পাকিস্তানে মুরতাদ সেনাদের সমালোচক সাংবাদিক মাতিউল্লাহকে অপহরণ

0
767
পাকিস্তানে মুরতাদ সেনাদের সমালোচক সাংবাদিক মাতিউল্লাহকে অপহরণ

পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক মাতিউল্লাহ জান কোথায় আছেন সে বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করতে দেশটির কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ। দেশটির মুরতাদ সেনাবাহিনীর সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই সাংবাদিক মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে ইসলামাবাদ থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। পুলিশ বলছে, সকালে সরকারি স্কুলশিক্ষক স্ত্রীকে কর্মস্থলে পৌঁছে দেওয়ার পর থেকে এই সাংবাদিকের কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন এই সাংবাদিক অপহরণ করা হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত কয়েক বছর ধরেই পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারি ও সেনাবাহিনীর সেন্সরশিপ বাড়ছে বলে অভিযোগ করে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ। সাংবাদিক হয়রানি ও নিপীড়ন বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ)-এর ২০২০ সালের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তান ১৪৫তম স্থান পায়। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)-এর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল থেকে পাকিস্তানে ৬১ জন সাংবাদিক নিজেদের কাজের কারণে হত্যার শিকার হয়েছেন।

পাকিস্তানি সাংবাদিক মাতিউল্লাহ জানের স্ত্রী কানিজ সুগরা (৪২) জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল দশটার দিকে তাকে স্কুলে পৌঁছে দেন তার স্বামী। তিন ঘণ্টা পর তাকে আবারও স্কুল থেকে তুলে নেওয়ার কথা ছিল তার। কানিজ জানান, করোনা মহামারির কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় কোনও ছাত্রছাত্রী ছিল না। তবে প্রশাসনিক কিছু কাজ থাকায় তাকে স্কুলে আসতে হয়। স্কুলে পৌঁছানোর ঘণ্টাখানেক পর গেটের বাইরে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানান কানিজ। তবে সে সময় তিনি স্বামীর কণ্ঠ শোনেননি বলে জানান।

কানিজ সুগরা বলেন, ‘বাইরে কিছু একটা হচ্ছে তা টের পাচ্ছিলাম। তবে আমার স্বামীর কণ্ঠ শুনিনি। চার-পাঁচ সেকেন্ড একটু শব্দ হলো। পরে দুপুর একটা পনেরো মিনিটের দিকে তাকে ফোন করে কোনও সাড়া পাইনি।’ স্কুল থেকে বের হয়ে নিজেদের গাড়িটি মাতিউল্লাহ জান যেখানে ছেড়ে গিয়েছিলেন সেখানেই দেখতে পাওয়ার কথা জানান কানিজ। তিনি বলেন, ‘গাড়ির দরজা খোলা আর চাবি ভেতরে রাখা ছিল। গাড়ির অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে তাকে জোরপূর্বক বের করা হয়েছে।’

রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক মাতিউল্লাহ জান ২০১৮ সালে পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল ওয়াক্ত নিউজের টকশো পরিচালনার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তারপর থেকে তিনি ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকারের সমালোচক হয়ে ওঠেন। এছাড়া সেনাবাহিনীর সমালোচনাও করে থাকেন তিনি। ঊর্ধ্বতন সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ব্যঙ্গ করে তিনি প্রায়ই ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ করে থাকেন। বিচার বিভাগের সমালোচনা করে দেওয়া এক টুইট বার্তার জেরে গত সপ্তাহে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করেছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট।

মাতিউল্লাহ জান নিখোঁজের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকতার কারণে হয়রানি ও শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন মাতিউল্লাহ জান। কর্তৃপক্ষকে অনতিবিলম্বে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। এদিকে এই সাংবাদিক নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে তাকে দ্রুত নিরাপদে ফেরত আনার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন (এইচআরসিপি)। কমিশনের চেয়ারপারসন মেহেদি হাসান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পাকিস্তানের জনগণের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সাহসিকতার সঙ্গে শামিল হয়েছেন মাতিউল্লাহ জান।’ তাকে অপহরণ করা কাপুরুষতা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন