
আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
২০২১ সালে কাবুল পুনর্দখলের পর তালিবান মুজাহিদিনের হাতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান। বয়সে নবীন হলেও ইমারাতে ইসলামিয়া ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রদর্শন করেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে ইমারাতে ইসলামিয়া।
ইরানের সঙ্গেও এখন বাস্তববাদী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ইমারতে ইসলামিয়া। সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ধারাবাহিক সংলাপ প্রমাণ করে ইমারাতে ইসলামিয়া বাস্তবতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
চীন এখনো স্বীকৃতি দেয়নি ঠিকই, তবে তালিবানের সঙ্গে বহুবার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্পষ্ট করেছে- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, খনিজ সম্পদ আহরণসহ নানা বিষয়ে বেইজিং এখন কৌশলগতভাবে তালিবান সরকারের সাথে কাজ করতে চায়। চীনের এই আগ্রহ কেবল কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। আফগানিস্তানের ভূ-অবস্থান এবং সম্পদ চীনকে এই অঞ্চলে এক নতুন মিত্র খুঁজে পেতে বাধ্য করছে।
ইমারাতে ইসলামিয়া প্রশাসন কে উপেক্ষা করার ক্ষমতা হারিয়েছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো। ভারতের মতো চিরবিরোধী শক্তি থেকে শুরু করে ইরান ও চীনের মতো প্রভাবশালী প্রতিবেশী পর্যন্ত তালিবান নেতৃত্বাধীন ইমারতে ইসলামিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এ যেন স্বীকৃতি না দিয়েও বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ারই নামান্তর।
ভারত সরকার অনেক আগে থেকেই আফগানিস্তানে বিভিন্ন ধরণের বিনিয়োগ করে রেখেছে। ভারতও বর্তমানে আফগানিস্তান কে কূটনৈতিকভাবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমান ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে অনেক দেশের সাথেই কূটনৈতিক ও বানিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করছে। যাতে তাঁরা একটি স্ট্যাবল কন্ডিশনে যেতে পারে। যেখানে রাশিয়া, চীন, ভারতের মতো চির বিরোধী রাষ্ট্র গুলো ইমারাতে ইসলামিয়ার আঞ্চলিক সক্ষমতা ও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আফগানিস্তানে বিভিন্ন ধরণের বিনিয়োগ করছে, কূটনৈতিক ও বানিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে যে- ইমারাতে ইসলামিয়া কোনো একক ব্লকের অংশ নয়, বরং বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায়। দীর্ঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের জন্য এই বাস্তববাদী কূটনীতি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়।
সেখানে পাকিস্তান সরকার কালপ্রিট হয়ে এসেছে। যদিও তাদের এ চরিত্র নতুন নয়। অতীতে আমেরিকা-ন্যাটো জোটকেও পাকিস্তান সামরিক বাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছে। আমেরিকার হয়ে আফগানিস্তানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের আকাশে আমেরিকাকে ফ্রি এক্সেস দিয়েছে। এখন ইমারাতে ইসলামিয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন করে তারা ইমারাতের বিরোধিতা ও ক্ষতি করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান শরণার্থীদের গণহারে বহিষ্কার সহ অসংখ্যবার কল্পিত ডুরান্ড লাইনে বোমা হামলা চালিয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার জন্য বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে আফগান মৌসুমে পাকিস্তান তাদের বর্ডার অফ রাখে! আর পাকিস্তান মৌসুমে খুলে দেয়! সুস্পষ্টভাবে পাকিস্তান ইমারাতে ইসলামিয়ার প্রতি কোন প্রতিবেশি/ বন্ধুসুলভ আচরণ করেনি।
তারা ইমারাতে ইসলামিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের মিডিয়া প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। ভারতের সাথে আফগানিস্তানের বানিজ্যিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা রয়েছে যেমনটি রয়েছে চীন ও রাশিয়ার সাথে। কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের কাছে ইমারাতের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার জন্য মিডিয়া প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে যে – ইমারাতে ইসলামিয়া ভারতের সাথে হাত মিলিয়েছে! অথচ ইমারাতের এই বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা অন্য দশটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে যেমন, ভারতের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।
অথচ পাকিস্তান সরকার নিজেরাই আমেরিকার গোলামী করছে, আমেরিকার প্রক্সি বাহিনী হয়ে ইসলামী ইমারতের পবিত্র ভূমিতে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষদের রক্ত ঝরাচ্ছে। তাছাড়া গত সপ্তাহ খানেক ধরে পাকিস্তান যে এত এত ইন্টেলিজেন্স তথ্যের উপর ভিত্তি করে ইমারাতে ইসলামিয়ার উপর হামলা করল; এতে কয়জন টিপির লোক হতাহত হয়েছেন? শুধু নিরীহ মানুষদের শহীদ করা ছাড়া এই আমেরিকান প্রক্সি আর কিছু পারে কিনা আল্লাহই ভালো জানেন।
পৃথিবীব্যাপী কোথাও কোন মুসলমানদের সাহায্যকরণে আমেরিকান প্রক্সি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কোন পদক্ষেপ থাকে না; তাদের সেনা বাহিনী, অস্ত্র, গোলাবারুদ সবই আমেরিকার গোলামীতে নিবেদিত! অথচ যখন ইমারতে ইসলামিয়া নির্যাতিত মুসলিমদের আশ্রয়স্থল রূপে আবির্ভূত হয়েছে, ইসলামী শরিয়াহ প্রতিষ্ঠা করেছে- আফগানিস্তানের আপামর জনসাধারণ যার সুফল ভোগ করছে। ইমারাতে ইসলামিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে নিজের বাণিজ্যিক তৎপরতা রাশিয়া, চীন সহ ভারতেও বিস্তৃত করেছে- ঠিক সেই সময়ে পাকিস্তান ভারতের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে!
যেখানে কাজাকিস্তান, তাজিকিস্তান, রাশিয়া, চীন, ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্যের মাধ্যমে ইমারাতে ইসলামিয়া নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি খুঁজছে, সেখানে পাকিস্তান নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি খুঁজছে আমেরিকার হয়ে মুসলিমদের রক্ত ঝরিয়ে।
সবশেষে বাস্তবতা এটাই- আফগানিস্তানের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে উপেক্ষা করার সুযোগ কারো নেই। ইমারাতে ইসলামিয়া নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে আঞ্চলিক বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে চাইছে। স্বীকৃতি দিক বা না দিক, সম্পর্কের টেবিলে বসতে হচ্ছে সবাইকে। আর এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে- ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও আফগানিস্তান আজ আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, এবং ইমারাতে ইসলামিয়াই সেই কেন্দ্রের নিয়ামক শক্তি।


