সেক্যুলার রাষ্ট্রের দ্বিচারিতাঃ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর ইজ্জত-সম্মানের চেয়ে কি রাজনৈতিক নেতাদের ইজ্জতের দাম বেশি?

0
9

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম

ক্ষমতার দম্ভ ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন চিত্র আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রকট। উদাহরণ হিসেবে- কুমিল্লায় বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে ফেসবুকে সামান্য মন্তব্যের জেরে এক যুবককে নিমিষেই আটক করা হয়, আর ফেনীতে জাইমা রহমান সম্পর্কে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে আরেক যুবককে যেতে হয় কারাগারে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে রাজশাহীর আবু বকর সিদ্দিকের ঘটনাটি এই অসহিষ্ণুতার এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বাসের ছবিসংবলিত একটি পোস্টে উসকানিমূলক মন্তব্যের দায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল তাকে গ্রেপ্তারই করেনি, আদালত তার সাত দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ওই যুবক যখন স্বীকার করে যে মন্তব্যটি নিছক কৌতূহল বা ‘মজা’ থেকে করা একটি মারাত্মক ভুল ছিল, তখনো কোনো দয়া মেলেনি। উল্টো তার সেই একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ওঠে, এমনকি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যত হয়। শুধু তা-ই নয়; অতীতে পাড়ার চায়ের দোকানে, জনসমক্ষে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে কোনো আপত্তিকর বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করলেই মন্তব্যকারীকে নির্দয় গণধোলাই বা শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। ক্ষুব্ধ দলীয় সমর্থকেরা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে তাদের রক্তাক্ত করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে- এমন অসংখ্য ঘটনা এই দেশে ঘটেছে। ক্ষমতার প্রতি এই অন্ধ দাসত্ব এতটাই তীব্র যে, নিজের প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুক লাইভে এসে ‘কাকে ভোট দিলাম- এমন আক্ষেপ করায় এক অসহায় নারীকেও গ্রেপ্তারের শিকার হতে হয়েছে।

অথচ এই একই রাষ্ট্রের বুকে যখন মুসলমানদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও পবিত্রতম আবেগের জায়গায় আঘাত হানা হয়, তখন আমরা দেখতে পাই এক চরম হতাশাজনক ও বৈষম্যমূলক চিত্র। এরকম অসংখ্য ঘটনা এদেশে ঘটেছে। সুনামগঞ্জে কুপেশ রায় নামের এক হিন্দু পুলিশ সদস্য যখন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও জঘন্য কটূক্তি করে, তখন তাকে শাস্তির আওতায় আনার বদলে উল্টো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের বিশেষ প্রোটোকলে সযত্নে আগলে রাখা হয়। আবার টঙ্গী মাদরাসার একটি ঘটনা নিয়ে বিতর্কের জেরে এক অনলাইন শিক্ষক যখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর পবিত্র শানে অবর্ণনীয় কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কটূক্তি করে, তখন চারপাশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে আইনের আওতায় আনতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর পবিত্র শানে কটূক্তি বা অবমাননা এক ক্ষমার অযোগ্য ও জঘন্যতম অপরাধ। ফুকাহায়ে কেরাম ও ইসলামিক স্কলারদের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর শানে বিন্দুমাত্র কটূক্তি করে, সে তার ইমান হারিয়ে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহ) রচিত জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল’ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস কাজি আয়াজ (রহিমাহুল্লাহ)-এর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ-শিফা’-তে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর পবিত্র শানে কটূক্তিকারীর একমাত্র আইনি পরিণতি হলো মৃত্যুদণ্ড। এই অমোঘ বিধানের সপক্ষে তাঁরা কোরআন-সুন্নাহর পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেইন এবং উম্মতের শীর্ষস্থানীয় ফুকাহায়ে কেরামের ‘ইজমা’ বা সর্বসম্মত ঐকমত্যকে সুস্পষ্ট দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কাজি আয়াজ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আশ-শিফা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন- যে ব্যক্তি মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে গালি দেবে বা তাঁর শানে সামান্যতম অবমাননা করবে, তাকে হত্যা করার বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর নিরঙ্কুশ ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে। একইভাবে, আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহ) কোরআনের আয়াত, অগণিত হাদিস ও সাহাবিদের প্রত্যক্ষ আমলের প্রামাণ্য দলিল হাজির করে তাঁর গ্রন্থে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন যে, এই জঘন্যতম ধৃষ্টতার ক্ষেত্রে অপরাধী মুসলিম হোক বা অমুসলিম- মৃত্যুদণ্ডই তার একমাত্র শাস্তি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই ধৃষ্টতার পরিণতি সম্পর্কে সূরা আল-আহযাবের ৫৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন,
اِنَّ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ لَعَنَہُمُ اللّٰہُ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ وَاَعَدَّ لَہُمۡ عَذَابًا مُّہِیۡنًا
“নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের ওপর দুনিয়া ও আখিরাতে লানত বর্ষণ করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন এক লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।”

বিশ্বনবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্মানের জায়গাটি ইসলামে ও মুসলমানদের নিকট কতটা স্পর্শকাতর, তা হাদিস ও ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। সুনানে আবু দাউদে (হাদিস নম্বর: ৪৩৬১) বর্ণিত এক প্রামাণ্য হাদিসে এসেছে- জনৈক অন্ধ লোকের একটি উম্মু ওয়ালাদ (ক্রীতদাসী) ছিল। সে নবী (ﷺ) -কে গালি দিত এবং তার সম্পর্কে মন্দ কথা বলত। অন্ধ লোকটি তাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিরত হত না। সে তাকে ভর্ত্সনা করত; কিন্তু তাতেও সে বিরত হত না।একরাতে সে যখন নবী (ﷺ) -কে গালি দিতে শুরু করল এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে লাগল, সে একটি ধারালো ছোরা নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করল। ভোরবেলা নবী (ﷺ) ঘটনাটি অবহিত হয়ে লোকজনকে সমবেত করে বললেন, “তোমরা সাক্ষী থাকো, তার (এই মহিলার) রক্ত বৃথা গেল।”

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী এই রাষ্ট্রে আজ এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্রপ্রধান, তার মা-বাবা কিংবা কন্যাকে নিয়ে কেউ সামান্যতম সমালোচনা করলে, এমনকি তাদের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তাকে অবধারিতভাবে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হয়; নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। তখন সেই অসহায় ভুক্তভোগীদের ওপর উন্মত্ত দলীয় লোকদের আক্রমণ বা মব জাস্টিসও যেন জাদুকরী উপায়ে অলিখিত বৈধতা পেয়ে যায়! এর বিপরীতে, মুসলমানদের কলিজার টুকরা, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এঁর পবিত্র শানে যখন কোনো ধৃষ্টতাকারী চরম অবমাননাকর মন্তব্য করে, তখন সুকৌশলে তাদের সেই জঘন্য অপরাধকে ‘বাকস্বাধীনতা’র মোড়কে বৈধতা দেওয়ার এক ঘৃণ্য পাঁয়তারা চলে। এই অপরাধীদের গায়ে যেন আঁচড়টি না লাগে, সে জন্য রাষ্ট্র তার নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দেয়। আর যখন বুকের রক্তক্ষরণে দগ্ধ ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা রাজপথে নেমে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সেই অবমাননার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান, তখন সুশীল সমাজের চোখে সেই প্রতিবাদী মানুষেরাই হয়ে যান উচ্ছৃঙ্খল ‘মব’! এই রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা ও মূল্যবোধ আজ এতটাই তলানিতে ঠেকেছে যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এঁর অতুলনীয় সম্মানের চেয়ে সাধারণ সেক্যুলার নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত ইজ্জতের মূল্য যেন অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী বিচিত্র এই রাষ্ট্রযন্ত্র, আর কী দুর্ভাগা জাতি আমরা!

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধপশ্চিমবঙ্গে ‘জলকে পানি’ ও ‘মা-কে আম্মা’ বলা যাবে না বলে সতর্ক করেছে হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু