
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে জুলাই ও আগস্টে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মাত্র দুই মাসে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের স্থিতি ১৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৮.৭২ শতাংশ। এ সময় ঋণ স্থিতি ছিল ৯৭ হাজার ৭২ কোটি টাকা।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মানবতাবিরোধী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের করার পাশাপাশি ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া হয়। প্রকৃত চিত্র সামনে আসার পর ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে যায়। ৫ আগস্টের আগে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৫ শতাংশ, যা পরে ২৩ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা ছাড় কাজে লাগিয়ে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ কমাতে উদ্যোগ নেয়। তারপর থেকেই খেলাপি ঋণ কমতে শুরু করে। তবে হঠাৎ করে এখন নতুন করে কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হচ্ছে, ফলে আবার খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৩.৫৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে সেটি কিছুটা বেড়ে হয় ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বা ১৪.৮১ শতাংশ। জুলাই অভ্যুত্থানের পরের তিন মাসে এক লাফে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বেড়ে ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ হয় ১৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা বা ১৮.২৯ শতাংশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে তা আরো বেড়ে হয় ১৬ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা বা ১৮.৬১ শতাংশ।
তবে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। তথ্য বলছে, ওই বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ ২,১৮৬ কোটি টাকা বেড়ে স্থিতি হয় ১৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা বা ২১.১১ শতাংশ। পরের তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) তা আরো বেড়ে হয় ১৯ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এর পরের তিন মাসে বেড়ে সেপ্টেম্বর শেষে স্থিতি হয় ২০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা বা ২২.৯৯ শতাংশ।
যদিও ওই বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমতে শুরু করে। ওই প্রান্তিকে ৩,৯৮৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমে স্থিতি দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বা ১৫.৮৬ শতাংশ।
একই চিত্র চলতি বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকেও দেখা যায়। তথ্য বলছে, প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে স্থিতি দাঁড়ায় ১৬ হাজার ২৪২ কোটি টাকা বা ১৭.৮৫ শতাংশ। পরের প্রান্তিকে তা আরো কমে ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকায় নামে। এ সময় খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৮.২৭ শতাংশ। তবে আগস্ট শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি হয় ১৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা বা ১৮.৭২ শতাংশ।
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী গণমাধ্যমে জানায়, ‘খেলাপি ঋণ কমাতে তৎপরতা চালিয়ে গেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তার আলোকে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি এক্সিট সুবিধাও দিয়েছি। এসবের ফলে খেলাপি ঋণ কমার দিকে যাচ্ছিল। তবে ব্যক্তিগত কিছু ঋণ খেলাপি হওয়ায় নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।’
জানা গেছে, গত বছর ব্যাংকটি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ২,০০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠিত ঋণের পরিমাণ ১,৪২৪ কোটি টাকা। এছাড়া মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেডের প্রকল্প ঋণ ৫৫ কোটি এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ ২৮৯ কোটি টাকা পুনর্গঠন করা হয়েছে। তালিকায় আরো আছে জাহানারা কটন টেক্স লিমিটেডের ৮৭ কোটি টাকা, ভার্টেক্স পেপারের ৬৬ কোটি টাকা এবং জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ৮৬ কোটি টাকার পুনর্গঠিত ঋণ।
জানা যায়, শীর্ষ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের থেকে খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারছে না সোনালী ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শীর্ষ খেলাপি থেকে ব্যাংকের আদায় মাত্র ৪১ কোটি টাকা। এ সময় অন্যান্য খেলাপি থেকে আদায় ৯৮০ কোটি টাকা।
ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকায় আছে হলমার্ক, বেক্সিমকো, থারমেক্স, ওরিয়নসহ কয়েকটি গ্রুপ। এসব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণ কমছে না। বর্তমানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখনো প্রায় ১৯ শতাংশে রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১। দুই মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা
– https://tinyurl.com/yureted7

