সাহেলে জান্তা ও রাশিয়ার ব্যর্থতার তিন বছর: জেএনআইএমকে হটিয়ে অঞ্চল পুনর্দখলের গল্প থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানোর তিক্ত বাস্তবতা

0
2

তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার- এই তিন দেশ মিলে গঠন করেছিল সাহেল রাষ্ট্রজোট (AES)। তাদের কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি ছিল একটাই- পশ্চিমা শক্তির বিদায়ে রাশিয়ার সহায়তায় দেশের ভূখণ্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা। সেই সময় কিদাল ছিল বিদ্রোহী CMA-র দখলে, মালি থেকে তখন জাতিসংঘ মিশন MINUSMA বিদায় নিচ্ছে, আর মাঠে নতুন মুখ ওয়াগনার।

তিন বছর পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এসে প্রশ্ন উঠছে, সেই প্রতিশ্রুতির কতটুকু পূরণ হয়েছে?

আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ‘ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্টের’ গবেষক লিয়াম কারের সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং মাঠের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মালিয়ান সেনা ও ওয়াগনার যে কিদাল পুনর্দখলকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে প্রচার করেছিল, সেই কিদালই গত ২৫ এপ্রিল এফএলএ ও জেএনআইএম-এর যৌথ অভিযানে আবার জান্তার হাতছাড়া হয়েছে। রুশ আফ্রিকান কর্পস ২৬ এপ্রিল কিদাল এবং ১ মে তেসালিত থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। আর গাও রাজ্যের কেন্দ্রীয় শহরে জান্তা সদস্যরা অবস্থান করলেও তা চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ এবং প্রতিনিয়ত জেএনআইএমের সফল হামলার লক্ষ্যবস্তু।

এই পিছু হটার চিত্রটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ‘দিওরা’ নামক সামরিক ঘাঁটিতে। ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই ঘাঁটিতে হামলা করেছিল বিদ্রোহী CSP গ্রুপ। ঠিক তিন বছর পর, ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর একই ঘাঁটিতে অভিযান চালিয়েছেন জেএনআইএম যোদ্ধারা। একই ক্যাম্প, ভিন্ন চেহারা, মাঝখানে তিন বছরের রুশ অংশীদারিত্ব— দিওরাই যেন AES জোটের তিন বছরের সারসংক্ষেপ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বরের হামলাটি ছিল মালির ইতিহাসে অন্যতম প্রাণঘাতী। রয়টার্সকে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এতে ১২০-১৩০ জান্তা সদস্য নিহত ও প্রায় ১০০ সদস্য জেএনআইএমের হাতে আটক হয়েছে, যেখানে জেএনআইএম এক বিবৃতিতে নিহতের সংখ্যা ১৫০ পর্যন্ত উল্লেখ করেছে। ফরাসি পর্যবেক্ষকদের মতে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৫ জন রুশ আফ্রিকান কর্পসের সদস্যও রয়েছে। সেনাবাহিনী হামলার কথা স্বীকার করলেও কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। ঘাঁটি থেকে ২৬টি ভারী অস্ত্র, ২টি ড্রোন এবং ২টি রাডারসহ বিপুল অস্ত্র জেএনআইএমের হস্তগত হয়েছে।

এরপরের ঘটনাপ্রবাহ জান্তার জন্য আরও উদ্বেগজনক। কেননা জেএনআইএম ১৪ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর টানা ছয় রাত ধরে মধ্য মালির প্রধান বিমানঘাঁটি সেভারে (এয়ারবেস ২০০) তে বোমাবর্ষণ করেছে। সর্বশেষ দুই রাতে বিমানঘাঁটিতে ভারী আর্টিলারি হামলার পাশাপাশি শেষ রাতে একাধিক আত্মঘাতী ড্রোন ব্যাবহার করে আক্রমণ চালানো হয়েছে। ফলে তুরস্কের ৪টি বায়রাকতার ড্রোন সহ মোট ৭টি ড্রোন এবং ৫টি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে। সামরিক বাহিনীতেও হতাহতের ইঙ্গিত দিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো।

এই ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর কোনা ঘাঁটিতে জেএনআইএমের হামলায় আরও ৩৩ এরও বেশি জান্তা (সেনা) সদস্য নিহত হয়। এমনকি ১৮-১৯ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানী বামাকোর উপকণ্ঠেও জান্তার ২টি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালানো হয়েছে।

জেএনআইএম-এর কৌশল এখন আর বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত অবরোধ কৌশল।

প্রথমত, তাঁরা আকাশ শক্তিকে অচল করতে চান। সেভারে ঘাঁটি হলো মালির ড্রোন বহরের (৮টি আকিঞ্চি ও ১৭টি TB2) প্রাণকেন্দ্র। এটি ধ্বংস করতে পারলে মধ্য মালিতে জান্তার জন্য আকাশ থেকে সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ২০শে সেপ্টেম্বর রাতে ঘাঁটিটি জেএনআইএমের সফল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

দ্বিতীয়ত, জেএনআইএম এই অঞ্চলের RN16 ও RN38 হাইওয়ে সহ স্থল সরবরাহ লাইন কাটতে চায়। সেভারে, কোনা, গাও শহরের এই RN16 হাইওয়ে হলো উত্তর মালিতে পাল্টা অভিযানের প্রধান রাস্তা। ACLED-এর তথ্য বলছে, ২৫ এপ্রিলের পর থেকে এই রাস্তায় জেএনআইএম ৩২টি আইইডি হামলা চালিয়েছে, যেখানে বছরের প্রথম চার মাসে ছিল মাত্র ১টি।

আর এই প্রভাব এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্টের ২৪ সেপ্টেম্বরের মানচিত্র বলছে, JNIM-এর সমর্থন অঞ্চল এখন সেগু ও মোপটি থেকে শুরু করে বুরকিনা ফাসোর উত্তরে ওয়াহিগুয়া পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ব্লকে পরিণত হয়েছে। তারা মৌরিতানিয়া সীমান্তবর্তী ওয়াগাদু অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় স্থানীয়দের সাথে চুক্তির মাধ্যমে ঘাঁটি গেড়েছে এবং সেখান থেকে অস্ত্র ও জ্বালানি সংগ্রহসহ হামলা পরিচালনা করছে।

চিত্রটা শুধু মালিতেই সীমাবদ্ধ নয়। নাইজারের তিল্লাবেরিতে মে মাসে ৬০ জান্তা এবং জুনে ইনাতেসে ৭০ জান্তা সদস্য নিহতের ঘটনা ঘটেছে। আর ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ২৯% নিরাপত্তা ঘটনা বৃদ্ধি প্রমাণ করে, পুরো সাহেল জুড়েই জান্তা বাহিনীগুলোর জন্য সংকট গভীর হচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, AES কি ব্যর্থ? রাশিয়ার সহায়তায় ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের যে মডেল নেওয়া হয়েছিল, তা কি কাজ করেনি? কিদালের পতন, দিওরার পুনরাবৃত্তি এবং সেভারে ও বামাকোর উপকণ্ঠে হামলা— এই ৪টি ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামরিক শক্তি দিয়ে ভূখণ্ড দখল করা গেলেও, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়া তা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

এর বিপরীতে প্রতিরোধ বাহিনী জেএনআইএম যেখানে স্থানীয়দের সাথে চুক্তি, বিরোধ নিষ্পত্তি, জনগণের সমস্যা সমাধানে সজাগ দৃষ্টি এবং জান্তার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ শহর ও সড়কগুলোতে অবরোধের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে, সেখানে শুধু ড্রোন ও ভারী অস্ত্র দিয়ে তার মোকাবেলা করা জান্তার জন্য সম্ভব হচ্ছে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জান্তার চলাচলের উপর নজরদারি ড্রোনের পাশাপাশি সঠিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে আঘাত হানতে সক্ষম আত্মঘাতী ড্রোন।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধহেরাতের ব্যাটারি শিল্পে ব্যাপক অগ্রগতি, আরবের বাজারে ২০ লাখ ডলারের ব্যাটারি রপ্তানি