রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শেষ কোথায়?

0
448
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শেষ কোথায়?


সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জনগণের অর্থসম্পদ আত্মসাৎ, ত্রাসের রাজনীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে দেশ আজ পরিণত হয়েছে নৈরাজ্যের শাসনব্যবস্থায়।

এক ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণ শেষ হতে না হতেই এরচেয়েও ভয়ঙ্করতর কোনো ঘটনা দৃশ্যপটে চলে আসছে।

সম্প্রতি মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষের সামনে বাস্তবতার আরেকটি করুণ পাঠ উন্মোচিত করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে এমন এক ভয়ঙ্কর অপরাধচক্র জনগণের ঘাড়ে চেপে বসেছে যার গভীরতা-পরিসর নির্ণয় করা অসম্ভব।

গেলো দুই বছরে টেকনাফ থানায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে দুইশটির উপরে। এসব হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিলো নিরপরাধ। সদ্য বিদেশ থেকে ফিরেছে, জমি বিক্রি করেছে, ব্যবসায় লাভ ভালো হয়েছে এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হতো। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই বন্দুকযুদ্ধ নাটক মঞ্চায়ন করা হতো। এমনকি ক্রসফায়ারের পর উল্টো ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যের নামে ঠুকে দেওয়া হতো মাদক মামলা। (1)

এতোদিন হামলা-মামলার ভয়ে চুপ থাকলেও সম্প্রতি গণমাধ্যমে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। বেরিয়ে আসছে একের পর এক থলের বেড়াল। এসব তথ্য দেশের সাধারণ জনতাকে রীতিমতো বাকরুদ্ধ করে দিচ্ছে। সিনেম্যাটিক কায়দায় এভাবে হত্যা-নির্যাতন দানবীয় পৈশাচিকতাকেও হার মানায়।

এ তো গেলো একজনমাত্র ওসির অপরাধের ফিরিস্তি। সারাদেশে এমন আরো কতো প্রদীপ রয়েছে সেই বাস্তবতা জনগণের চোখের অলক্ষে। পুলিশ বাহিনীর সাথেসাথে স্থানীয় নেতাকর্মী চেলা-চামুণ্ডাদের নির্যাতন-নিপীড়ন তো নিত্য ঘটনা। করোনাকালীন ত্রাণ লুটের ঘটনায় দেশের ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থার চিত্র সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।


ওসি প্রদীপের অপকর্ম প্রকাশ্যে আসার পর থেকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন জনগণ। ইতোমধ্যে আরো বেশ কয়েকটি থানার ওসিদের চাঁদাবাজি, ঘুষ লেনদেন ও জুলম-নির্যাতনের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে মামলা ঠুকে দেওয়া, বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা, এসব আজ পুলিশ বাহিনীর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে প্রয়োজনানুসারে এসব হাতিয়ার ব্যবহার করছে তারা।

এমনকি টেকনাফের এই ঘটনা নিয়ে দেশের সর্বত্র সমালোচনা-প্রতিবাদের মধ্যেই জাফর নামে এক উমান প্রবাসীকে ক্রসফায়ারে হত্যার খবর উঠে এসেছে। পরিবার সূত্র জানিয়েছে, জাফরকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে কক্সবাজারের পটিয়া থানার ওসি। টাকা দিতে না পারায় গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। (2)

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব অপরাধ চলতে থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? বদলি কিংবা প্রত্যাহার করাই কি খুনের যথাযথ শাস্তি? কাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পুলিশ বাহিনী এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে?

২০১৭ সালে আব্দুস সাত্তার নামে একজন লবণ ব্যবসায়ীকে বিনা অপরাধে হত্যা করে ওসি প্রদীপ। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী টেকনাফ থানায় প্রদীপসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরো কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পুলিশ সেই মামলা গ্রহণ করেনি। পরে হাইকোর্টে রিট হলে এফআইআর দাখিলের আদেশ দেয় আদালত। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল ও খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুপারিশের কারণে বহাল তবিয়তেই ছিলেন প্রদীপ। অথচ সাবেক আইজিপি নিজে তখন প্রদীপকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আইজিপিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রদীপ স্বপদে থেকেছেন বহাল। (3)

এভাবেই সন্ত্রাসের গডফাদাররা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে অপরাধীদের সার্বক্ষণিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে পুলিশ বাহিনীর নানাবিধ অপরাধকে বিনা বিবেচনায় সমর্থন দিচ্ছে।

লবণ ব্যবসায়ী হত্যার ঘটনায় প্রদীপের বিচার হলে আজকে সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো না। দুইশো নিরপরাধ মানুষকে ক্রসফায়ারে জীবন দিতে হতো না। যারা ওইসময় প্রদীপকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে তারাই কি এসব খুনের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ি নয়?


বর্তমানে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী সংগঠন হলো পুলিশ। এরা জনগণের ট্যাক্সে লালিতপালিত হয়ে জনগণের গলায়ই ছুরি চালাচ্ছে। গুম-খুন-চাঁদাবাজী-দুর্নীতি-অনিয়ম এমন কোনো অপরাধ নেই যেখানে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা না আছে।

অপরদিকে তাওহিদি জনতার রক্ত ঝরাতেও দক্ষযজ্ঞের ভূমিকা পালন করছে এই পুলিশ বাহিনী। বিগত এক যুগে কতো নবিপ্রেমী জনতার বুক বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে দালাল পুলিশ বাহিনী, তার সঠিক হিসেব অজানা।


মূলত পুলিশের এতোসব অপকর্ম প্রকাশ্যে আসার পরেও রাষ্ট্র এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। পুলিশের অপকর্মে সমর্থন যোগাচ্ছে খোদ হাসিনা এবং তার অধীনস্থরা। পুলিশকে শাস্তির মুখোমুখি করার শক্তি বিন্দুমাত্রও নেই এই তাগুত সরকারের। এরা পুলিশের কাছে জিম্মি। অবৈধভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এরা পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে; বিনিময়ে দিয়েছে অপকর্মের লাইসেন্স।

এছাড়াও পুলিশের এসব অপকর্মের পেছনে রয়েছে ভারতের পৃষ্ঠপোষকতা। পুলিশ পরিণত হয়েছে দিল্লির অঘোষিত সংস্থায়। এমনকি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’ এর ইশারায় জঙ্গিনাটক সাজিয়ে প্রতিনিয়ত নিরপরাধ মুসলিমদের হত্যা করছে পুলিশ। ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গি অভিযানের নামে শতশত যুবককে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদরাসার তালিবুল ইলম, মাসজিদের ইমাম, আলিম-ওলামা থেকে কেউ বাদ পড়েনি পুলিশের জঙ্গি নাটক থেকে। অনেককে গুম করা হয়েছে, অনেককে গ্রেফতার করে বছরের পর বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে।

মুসলিমদের জন্য সময় এসেছে এসব রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার। জালিম কখনো স্বেচ্ছায় যুলম বন্ধ করে না; ইতিহাসে এমন কোনো নজির দেখা যায়নি কখনো। জালিমকে শায়েস্তা করতে হয়। জালিমকে থামিয়ে দিতে হয়।

উপমহাদেশের কোনো এক প্রখ্যাত আলিম বলেছিলেন, ‘আমি জালিমের যুলম দেখে কষ্ট পাই না। আমি কষ্ট পাই মাজলুমের নীরবতা দেখে।’

তথ্যসূত্র:
1. তথ্যসূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন, ১২ই আগস্ট ২০২০
2. সময় টেলিভিশন, ১৭ আগস্ট ২০২০
3. সময় টিভি অনলাইন সংস্করণ, ১০ আগস্ট ২০২০


লেখক: আবু নাফি আল-হিন্দি

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন