
কলকাতার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় এক মাস ধরে পানির সরবরাহ বন্ধ রেখেছে হিন্দু্ত্ববাদী সরকার। ফলে পানি সংকটে পড়েছে কয়েকশ মুসলিম পরিবার। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে তারা গঙ্গার পানি ব্যবহার করছেন। ফলশ্রুতিতে তাদেরকে নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
কলোনিতে ছয়টি পানির কল রয়েছে। ২৯ জুলাই থেকে সব কটি কলেই পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের কলগুলো শুকিয়ে থাকলেও একই সড়কের হিন্দু অধ্যুষিত কলোনিগুলোর পানির কল সচল রয়েছে।
জ্যোতিনগর কলোনি কলকাতা পৌর কর্পোরেশনের (কেএমসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাশীপুর এলাকায় অবস্থিত। প্রায় ৬০ বছর ধরে এখানে প্রায় ৫ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। অধিকাংশ বাসিন্দাই মুসলিম। অল্পসংখ্যক হিন্দু পরিবারও এখানে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এলাকাটি ‘মোল্লাপাড়া’ বা মুসলিম কলোনি নামে পরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ২৭ জুলাই কেএমসির কর্মীরা কলোনির পানির পাইপলাইন মেরামত করতে এসেছিল। ২৯ জুলাই পর্যন্ত মেরামতের কাজ চলে এবং সেদিন বাসিন্দারা পানি পান। কিন্তু ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ তারা দেখতে পান, পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
পরদিন বাসিন্দারা পুলিশ ও পৌর করপোরেশন কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। তবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি বলে অভিযোগ তাদের। এর পরদিন কলোনির রাস্তাগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বাসিন্দারা জানান, দূষিত নদীর পানি ব্যবহারের কারণে কয়েকটি শিশু জ্বর, মাথাব্যথা ও চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে। ঘাটের কাদাযুক্ত ও পিচ্ছিল সিঁড়িতে পড়ে অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। বয়স্ক ব্যক্তি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তাদেরও গোসলসহ দৈনন্দিন কাজে নদীর পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া মুসল্লিরাও অজু করতে পারছেন না।
রাস্তার বাতি বন্ধ করে দেওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী ইসা খাতুন বলেন, পানির সংকটের কারণে তিনি স্কুলে যেতে পারছেন না। পরীক্ষার সময় এই সংকট শুরু হওয়ায় তার পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমনকি কলোনিতে থাকা স্কুলটিতেও পানির সংযোগ দেওয়া হয়নি।
ইসা আরও বলেন, ‘রাস্তাগুলোর বাতি বন্ধ করে দেওয়া কলোনির নারীদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে।’
জাহানারা বিবি নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘ছোট শিশুদেরও হাত-মুখ ধুতে ঘাটে যেতে হচ্ছে। অনেক শিশু গঙ্গায় পড়ে গেছে, কেউ কেউ অল্পের জন্য ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচেছে। যারা সাঁতার জানে না, তাদেরও বাধ্য হয়ে নদীতে গোসল করতে হচ্ছে।’
৬০ বছর ধরে জ্যোতিনগর কলোনিতে বসবাসকারী সরস্বতী বিশ্বাস জানায়, ‘দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের দরিদ্র মানুষ নানা সমস্যায় একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু এমন সংকট আমাদের জন্য একেবারেই নতুন।’
সে আরও অভিযোগ করেছে, ‘বিজেপি হিন্দু-মুসলিমের রাজনীতি করে শুধু দরিদ্র মানুষকে হয়রানি করছে।’ দীর্ঘদিনের পানির সংকটে বস্তির প্রতিটি বাসিন্দাই সমস্যায় পড়েছেন বলেও জানায় সে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মুসলিমবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করেছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারি। অভিযোগ রয়েছে, সে বলেছিল, যারা তাকে ভোট দেননি, ওই সংখ্যালঘুদের জন্য সে কাজ করবে না।
এর আগে দলের একটি অনুষ্ঠানে এই বস্তির মানুষকে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বলেছিল ঋতেশ তিওয়ারি। সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য সে কাজ করবে না— তার এমন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন তার সেই কথাই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বাসিন্দারা।
বস্তির বাসিন্দারা উচ্ছেদ অভিযান নিয়েও আশঙ্কায় রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী বিজেপি কর্মীরা উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর হকার ও বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের ঘটনা বেড়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সাংবাদিক ও কলাম লেখক অর্ক ভাদুড়ি বলেছে, ‘জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের সঙ্গে যা ঘটছে, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক। এটি সংবিধানবিরোধী। শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে তাদের এমন অকল্পনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
কলকাতার নাগরিক সমাজের সমালোচনা করে সে বলেছে, ‘কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজ এখনো রাস্তায় নামেনি—এটি আমাদের সবার জন্য লজ্জার। এর মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে থাকা ইসলামবিদ্বেষেরই প্রকাশ ঘটছে।’
তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/53f2pde5
2. https://tinyurl.com/bdebpfcs


