
দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে মূর্তি ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা, চুরি ও সংঘাত-সহিংসতার ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছিল বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। তবে এসব ঘটনার মাঠপর্যায়ের তদন্ত ও যাচাই শেষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টে এইসব তথ্য জানানো হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি হামলা, মূর্তি ভাঙচুর ও সংঘাত-সহিংসতা ঘটেছে বলে দাবি করেছিল।
অভিযোগগুলোর তদন্তে অধিকাংশ ঘটনার পেছনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সরকারি বরাদ্দের অর্থ বণ্টন নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত বিরোধ, চুরি এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের মতো কারণ উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা কিংবা দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনে বাধা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পুলিশের পোস্টে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে।
১। গত ১৬ অক্টোবর নারায়ণঞ্জের আড়াইহাজার থানাধীন দুর্গাপূজা মণ্ডপ কেন্দ্র নং-১৯, ‘‘রামচন্দ্রদী মধ্য মনিপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপ’’ (অস্থায়ী মণ্ডপ) এর মূর্তি গাড়ি হতে নামিয়ে পূজা মণ্ডপে স্থাপনের জন্য নেওয়ার সময় অসুরের ডান হাত সামান্য ভেঙে যায়। অসাবধানতাবশতঃ ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। উক্ত পূজা মণ্ডপের সভাপতি শ্রী মোহন বাশি দাস এবং সাধারণ সম্পাদক শ্রী রাজিব চন্দ্র দাস প্রতিমা গাড়ি হতে নামিয়ে পূজা মণ্ডপে স্থাপনের জন্য নেওয়ার সময় সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
২। গত ৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানাধীন ঋষিপাড়া এলাকায় সুপারি পাড়াকে কেন্দ্র করে পল্লব দাসের পরিবারের সাথে প্রতিবেশী জীবন ঋষির পরিবারের কথা-কাটাকাটি হয়। উক্ত ঘটনার জেরে সন্ধায় জীবন ঋষি, তার ছেলে জয়ন্ত ও ভাগ্নে রায়মোহন প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে মারলে ময়না রানী দাস (৫৮) আহত হয় এবং ঢিলের আঘাতে মণ্ডপের সামনে রং করার জন্য রাখা গণেশ মূর্তির কিছু অংশ ভেঙে যায়। উক্ত পূজা মণ্ডপের সভাপতি জনাব নৃপেন্দ্র দাস এবং সাধারণ সম্পাদক জনাব পরিমল চন্দ্র দাস জানায়, দুই পরিবারের পূর্ব বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে।
৩। গত ১৫ অক্টোবর পাবনা জেলার সুজানগর থানাধীন ভায়না এলাকায় মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাধানগর সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পূজামণ্ডপের শামিয়ানা একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ছিঁড়ে ফেলে। এ ঘটনায় মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে পুলিশকে অবহিত করা হলে সুজানগর থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে উক্ত মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে হেফাজতে নেয়। স্থানীয়দের তথ্যমতে মহিলাটি ঘটনার পূর্বে ৪-৫ দিন ধরে ওই এলাকায় অবস্থান করেছিল। উক্ত মণ্ডপের সভাপতি সমীর কুমার সরকার এবং সাধারণ সম্পাদক মিলন কুমার সরকার মহিলাটির মানসিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
৪। গত ১ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও জেলার ভুল্লী থানাধীন ভাতগাঁও এলাকায় শ্রী শ্রী রসিক রায় জিঁউ ইসকন মন্দিরে প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে সনাতন সম্প্রদায়ের ৭০-৮০ জন লোক লাঠিসোটা নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে। এসময় তারা মন্দিরে অবস্থানরত ইসকন সম্প্রদায়ের ৪-৫ জনকে মারধর ও মালামাল ভাঙচুর করে মন্দির থেকে বের করে দিয়ে ইসকন সম্প্রদায়ের মূর্তি সরিয়ে নিজেদের মূর্তি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইসকন সম্প্রদায়ের ১০০-১২০ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাধা প্রদান করলে উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে ইসকন মন্দিরের পুরাতন মূর্তি সরিয়ে নতুন করে তৈরিকৃত মূর্তি প্রতিস্থাপন করা হয়। উক্ত এলাকার পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শ্রী মনোরঞ্জন সিংহ জানান, ঘটনাটি মূলত হিন্দুধর্মের ইসকন সম্প্রদায় এবং সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের জের ধরে সংগঠিত হয়।
৫। গত ২ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী থানাধীন কাশিডাঙ্গী বৈরাগীপাড়া এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত কৃষ্ণ মন্দির ও কালী মন্দিরের দুই পক্ষের মধ্যে সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়ে বিরোধের জেরে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি ও মারামারি সংঘটিত হয়। জানা যায়, কৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি কৈলাস মোহন্ত (৪৫) ও কালী মন্দিরের সভাপতি সুধীর মোহন্ত (৪৮) নিজ নিজ মন্দিরের উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ, ঠাকুরগাঁও বরাবর আর্থিক অনুদানের আবেদন করে। কৃষ্ণ মন্দিরের নামে ০১ লক্ষ টাকা সরকারি বরাদ্দ এসেছে জানতে পেরে উভয়পক্ষ উক্ত টাকা নিজেদের আবেদনের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে দাবি করায় বিরোধের সূত্রপাত হয়।
৬। গত ৪ অক্টোবর টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার থানাধীন নলখী পাড়া এলাকায় পূর্ণচন্দ্র নাট মন্দিরের নবগঠিত অস্থায়ী কমিটির আয়োজনে সার্বজনীন দুর্গা উৎসব ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে প্রতিমা স্থাপনের স্থান নির্ধারণ (মন্দিরের ভিতরে না বাহিরে) সংক্রান্ত আলোচনা হয়। আলোচনায় প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে সভাপতি জনাব জয়রথ পাল ও সাধারণ সম্পাদক জনাব দুলাল চন্দ্র পাল পক্ষদ্বয়ের লোকজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পালের লোকজন প্রতিমা মন্দিরের ভিতরে স্থাপন করে সার্বজনীন রাঁধা গোবিন্দ নাট মন্দিরের নামকরণ করে একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়। দেলদুয়ার থানা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শ্রী রঘুনাথ বসাক এর সাথে যোগাযোগ করা হলে সে জানায়, ঘটনার পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং পূজা চলাকালীন কোন ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না মর্মে সকলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রকৃতপক্ষে দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে সংঘটিত হামলা, মূর্তি ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ, অধিকাংশ ঘটনায় আসামি গ্রেফতার, চোরাই মালামাল উদ্ধার এবং বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১। পূজা নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের বিবৃতি
– https://tinyurl.com/bdh4w663


