‘করোনার চেয়ে শক্তিশালী’ বাংলাদেশ কেন করোনায় বিপর্যস্ত?

0
267
‘করোনার চেয়ে শক্তিশালী’ বাংলাদেশ কেন করোনায় বিপর্যস্ত?

বাংলাদেশ সর্বশেষ করোনা আক্রান্ত বিশ্বে এখন ১৭তম, যেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা (৯ই জুলাই-এর তথ্য অনুযায়ী) ১৭৫,৪৯৪, মৃতের সংখ্যা ২,২৩৮।

মার্চ মাসে যখন সারা বিশ্বে কোভিড-১৯ এর তাণ্ডব চলছে, হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাচ্ছে, উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে, তখন আমাদের মন্ত্রীরা করোনা ভাইরাসকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিয়ে বলেছেন, “আমরা করোনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।”

কোথায় সে মন্ত্র, কোথায় সে যাদু যা দিয়ে করোনাকে গুঁড়িয়ে দেবার কথা ভেবেছিলেন নীতি নির্ধারকরা তা আমরা জানি না, শুধু এইটুকু সহজে বোঝা যায়, এই মহামারি মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতিতে যথেষ্ট ঘাটতি ছিলো, যার মাশুল গুনছেন এখন আক্রান্ত মানুষ, আর দায় শোধ করছেন মৃতেরা প্রাণ দিয়ে।

ট্রাম্পের ‘মৌসুমি জ্বর’

যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ যখন করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, করোনা ভাইরাস এমন কিছু না, তিনি করোনাকে মৌসুমি জ্বরের সাথে তুলনা করেন। ট্রাম্প বলেন, ” মৌসুমি জ্বরে গত বছর ৩৭ হাজার আমেরিকান মানুষ মারা গেছে, গড়ে প্রতিবছর ২৭ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ মারা যায়। কিছু বন্ধ থাকে না, জীবন এবং অর্থনীতি চলমান থাকে।”

মানুষকে সাহস জুগিয়ে অর্থনীতি চলমান রাখার এক ব্যর্থ প্রয়াস ট্রাম্পের এই বক্তব্য, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে লকডাউনের পরিসীমা আর মৃতের সংখ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশে শুরু থেকে কঠোরভাবে লকডাউন ঘোষণা করলে, অদেখা কেস অর্থাৎ যারা আক্রান্ত হতে পারে তাদের শনাক্ত করে সঠিকভাবে আইসোলেটেড রাখতে পারলে, আজকের বাংলাদেশের রূপ অন্যরকম হতে পারতো। কিন্তু তা হয় নি।

শুরুতে লকডাউনের পরিবর্তে বাংলাদেশে ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি। আর এর ফলস্বরূপ আমরা দেখেছি লঞ্চে, বাসে একসাথে শত শত মানুষকে গায়ে গা ঘেঁষে ছুটি কাটাতে বাড়ি যেতে। অথচ সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের ঘোষণা করা উচিৎ ছিল “স্টে ইন প্লেস” অর্থাৎ যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন।

এরপর আমরা দেখলাম শত শত মানুষ এই সাধারণ ছুটি শেষে কীভাবে দল বেঁধে শহরে ফিরে এলো আবারও ফিরে গেলো। বাংলাদেশে আমরা দেখছি অর্থনীতিকে রক্ষা করার আরেক ব্যর্থ প্রচেষ্টার ফল।

বাংলাদেশে আক্রান্ত কতজন বা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মোট কতজনের মৃত্যু হয়েছে , তা বলা দুষ্কর। অচেনা মানুষের অনেক তথ্য আমরা জানিনা, তবে এমন অনেকে আছেন যারা করোনা ভাইরাসের সব উপসর্গে ভুগেছেন তাদেরও করোনার টেস্ট নেগেটিভ এসেছে।

শুধু তাই নয় করোনার উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন অনেকে। প্রয়োজন হলেও অনেকে টেস্ট করাতে পারছেন না।

বিশ্বব্যাংক গত এপ্রিলে বাংলাদেশকে ১০০ মিলিয়ন ডলার লোন দেয় শুধু করোনা মোকাবেলায় টেস্টিং, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কন্টাক্ট ট্রেসিং ইত্যাদির জন্য। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) গত এপ্রিলে ১০০ মিলিয়ন ডলার লোন অনুমোদন দিয়েছে করোনা ভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় জরুরি স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা নিতে।

স্বাস্থ্য খাতে, সামাজিক নিরাপত্তায় বা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় গৃহীত এসব অর্থের কোনো প্রতিফলন এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান না। সারা বিশ্ব যেখানে টেস্টের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সব ধরণের উদ্যোগ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে শুধু কিটের ঘাটতি দেখা দেয়ায় নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

উচ্চহারের সংক্রমণের মুখে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার কথা বলা হলেও, এখন তা সীমিত ১৬ বা ১৭ হাজারের মধ্যে। করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তথ্য মতে, জুলাই মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত মোট ৯০৪,৭৮৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার ১৯.৪০ শতাংশ করোনাভাইরাস আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারত, যেখানে মোট সংক্রমণের সংখ্যা এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম, নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সেখানে শনাক্তের হার সাত শতাংশ। এই চিত্র থেকে হয়তো অনুমান করা যেতে পারে বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র কত ভয়াবহ হতে পারে।

ধনী-দরিদ্রের বিভাজন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলি বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ইতিবাচক থাকলেও ধনী-দরিদ্রের বিভাজন কমেনি, কমেনি মানুষের বেকারত্ব বা কৃষকের বঞ্চনা। জিডিপির সাথে সাথে সাধারণ মানুষের বিশেষত: নিম্নবিত্ত, দরিদ্র বা হত দরিদ্র মানুষের জীবন-মান বদলায়নি।

এই মহামারির কালে তারা কেমন আছে তা অনুমান করা যায় যখন মৃত্যুর ভয় না পেয়ে মানুষ কাজের সন্ধানে বের হয়। অথচ দেশের সকল নিপীড়িত মানুষকে সুরক্ষা দেবার দায়িত্ব সরকারের।

বাংলাদেশে অন্তত প্রতিটি মানুষ যাতে এই সময়ে কোভিড-১৯ মোকাবেলাকেই সবচেয়ে প্রাধান্য দিতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের ন্যায্য পাওনা। কিন্তু পরিস্থিতি একদম উল্টো।

মানুষ খাদ্যাভাবে আছে, জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছে বাধ্য হয়ে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই মহামারির মধ্যেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছেন।

সরকার ব্যর্থ হয়েছে

দৃশ্যত: সরকার সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় দুর্যোগকালীন আর্থিক সহযোগিতা পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ এর কারণে বাংলাদেশে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় ৭৩২ মিলিয়ন ডলার বা ৬২২২ কোটি টাকার একটি জরুরি লোন অনুমোদন করেছে। আইএমএফ বলছে এই অর্থ বাংলাদেশ সরকার দেশের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে রাখতে যে প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়েছে তা বাস্তবায়নে ব্যয় করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে হত দরিদ্রের সংখ্যা ২ কোটি ৪১ লাখ। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে (পিপিপি) যাদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পিপিপি ডলারের মান নির্ণয় করেছে ৩২ টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশে ২ কোটি ৪১ লাখ মানুষ দৈনিক ৬১ টাকা ৬০ পয়সাও আয় করতে পারে না।

এই দুর্যোগে কর্মহীন মানুষকে সরকারের ১০ টাকা কেজি চালের খাদ্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে কিংবা রিলিফ দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দলের নেতাদের ভয়ানক দুর্নীতি, অনিয়ম আমরা দেখলাম। সরকারকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে দরিদ্র মানুষের কাছে সরকার কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে সাহায্য পৌঁছে দেবে। এই সহায়তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে সরকারকে বিতরণের পুরো পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে।

জবাবদিহিতার অভাব

বিগত প্রতিটি নির্বাচনে ভোট কারসাজি, চুরিই ছিল গণমাধ্যমের খবর। আজ যারা নেতা এবং পাতি নেতা, তারা জানেন, ভোটার ছাড়াও, জনগণকে পাশ কাটিয়েও তারা নির্বাচিত হতে পারেন।

সম্প্রতি ইমপেরিয়াল কলেজের কোভিড-১৯ অ্যানালাইসিস টুলস এর দেয়া তথ্যানুসারে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা থাকবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে।

এই গবেষণা দাবি করছে, লকডাউন ও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা তাদের আগের টুলসে তুলে ধরা তথ্যের চেয়ে ৭৫ ভাগ কম হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান, প্রতিদিনই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। শুধু কিছু অঞ্চলকে রেড জোন ঘোষণা করে লকডাউন জারি রাখলে তা যে ক্রমশ: পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে এখন তা স্পষ্ট।

সরকার প্রতিটি সেক্টরকে স্টিমুলাস প্যাকেজের আওতায় এনে, ইনফরমাল শ্রমিকদের অর্থ, দরিদ্র মানুষকে অর্থ সহায়তা দিয়ে, একমাত্র কঠোর লক ডাউনের মধ্যে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে হয়ত শুধু মানুষই প্রাণ হারাবে না, অর্থনৈতিকভাবেও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ কোভিড-১৯ কে জয় করতে পারেনি, তবে আগামী দিনের ইতিহাসের রূপ কেমন হবে তা নির্ধারিত হবে খুব দ্রুত। সরকার কি সত্যি সত্যিই “করোনার চেয়ে শক্তিশালী” হয়েছে? সেই সক্ষমতা কি আমরা দেখবো সহসা? বিবিসি বাংলা

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন