সাহায্যহীন সাগরে ভাসছে আটকে পড়া শত শত রোহিঙ্গা

0
389
সাহায্যহীন সাগরে ভাসছে আটকে পড়া শত শত রোহিঙ্গা

বঙ্গোপসাগর যেখানে আন্দামান সাগরের সাথে মিশেছে, সেখানে সাগরের নীল জলে কয়েকটি কাঠের নৌকায় ঠাসাঠাসি করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কোথাও না কোথাও ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের সাগরে বেরিয়ে পড়ার পরে ১০ সপ্তাহ চলে গেছে।

তাদের গন্তব্য মালয়েশিয়া তাদেরকে নৌকা ভিড়াতে দেয়নি। যে বাংলাদেশ থেকে রওনা দিয়েছে তারা, সেখানেও তারা ফিরতে পারেনি। যে অধিকার গ্রুপগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের অবস্থানের উপর নজর রাখার চেষ্টা করছিল, তারাও তাদের অবস্থান হারিয়ে ফেলেছে। অন্তত তিনটি নৌকা রওনা দিয়েছিল, যেগুলোতে কয়েকশ রোহিঙ্গা মুসলিম মানব পাচারকারীদের উপর ভরসা করে আশ্রয় খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়েছিল।

“আমার যে ভাই বোনেরা এখনও সাগরে ভাসছে, তাদের অবস্থা চিন্তা করে কান্না পাচ্ছে”, বললেন বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পের একজন প্রধান ইমাম মোহাম্মদ ইউসুফ। প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে আসা প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী এই ক্যাম্পে অবস্থান করছে।

এই নৌকাগুলো কয়েকটি দেশের প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়ে গেছে, জাতিসংঘ যেটাকে বিপজ্জনক ‘পিং-পং খেলা’ বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বলেছে যে, তারা এরই মধ্যে বহু রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বেশি শরণার্থীদের বোঝা তারা বহন করছে।

কিন্তু মালয়েশিয়াও করোনাভাইরাস সংক্রমন ও এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বিদেশীভীতির কারণে তাদেরকে নৌকা ভেড়াতে না দেয়ায় তাদের যাওয়ার আর কোন জায়গা বাকি নেই।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি স্টিফ করলিস বলেছেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভারি বোঝা বহন করছে এবং এই চ্যালেঞ্জ তাদের একার উপর ছেড়ে দেয়া যাবে না। কিন্তু উপায়হীন মানুষদের ফিরিয়ে দেয়াটা কোন উত্তর হতে পারে না”।

এ ধরণের প্রত্যাখ্যানের ফল কি হতে পারে, সেটা ১৫ এপ্রিল স্পষ্ট হয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি নৌকাকে উদ্ধার করে বাংলাদেশের কোস্ট গার্ড। নৌকা থেকে প্রায় ৪০০ অপুষ্টিতে ভোগা পানিশূন্যতায় শুকিয়ে আসা মানুষকে উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে অনেকেই শিশু।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা – যারা শরণার্থীদের অবস্থা পর্যালোচনা করে, তারা বলতে পারেনি যে, কতজন রোহিঙ্গা এই সফরে মারা গেছে। তারা শুধু বলেছে, “অনেকেই মারা গেছে এবং তাদেরকে নৌকা থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে”। সংস্থাটি জানিয়েছে, এদের মধ্যে একটা বড় সংখ্যা মানব পাচারকারীদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ওই সফর থেকে যারা বেঁচে ফিরেছে তাদেরকে এখন বাংলাদেশের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে করোনাভাইরাস সতর্কতার জন্য কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পের ইমাম ইউসুফ বললেন যে, তিনি এবং অন্যান্য ইমামরা বিভিন্ন পরিবারকে সাগরের সফরের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বার বার সতর্ক করেছেন।

কিন্তু শরণার্থী ক্যাম্পে যে হতাশ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে, সেই অবস্থার কারণে শরণার্থীরা নিজেদের জীবনকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

ইউসুফ বলেন, “শাস্তি দেয়া উচিত এই মানব পাচারকারীদেরকে, এই নিরপরাধ রোহিঙ্গাদেরকে নয়”।

২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এক শরণার্থী বলেন, যদি সামর্থ থাকতো, তাহলে ছেলেদেরকে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দিতেন তিনি। তার জন্য আরেকটি অভিশাপ হলো একবার এ ধরণের এক ব্যার্থ নৌ যাত্রার জন্য অর্থ দিয়ে সবকিছু খুইয়েছেন তিনি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী ক্যাম্প কুতুপালংয়ে বাস করছেন সিরাজুল মুস্তাফা। তিনি বলেন, “মানুষ সবসময় নিরাপদ ও উন্নত জীবন খোঁজে। মধ্যসত্বভোগীরা তাদেরকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। এরা কোন পরিণতি না জেনেই ঝুঁকি নিচ্ছে”।

কুতুপালংয়ের বাঁশের ঘর থেকে মোহাম্মদ নুর রোহিঙ্গাদের অবস্থাটা এক কথায় বর্ণনা করলেন।

“আগেও বড় কোন আশা ছিল না। কিন্তু এখন কিছুই নেই”।

সূত্র:নিউ ইয়র্ক টাইমস

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন