
ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় ৩ মুসলিম মাংস ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে মারধর করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা। ২৬ জানুয়ারি রিপাবলিক দিবসের প্রাক্কালে বিষ্ণুপুর থানার জুলপিয়া এলাকায় এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের নাম ফরাজ আলী পিয়াদা (৩৫), আক্কাস আলী পিয়াদা (৩৭) এবং আনসার আলী পিয়াদা (২৯)।
তারা বারুইপুরের খোদার বাজার মধ্যপাড়ার বাসিন্দা, বেশ কয়েক বছর ধরে তারা স্থানীয় কাচারী বাজারে খাসির মাংসের ব্যবসা করে আসছেন।
ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, কেনাবেচা সংক্রান্ত মতবিরোধ থেকে উক্ত মবের ঘটনার সূত্রপাত হয়। একদল হিন্দুত্ববাদী ক্রেতা তাদের ক্রয়কৃত মাংসের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট ও অভিযোগ করেছিল। তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে অতিরিক্ত আরও ৩টি ছাগল জবাই করেছিল মুসলিম দোকানিরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাংস ক্রয়ে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং তাদের অর্থ ফেরত চায়। বিবাদ এড়াতে তখনই অর্থ ফেরত দেন মুসলিম দোকানিরা।
কিন্তু ঘটনাটি এখানেই সমাপ্ত হয়নি। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে একটি স্থানে ভুক্তভোগী ফরাজ আলী’র পথ আটকায় ৪ জন উগ্রবাদী হিন্দু। তাকে টেনে হেঁচড়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জন উগ্রবাদী হিন্দু তার উপর হামলা চালায়। ফরাজ জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ আসার আগেই তীব্র মারধরে তার অবস্থা যেন অর্ধমৃত হয়ে পড়েছিল। তারা ধর্মীয় ও বাংলাদেশি পরিচয় তুলে বারবার অপমান করছিল, “তোরা মুসলিম, তোরা বাংলাদেশি, তোরা আমাদের খাবার, জমি অবৈধ ভোগ করিস”।
ফোনে খবর পেয়ে আক্কাস আলী ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন হিন্দুত্ববাদীদের নৃশংসতা আরও বেড়ে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, উগ্র হিন্দুরা তাকে ঘিরে ফেলেছিল, ধর্ম ও বাংলাদেশি পরিচয় উল্লেখ করে গালিগালাজ করছিল। তারা তাকে আধার কার্ড দেখাতে বাধ্য করছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিক আধার কার্ড দেখাতে তিনি সক্ষম হননি। তখন নিজ পিতামাতা সম্পর্কে অপমানজনক ও অশ্লীল বাক্য উচ্চারণে তারা তাকে বাধ্য করেছিল।
সবচেয়ে নির্দয় পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন আক্কাস আলীর স্ত্রীর সুজাতা বিবি। তিনি স্বামীকে ঘরে ফিরতে না দেখে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। তিনি বর্ণনা করেন, উগ্র হিন্দুরা সশস্ত্র ছিল। তাদেরকে বাধা দিতে গেলে তারা আমার শ্লীলতাহানি করে, আমার জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলে, বুকে লাথি মারে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হত্যাকারীরা ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাওয়ার অজুহাতে আমাদের পুরুষদের বিবস্ত্র করেছে। এমনকি তাদেরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল।
অপর এক ভুক্তভোগী আনসার আলী তার ভাইদের উদ্ধারের চেষ্টা করলে তিনিও মারধরের শিকার হন। সেসময় উগ্র হিন্দুরা তাদের চেইন, মানিব্যাগ ও নগদ অর্থ লুটপাট করে নেয়।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৩ ভুক্তভোগীকে প্রাথমিকভাবে বারুইপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে বর্তমানে তারা নিজ বাড়িতে বিশ্রামরত অবস্থায় আছেন, প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক দুর্দশার মধ্যে তারা দিনপার করছেন।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি আসামীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানায় পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
তবে পুলিশের গ্রেপ্তারের গতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। কেননা চন্দন মণ্ডল, কার্তিক নাস্কর, ইন্দ্র ঘোষ এবং আকাশ সহ বেশ কয়েকজন প্রধান আসামী এখনও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উক্ত ঘটনার তীব্র নিন্দা ও সুষ্ঠু ন্যায়বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগীসহ মানবাধিকার কর্মীগণ।
তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/5n8z6d5u


