
উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে আরএসএস’র সাবেক একজন পূর্ণকালীন প্রচারক যশবন্ত সাহদেব শিন্দে। সে একটি লিখিত বার্তার মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং কর্ণাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গের কাছে তার দাবিসমূহ উপস্থাপন করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে পাঠানো ওই চিঠিতে শিন্দে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত, সংগঠনের নেতা ইন্দ্রেশ কুমার এবং ভিএইচপি এর সাধারণ সম্পাদক মিলিন্দ পরান্দেকে গ্রেপ্তার ও তদন্তের দাবি তুলেছে। তার অভিযোগ, ২০০০ এর দশকে (২০০০-২০০৯) ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় হিন্দুত্ববাদী এই নেতারা জড়িত রয়েছে।
বোমা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ
শিন্দে ১৯৯০ সাল থেকে পূর্ণকালীন আরএসএস কর্মী হিসেবে কাজ করেছে। পরবর্তীতে সে সংগঠন ছেড়ে দেয়। তার অভিযোগ, তাকে বোমা প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত একটি টিমে কাজ করতে বলা হয়েছিল, একারণেই সে এই সন্ত্রাসী সংগঠন থেকে সরে এসেছে। হিন্দুত্ববাদীদের বোমা হামলার পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদের ওপর হামলায় দায় চাপিয়ে দেওয়া এবং দেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তৈরি করা।
২০২২ সালের আগস্টে মহারাষ্ট্রের নান্দেড়ে একটি বিশেষ CBI (কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা) আদালতে দাখিল করা হলফনামায় শিন্দে দাবি করেছে, আরএসএস ও ভিএইচপি এর কয়েকজন সদস্যের সাথে সে এমন বৈঠকেও অংশ নিয়েছিল, যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সিরিজ বোমা হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সে আরও জানায়, ২০০৩ সালে ভিএইচপি’র নেতা মিলিন্দ পরান্দের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০ জনের সাথে তাকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
তার দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত নান্দেড় বিস্ফোরণের পেছনে মূল রহস্য আরও সুস্পষ্ট হয়। ঐ বিস্ফোরণটি ঘটেছিল একজন আরএসএস কর্মীর বাড়িতে, বিস্ফোরণে আরএসএস কর্মীর ছেলে ও একজন ভিএইচপি কর্মী নিহত হয়। CBI এর তদন্তে উঠে আসে, উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আওরঙ্গাবাদের একটি মসজিদে হামলার উদ্দেশ্যে ঐ বাড়িতে বোমা তৈরির কাজ করছিল, কিন্তু ভুলবশত তা বোমা তৈরির বাড়িতেই বিস্ফোরিত হয়।
বিজেপি’র সাথে যোগসাজশের অভিযোগ
শিন্দের দাবি, ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে BJP-এর কাছ থেকে একটি চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিল ভিএইচপি নেতা মিলিন্দ পরান্দে, চুক্তিতে ভারতজুড়ে বোমা হামলার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে উক্ত পরিকল্পনায় সম্মতি দিলে ভারতে শত শত বোমা হামলা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
শিন্দে আরও অভিযোগ করেছে, ২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে জলনা, পূর্ণা ও পারভানিতে মসজিদকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছিল। এসব হামলার দায় মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ সৃষ্টি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
এছাড়া পুনেতে তিন থেকে চার দিনব্যাপী একটি বোমা তৈরির কর্মশালায় অংশ নেওয়ার কথাও জানায় সে। ওই কর্মশালার আয়োজক ছিল রাকেশ ধাওড়ে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় ধাওড়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেয় হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন।
‘মিথুন চক্রবর্তী’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ওই কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, যার প্রকৃত নাম ছিল রবি দেব। সে তখন বজরং দলের একজন সমন্বয়কারী ছিল।
প্রশাসনের মদদে মামলাসমূহে হিন্দুত্ববাদীদের খালাস
শিন্দের অভিযোগে নান্দেড়, মালেগাঁও এবং সমঝোতা এক্সপ্রেস বিস্ফোরণ মামলার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এসব মামলায় বিভিন্ন সময়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একাধিক মামলায় অভিযুক্তরা খালাস পেয়েছে।
শিন্দের সর্বশেষ চিঠিতে আরএসএস নেতা ইন্দ্রেশ কুমারের সাথে আজমীর শরিফ দরগাহ বিস্ফোরণের যোগসূত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া ২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় সাবেক বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর ও কর্নেল প্রসাদ পুরোহিতের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই মামলায় শেষ পর্যন্ত দুজনকেই খালাস দেওয়া হয়েছে।
অমিত শাহ ও প্রিয়াঙ্ক খাড়গেকে পাঠানো সর্বশেষ চিঠিতে শিন্দে তার পূর্বের অভিযোগগুলো পুনরায় তুলে ধরেছে। সে অভিযোগগুলো অনতিবিলম্বে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছে।
তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/33rcrpbw


