাচ্চা মারা গেছে, আরও বহুজন এখনো নিখোঁজ। হামলায় আরএসএসের লোকজন জড়িত ছিলো। নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে তারা। আমরা অন্ধাকারে দেখলাম দিল্লি পুলিশের লোকজন দাড়িয়ে আছে। কিন্তু হামলা ঠেকানোর জন্য কোন ব্যবস্থাই তারা গ্রহন করেনি।’  বলছিলেন বিবিসিকে কয়েকজন প্রত্যক্ষ্যদর্শী।

প্যান্ট বনাম ধর্মপরিচয়

অন্য সবদিনের মতো দুই হিন্দু বন্ধুকে নিয়ে আরশাদ মোটরসাইকেলে চলছেন কর্মস্থলে। সামনে জটলা। বন্ধুদ্বয়ের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে জটলার ভেতরে থাকা গুরু তাদের ছেড়ে দিল। এবার আরশাদের পালা।

“ধর্মপরিচয় প্রশ্নে আরশাদ যখন চুপ, কিছু উগ্র হিন্দু তার প্যান্ট নামিয়ে দিল। একপর্যায়ে তারা নিশ্চিত হয় তার মুসলিম পরিচয়। তৎক্ষনাৎ তাকে হত্যা করা হয়।” গার্ডিয়ানকে জানান এক প্রত্যক্ষদর্শী।

পরবর্তীতে নর্দমা থেকে তার মরদেহ বাড়িতে আনা হয় প্রিয়জনদের সাথে শেষ সাক্ষাতের জন্য। ছয় বোনের একমাত্র ভাই আরশাদকে তখন শেষ যাত্রার শাদা কাপড়ে মোড়ানো হয়। শুধু মুখটা খোলা থাকে। বোনেরা ভাইয়ের আক্রান্ত গালে হাত দিয়ে বলছিল, উঠো, ভাইয়া উঠো ! পনের বছরের ছোট বোন উপস্থিত দর্শণার্থীদের একজনকে হিন্দু ধারণা করে তাকে বলে, “আমার ভাইয়া কত সুন্দর ছিল,তোমরা কি জান? ” “কেন তোমরা আমার ভাইকে হত্যা করলে” “দেখো, তার চেহারায় কত আঘাত, তোমরা তাকে এত নির্মমভাবে হত্যা করলে? তুমি কি জানো, আমার ভাইয়া কত সুন্দর ও ভালো মানুষ ছিল? কেন সমাজের কিছু মানুষকে তোমরা ঘৃণা করছো? তোমাদের ধর্ম কি অন্য ধর্মের মানুষদের হত্যা করতে শেখায়?”

যে ছবি দিল্লি গণহত্যার সাক্ষ্য দেয়

একটি লোক দু হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে উবু হয়ে বসে আছে৷ রক্তাক্ত৷ তাকে ঘিরে ধরে লাঠি, রড, হকিস্টিক দিয়ে মারছে অনেক লোক৷ দিল্লির হিংসার এই ছবিটি ভাইরাল হয়েছে ইন্টারনেটে৷ উত্তর-পূর্ব দিল্লির ওই ছবিটিই বলে দিচ্ছে, দিল্লিতে ঠিক কী ঘটেছিল !

আক্রান্ত মুহাম্মদ জুবায়ের পরবর্তীতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে একটি সাক্ষাত্‍কার দিয়েছেন৷ কীভাবে তাকে মারা হয়, কী জন্য তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, জানালেন সব৷ জুবায়েরের ভাষায়, ‘গত মঙ্গলবারের কথা৷ আমি তখন নামাজ পড়তে বেরিয়েছিলাম৷ বাচ্চাদের জন্য মিষ্টি কিনে বাড়ি ফিরছিলাম ৷ হঠাৎ আমাকে ঘিরে ধরল একদল মানুষ, তাদের হাতে লোহার রড, হকিস্টিক ও লাঠি৷’

জুবায়ের বললেন, ‘ হাড়গোড় ভেঙে না-যাওয়া পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরেছে৷ আমি ওদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছিলাম৷ ওরা আমাকে ধর্ম তুলে গালিগালাজ করতে শুরু করল৷ আমি ওদের পায়ে পড়লাম, কিন্ত ওরা আমাকে মারতে থাকল। ওরা মাঝে মাঝে বিজেপি নেতা কপিল শর্মার নাম বলছিল৷ তারপর বেশি কিছু মনে পড়ছে না৷ তীব্র মার খেতে খেতে আমার মাথা তখন ঘুরছে, ভাবছিলাম আমার সন্তানরা নিরাপদে আছে তো। পরে আমার ওই ছবিটির দিকে আর তাকাতে পারিনি।”

জুবায়ের বিবিসিকে জানান, ‘আমাকে যখন মারছিল, আমি ভয় পাইনি। তারা আমার শরীর ভেঙ্গেছে, কিন্তু আমার আত্মাকে তো নয়। কোন নির্দিষ্ট ধর্মের সাথে আমি এই ঘটনাকে সংযুক্ত করবো না। যারা এমন নিষ্ঠুর কাজ করে, তারা কোন ধর্মের অনুসারীই হতে পারে না। না মুসলিম, না হিন্দু!’

বিবিসি উর্দুর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ”জানতে চান, সরকারের কাছে কী বলতে চাই? যে সরকার দাঙ্গা থামাতে পারে না, তার কাছ থেকে আমাদের কী আশা করা উচিত? ”আমাকে যখন মারধর করা হচ্ছে, তখন পুলিশকর্মীরা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। দাঙ্গাবাজরা একটুও ভীত ছিল না। যেন কোন মেলা বসেছে, ওদেরকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। পুলিশের কাছে আমার কোন গুরুত্বই ছিল না।’

রক্তখেকো গেরুয়াদের কবলে অশীতিপর বৃদ্ধা

সময়টা পঁচিশে ফেব্রুয়ারি দুপুর বেলা। ঘটনাস্থল ভারতের রাজধানী দিল্লির খাজুরি খাস শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে গমরি এক্সটেনশন লেন। সেখানে থাকেন মোহাম্মদ সাঈদ সালমানির পরিবার। মঙ্গলবার পরিবারের জন্য দুধ কেনার উদ্দেশ্যে বাইরে গিয়েছিলেন। এমন সময় তার ছোট ছেলে তাকে ফোন করে জানায়, ১০০-র অধিক সশস্ত্র জনতা তাদের লেনে ঢুকে পড়েছে। তারা দোকান ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তাদের চারতলা বাড়িতেও আগুন দেয়া হয়েছে।

এ কথা শুনেই সালমানির মাথায় হাত। সে তার বাসার দিকে ছুটতে লাগল। এ সময় পাশের লেনের বাসিন্দারা তাকে যেতে বাঁধা দেয়। তারা বলে, ‘সেখানে গেলে বিপদ হতে পারে। এমনকি তারা তাকে মেরেও ফেলতে পারে। তাই অপেক্ষা করা উচিত।’ সালমানি (৪৮) একজন পোশাক ব্যবসায়ী। ছেলের ফোন পেয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না তিনি। কয়েক ঘণ্টা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন সালমানি। তিনি ভাবছিলেন, ততক্ষণে বোধহয় সব শেষ হয়ে গেছে। মারা গেছে পরিবারের সদস্যরা।

‘এখন আমার আর কিছুই নেই। আমি একদম শূন্য হয়ে গেলাম।’ ‘আমি দুধ কেনার জন্য বাইরে বের হওয়ার পর ঘর তালাবদ্ধ করে এসেছিলাম। নিরাপত্তার জন্যই এটা করা হয়েছিল। তবে দুর্বৃত্তরা তালা ভেঙে বাসায় ঢুকে পড়ে অগ্নিসংযোগ করে এবং লুটপাট চালায়।’

‘আমার দোকানের কর্মচারীসহ পরিবারের সদস্যরা নীচে নেমে আসেন এবং সেখানে সকলে প্রায় এক ঘণ্টা আটকা ছিলেন। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।’  ‘মা বয়স্ক ছিলেন। এজন্য সবাই ঘর থেকে বের হতে পারলেও তিনি বের হতে পারেননি। ফলে আবদ্ধ ঘরে পুড়ে মারা গেছেন তিনি।’ সালমানি জানান ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ডট ইনকে।

আগুনে পুড়িয়ে দেবার চেষ্টা

গমরি লেন এলাকায় ৯০-১০০ মুসলিম পরিবারের বসবাস। সেখানে আজিজিয়াহ নামে একটি মসজিদ রয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রায় দেড়শ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ অন্তত ২০০ মুসলিমের ওপর আক্রমণ করে। তাদের হাতে ছিল লাঠি ও পাথর। পরে মুসলমানরা প্রাণ বাঁচাতে মসজিদটিতে আশ্রয় নেয়। সারারাত মসজিদে কাটানোর পর সকালে স্থানীয় অন্যান্য মুসলমানরা তাদের উদ্ধার করেন।

মসজিদে আশ্রয় নেয়া ইসমাইল নামে এক ব্যক্তি টাইমসকে জানান, ‘তারা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে একের পর এক বাড়ি, দোকান-পাটে আগুন দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা মসজিদে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। কোরআন শরিফে আগুন দেয়। এমনকি এক মুসলমানকে জীবন্ত দগ্ধও করতে যাচ্ছিল তারা। তবে স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের বাঁধায় তা সম্ভব হয়নি।’

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন