মুহাররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

3
1598
মুহাররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِى كِتٰبِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَآ أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ ۚ وَقٰتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَآفَّةً كَمَا يُقٰتِلُونَكُمْ كَآفَّةً ۚ وَاعْلَمُوٓا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন। (সূরা তওবা ৯:৩৬)
বিদায় হজের সময় মিনায় প্রদত্ত খুতবায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্মানিত মাসগুলোর বর্ণনা দিয়ে বলেন: তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক – জিলকদ, জিলহজ ও মহররম, অপরটি হলো রজব। (মুসলিম)
হাদিস শরিফে মহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে ‘অতি সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ চার মাস’ বলতে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব—এই চার মাসকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাজহারি)।

উল্লেখিত আয়াত হতে প্রমাণিত হয়, মুহাররম মাসটি ফজিলত ও বরকতওয়ালা মাস সমূহের অন্যতম।

এই সম্মানিত মাসে পূর্ববর্তী নবীদের যুগে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত হারাম ছিল। মহান আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামীন বলেন فَلا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ  অর্থাৎ“তোমরা এতে নিজেদের উপর কোনো যুলুম করো না” এই সম্মানিত মাস সমূহে তোমরা কোনো অন্যায় করো না। কারণ এ সময়ে সংঘটিত অন্যায় ও অপরাধের পাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি ও মারাত্মক।

‍মুহাররমের প্রথম দশকে যাবতীয় ইবাদত যথা নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, দান-খয়রাত ইত্যাদির সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষত এ মাসে রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘রমজানের রোজার পর শ্রেষ্ঠ রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।’ (মুসলিম) মুহাররমের দশম দিবস (আশুরা) অতি পুণ্যময় ও মহিমান্বিত দিন। এদিন রোজা রাখার ফজিলত ও তাকিদ অন্য দিনের চেয়ে বেশি। এটা মহানবী (সা.) এর সুন্নাত।

মুহাররম মাসের সম্মানের ব্যপারে প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ’র মাস মুহাররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা, যে ব্যক্তি মুহাররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত দান করে সম্মানিত করবেন আল্লাহ তা’আলা।’ (মুসলিম, ইবনে মাজা)

أَفْضَلُ الصِّيَامِ، بَعْدَ رَمَضَانَ، شَهْرُ اللهِ الْمُحَرّمُ، وَأَفْضَلُ الصَلَاةِ، بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللَّيْلِ.
হাদিস শরিফে মুহাররম মাসের রোজাকে রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হল আল্লাহর মাসের রোজা, যে মাসকে তোমরা মুহাররম নামে চেন। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হল রাতের নামাজ। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩)
‘মুজামুস সাহাবা’ কিতাবে সহীহ সনদে নতুন মাস ও নতুন বছরের শুরুতে পড়ার একটি দুআ উল্লেখ করেছেন। সাহাবী আবদুল্লাহ বিন হিশাম রা. বলেন-
كان أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم يتعلمون هذا الدعاء كما يتعلمون القرآن إذا دخل الشهر أو السنة
অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম নতুন মাস বা নতুন বছর শুরুর এ দুআটি তেমন গুরুত্ব দিয়ে শিখতেন, যেভাবে কুরআনুল কারীম শিখতেন। দুআটি হল-
اللّهُمَّ أَدْخِلْهُ عَلَيْنَا بِالأَمْنِ وَالِإيْمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالإِسْلَامِ وَجِوَارٍ مِنَ الشَّيطَانِ وَرِضوَانٍ مِنَ الرَّحْمنِ.
(قال الحافظ ابن حجر في الإصابة : وهذا موقوف على شرط الصحيح.)
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মাঝে এ মাস/বছরের আগমন ঘটান- শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ঈমান ও ইসলামের (উপর অবিচলতার) সাথে; শয়তান থেকে সুরক্ষা ও দয়াময় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির সাথে। -মুজামুস সাহাবাহ খ. ৩, পৃ. ৫৪৩

আশুরার ফজিলত:
আশুরার দিন রোজা রাখা সুন্নাত। আশুরার রোজা সব নবীর আমলেই ছিল। নবী করিম (সা.) মক্কায় থাকতেও আশুরার রোজা পালন করতেন। হিজরতের পর মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখতে পেলেন, ইহুদিরাও এই দিনে রোজা রাখছে। প্রিয় নবী (সা.) তাদের রোজার কারণ জানতে পারলেন, এদিনে মুসা (আ.) সিনাই পাহাড়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত লাভ করেন। এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কয়েদখানা থেকে উদ্ধার করেন এবং এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলদের নিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করেন। আর ফেরাউন সেই সাগরে ডুবে মারা যায়। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ইহুদিরা এই দিন রোজা রাখে।
মহানবী (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ। অতঃপর তিনি মহররমের ৯-১০ অথবা ১০-১১ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে বললেন, যাতে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়। দ্বিতীয় হিজরিতে রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হলে আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। তবে রমজানের রোজা রাখার পর আশুরার রোজা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এ মাসের নফল রোজা ও অন্যান্য ইবাদত রমজান মাস ব্যতীত অন্য যেকোনো মাস অপেক্ষা অধিক উত্তম। (মুসলিম ও আবুদাউদ)।
হজরত কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী আল্লাহ তাআলা এর অছিলায় অতীতের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি ও মুসনাদে আহমাদ)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রমজানের রোজার পর মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ, যেমন ফরজ নামাজের পর শেষ রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন।
উম্মুল মুমিনিন হজরত হাফসা (রা.) বলেন, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারটি কাজ কখনো পরিত্যাগ করেননি। আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, আইয়ামে বিদের রোজা তথা প্রতি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোজা এবং ফজর ওয়াক্তে ফরজের আগে দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি করবে, ভালো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করবে; আল্লাহ সারা বছর তার প্রাচুর্য বাড়িয়ে দেবেন।’ হজরত সুফিয়ান ছাওরি তাবিয়ি (রহ.) বলেন, ‘আমরা এটি পরীক্ষা করেছি এবং যথার্থতা পেয়েছি।’ (মিশকাত: ১৭০; ফয়জুল কালাম: ৫০১, পৃষ্ঠা ৩৪৯; বায়হাকি ও রাজিন)।

‍মুহাররম মাস সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন এই মাসে বিয়েশাদি না করা, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ না করা, কোনো শুভ কাজ বা ভালো কাজের সূচনা না করা, গোশত না খাওয়া ও নিরামিষ আহার করা, পান না খাওয়া, নতুন কাপড় ও সুন্দর পোশাক পরিধান না করা, সাদা কাপড় বা কালো কাপড় তথা শোকের পোশাক পরা, সব ধরনের আনন্দ উৎসব পরিহার করা ইত্যাদি। এসবই কুসংস্কার। কোরআন ও হাদিসে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। ইবাদত ও ইসলামি পর্বসমূহ কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে পালন করা বিধেয়, দলিল–প্রমাণহীন আমলে সুফল আশা করা যায় না। বরং এতে বহুবিধ ক্ষতির আশঙ্কা বিদ্যমান রয়েছে।

মুহাররমের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়
মুহাররমের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফযীলত হল, এর সঙ্গে তাওবা কবুলের ইতিহাস যুক্ত। মুসনাদে আহমাদ ও জামে তিরমিযীতে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে- এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞেস করল,
يَا رَسُولَ اللهِ، أَيّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ رَمَضَانَ؟
আল্লাহর রাসূল! রমযানের পর আপনি আমাকে কোন্ মাসে রোযা রাখার নির্দেশ দেন? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
إِنْ كُنْتَ صَائِمًا بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ فَصُم المُحَرّمَ، فَإِنّهُ شَهْرُ اللهِ، فِيهِ يَوْمٌ تَابَ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ، وَيَتُوبُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ آخَرِينَ.
তুমি যদি রমযানের পর আরও কোনো মাসে রোযা রাখতে চাও তাহলে মুহাররমে রোযা রাখ। কেননা সেটি আল্লাহর মাস। এই মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা অনেকের তাওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও সেদিন আরও মানুষের তাওবা কবুল করবেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৫১ (ইমাম তিরমিযী বলেন- هذا حديث حسن غريب ); মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৩২২, খ. ১ পৃ. ১৫৪
এই হাদীসে যেই দিনের দিকে ইশারা করা হয়েছে খুব সম্ভব সেটি আশুরার দিন। তবে বান্দার উচিত বছরের সব দিনেই তাওবা ইসতিগফারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে এই মাসের প্রতিটি দিনেই তাওবা ইসতিগফারের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া। আর আশুরার দিন অনেক বেশি ইসতিগফার করবে।
ইসতিগফারের জন্য সবচে’ উত্তম হল কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত ইসতিগফার বিষয়ক দুআগুলো বুঝে বুঝে মুখস্থ করবে। সেই দুআগুলোর মাধ্যমে রাব্বে কারীমের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তবে নিজের ভাষায় নিজের মতো করে ইসতিগফার করলেও ঠিক আছে। কারণ আল্লাহ সকল ভাষারই স্রষ্টা। তিনি সবার কথা বুঝেন। সকলের আরজি কবুল করেন।
ইসতিগফারের কয়েকটি দুআ এখানে উল্লেখ করা হল-
১.
رَبَّنَا ظَلَمْنَاۤ اَنْفُسَنَا، وَ اِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَ تَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْن
হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন ও আমাদের প্রতি রহম না করেন তাহলে অবশ্যই আমরা অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। -সূরা আরাফ (৭) : ২৩
২.
وَ اِلَّا تَغْفِرْ لِیْ وَ تَرْحَمْنِیْۤ اَكُنْ مِّنَ الْخٰسِرِیْنَ.
(হে আমার প্রতিপালক!) আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন ও আমার প্রতি দয়া না করেন তাহলে আমিও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। -সূরা হুদ (১১) : ৪৭
৩.
رَبِّ اِنِّیْ ظَلَمْتُ نَفْسِیْ فَاغْفِرْ لِیْ
হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। -সূরা কাসাস (২৮) : ১৬
৪.
لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ ، اِنِّیْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِیْنَ.
হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী। -সূরা আম্বিয়া (২১) : ৮৭
৫.
رَبَّنَا اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِلْمُؤْمِنِیْنَ یَوْمَ یَقُوْمُ الْحِسَابُ .
হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা মাতা ও সকল ঈমানদারকে ক্ষমা করুন। -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৪১
৬.
رَبِّ اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِمَنْ دَخَلَ بَیْتِیَ مُؤْمِنًا وَّ لِلْمُؤْمِنِیْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ.
হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার পিতা-মাতাকেও এবং প্রত্যেক এমন ব্যক্তিকেও, যে মুমিন অবস্থায় আমার ঘরে প্রবেশ করেছে আর সমস্ত মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকেও। -সূরা নূহ (৭১) : ২৮
৭.
رَبِّ اغْفِرْ وَ ارْحَمْ وَ اَنْتَ خَیْرُ الرّٰحِمِیْنَ .
হে আমার প্রতিপালক! আমার ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। আপনি তো দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১১৮
৮.
رَبَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَ ارْحَمْنَا وَ اَنْتَ خَیْرُ الرّٰحِمِیْنَ.
হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনি দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১০
৯.
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ كَفِّرْ عَنَّا سَیِّاٰتِنَا وَ تَوَفَّنَا مَعَ الْاَبْرَارِ، رَبَّنَا وَ اٰتِنَا مَا وَعَدْتَّنَا عَلٰی رُسُلِكَ وَ لَا تُخْزِنَا یَوْمَ الْقِیٰمَةِ ، اِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِیْعَادَ.
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের মন্দসমূহ মিটিয়ে দিন এবং আমাদেরকে পুণ্যবানদের মধ্যে শামিল করে নিজের কাছে তুলে নিন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে সেই সবকিছু দান করুন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি নিজ রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে দিয়েছেন। আমাদেরকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি কখনও প্রতিশ্রুতির বিপরীত করেন না। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৯৩-১৯৪
১০.
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَاۤ اِنْ نَّسِیْنَاۤ اَوْ اَخْطَاْنَا، رَبَّنَا وَ لَا تَحْمِلْ عَلَیْنَاۤ اِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهٗ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِنَا، رَبَّنَا وَ لَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهٖ، وَ اعْفُ عَنَّا، وَ اغْفِرْ لَنَا، وَ ارْحَمْنَا، اَنْتَ مَوْلٰىنَا فَانْصُرْنَا عَلَی الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ.
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনো ভুল-ত্রæটি হয়ে যায়, সেজন্য আমাদের পাকড়াও করবেন না।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করবেন না, যেমন অর্পণ করেছিলেন আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন ভার চাপিয়ে দিবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।
আপনি আমাদের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। -সূরা বাকারা (২) : ২৮৬
১১.
رَبَّنَاۤ اِنَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ قِنَا عَذَابَ النَّارِ.
হে আমাদের রব! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬
১২.
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ اِسْرَافَنَا فِیْۤ اَمْرِنَا، وَ ثَبِّتْ اَقْدَامَنَا وَ انْصُرْنَا عَلَی الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ.
হে আমাদের রব! আমাদের গোনাহসমূহ এবং আমাদের দ্বারা আমাদের কার্যাবলিতে যে সীমালঙ্ঘন ঘটে গেছে তা ক্ষমা করে দিন। আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে বিজয় দান করুন। -সূরা আলেইমরান (৩) : ১৪৭
১৩.
اللهُمّ أَنْتَ الْمَلِكُ، لَا إِلهَ إِلّا أَنْتَ، أَنْتَ رَبِّي، وَأَنَا عَبْدُكَ، ظَلَمْتُ نَفْسِي، وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي جَمِيعًا، إِنّهُ لَا يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ.
হে আল্লাহ! আপনিই মালিক। আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি আমার প্রতিপালক। আমি আপনার বান্দা। আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি। আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি। সুতরাং আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া পাপ ক্ষমাকারী কেউ নেই। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৭১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৭৬০
১৪.
اللّهُمّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِيْ إِنّكَ أَنْتَ الغَفُورُ الرّحِيمُ.
হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি। আপনি ছাড়া আমার পাপরাশি ক্ষমা করার কেউ নেই। আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূর্ণ মাগফিরাত নসীব করুন। আর আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, চিরদয়াময়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৩৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৫
১৫.
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الّذِي لَا إِلهَ إِلّا هُوَ الْحَيّ الْقَيّوم، وَأَتُوبُ إِلَيْهِ.
আমি ওই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। যিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক। আমি তার কাছে তাওবা করছি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৭, জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৮৯৪
১৬.
رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيّ، إِنّكَ أَنْتَ التّوّابُ الرّحِيمُ.
হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তাওবা কবুলকারী, চিরদয়াময়। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৭২৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৬
১৭.
اللّهُمّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلهَ إِلّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنّهُ لاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ.
হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার ও আপনার প্রতিশ্রতির উপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। আমার প্রতি আপনার নিআমতের কথা স্বীকার করছি। আপনার কাছে আমি আমার গোনাহের কথা স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া কেউ গোনাহ ক্ষমা করতে পারে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০
১৮.
أَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّيْ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وّأَتُوْبُ إِلَيْهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوّةَ إِلّا بِاللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيْمِ.
আমি আমার প্রতিপালক আল্লাহর কাছে সকল গোনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছে তাওবা করছি। সুমহান আল্লাহ ছাড়া আমাদের কোনো সাধ্য নেই, শক্তি নেই। [আল্লাহর কোনো বুযুর্গ বান্দার শেখানো ইসতিগফারের বাক্য। যার অর্থ ঠিক আছে।]
এই মাসে আশুরার দিন রয়েছে, যে দিনের রোযা এক বছরের গুনাহের কাফফারা।এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আশুরার রোজা সামনের এবং পিছনের একবছরের গুনাহের কাফ্ফারা।(সহিহ মুসলিম: ১১৬২, রোজা – সুনান আল-তিরমিযী: ২৫২)
তাই মহররম মাসের গুরুত্ব অনুধাবন করে, দৃঢ়তার সাথে আমল করলে, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আমাদের আগের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। তাই আমাদের বেশি বেশি নফল রোজা, নফল নামাজ ও তাসবিহ-তাহলিল পাঠ করতে হবে।
এই মাসের বিশেষ কিছু আমল:
(১)এ মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা:
(২) মুহাররম মাসে গুনাহ থেকে বিরত থাকা:
(৩)এ মাসে বেশি বেশি তওবা, ক্ষমা প্রার্থনা করা:

মুহাররম মাসে কিছু বর্জনীয়:
মুহাররম মাস আসলেই এক শ্রেনীর লোকেরা না বুঝে ইয়াযিদকে গালিগালাজ করে থাকে আর হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যু শোকে শোক গাঁথা রচনা করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকে। মুহাররমের তাজিয়া, নিশানা, মার্সিয়া, বাদ্য, আত্মপ্রহার দ্বারা শোক পালন এবং অন্যান্য সমারোহ ও এ সবের মধ্যে মাতম করা জাহেলিয়াতের প্রথা ছাড়া আর কিছুই না। হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য ঐ দিনে অথবা আর কারো জন্য অন্য কোন দিনে শোক পালন ও মৃত্যু দিবস পালন করা বিদআত। আশুরার দিনকে শিয়া সম্প্রদায় শোক পালনের দিন রূপে গ্রহণ করে আহাজারী, কান্নকাটি এমনকি মুহাররমের প্রথম দিন হতে হাত দ্বারা বুক চাপড়িয়ে, লোহা, ছুরি বা অন্য কিছু দ্বারা পিঠে আঘাত করে রক্ত প্রবাহিত ইত্যাদি করে থাকে। অপর দিকে ঐ দিনকে নাসেবী সম্প্রদায় যারা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর বংশধরের প্রতি বিদ্বেষ রাখে তারা ঈদ বা খুশীর দিন রূপে গ্রহণ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন; আলোক সজ্জা, খাওয়া দাওয়া, পটকা বাজি ইত্যাদি করে থাকে।

আসুন আমরা মুহাররমের ফজিলত জেনে আমল করি এবং বিদয়াত থেকে বেঁচে থাকি। হে আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন।

3 মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন