প্রায় দুই দশকের দখলদারিত্বের পর হারাকাতুশ শাবাব প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে নতি স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিয়া ছাড়তে শুরু করেছে উগান্ডান বাহিনী

0
251

প্রায় দুই দশক সময় পর সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত দুই শহর বারাভে ও শালানবোদ থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে উগান্ডা।

শহর দুটির নিরাপত্তার দায়িত্ব মোগাদিশু প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে উগান্ডান বাহিনী এখান থেকে সরে গেছে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে উগান্ডার দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক উপস্থিতির অবসান হলো। উগান্ডা ঘোষণা করেছে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সোমালিয়া থেকে তাদের সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন করা হবে। উগান্ডার সেনারা ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি এলাকা থেকে সরে এসে প্রথমে রাজধানীর ৬০ নম্বর এলাকায় অবস্থান নেবে এবং সেখান থেকে মোগাদিশু হয়ে পুরোপুরি সরে যাবে। আর সেনা প্রত্যাহারের এই ধারাবাহিকতায় প্রথম দলটি যাদের সংখ্যা ১৯০ পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়েছে, তারা রাজধানী মোগাদিশু হয়ে কেনিয়ার একটি বিমানযোগে উগান্ডায় ফিরে গেছে।

সোমালিয়া থেকে উগান্ডান বাহিনীর এই প্রত্যাহার এমন এক সময় শুরু হয়েছে, যখন মোগাদিশু প্রশাসনের রাষ্ট্রপতি হাসান শেখ গত ২৬ অক্টোবর উগান্ডা সফর করে। এসময় হাসান শেখ স্টেট হাউসে উগান্ডার রাষ্ট্রপতি ইয়োয়েরি মুসেভেনির সাথে দেখা করে এবং সেনা প্রত্যাহার না করার বিষয়ে আলোচনা করে। কিন্তু প্রতিরোধ বাহিনী হারাকাতুশ শাবাবের আক্রমণে দীর্ঘ এই যুদ্ধের ক্ষয় বহন করতে অক্ষম উগান্ডা প্রশাসন হাসান শেখের আবেদন খারিজ করে দেয়।

দুটি শহরের সামরিক ঘাঁটিগুলো হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে লোয়ার শাবেলি অঞ্চলের জন্য এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলে আশ-শাবাব মুজাহিদিন একটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে এবং মোগাদিশু সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর জন্য হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।

শহর দুটির গুরুত্ব ও নিরাপত্তা

বারাভে শহরটি হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকূলীয় শহর ও বন্দর শহর। এই বন্দর হয়ে পুরো রাজ্যে সবধরনের সাহায্য, খাদ্য, বাণিজ্যিক পণ্য এবং সামরিক সরবরাহ প্রবেশ করে। ফলে শহরটি অরক্ষিত হয়ে পড়লে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে এই অঞ্চলে অকার্যকর হয়ে পড়বে মোগাদিশু প্রশাসন। আর শালানবোদ হলো লোয়ার শাবেলি রাজ্যের বিভিন্ন জনবসতিকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উপর অবস্থিত একটি শহর। এই শহরটি অরক্ষিত হয়ে পড়লে রাজধানীর সাথে দক্ষিণের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সেই সাথে মোগাদিশু বাহিনীর রসদ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই পুরো রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে শহর দুটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে উগান্ডা সেনা সরে যাওয়ায় মোগাদিশু বাহিনীর অপারেশনাল প্রস্তুতি, লজিস্টিক সক্ষমতা এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। কেননা এর আগেও মোগাদিশু প্রশাসন বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহার করা এলাকা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সেসব এলাকা ৪৮ থেকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে হারাকাতুশ শাবাব আল-মুজাহিদিন নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল

আশ-শাবাবের সম্ভাব্য ভূমিকা

২০০৭ সাল থেকে আফ্রিকান জোট ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মিশনের অংশ হিসেবে সোমালিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের একটি বড় অংশ ছিল উগান্ডান বাহিনী। সোমালিয়ায় থাকাকালীন বিপুল সংখ্যক বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে এই বাহিনীটি সমালোচিত হয়েছে। আর এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় আশ-শাবাবের চালানো অভিযানে বহু সেনা হারিয়েছে। আর আশ-শাবাবের এসকল প্রতিক্রিয়া মূলক অভিযানগুলো এতটাই তীব্র ছিলো যে, যার কোনোটিতে ৩০০ এরও বেশি উগান্ডান সৈন্য নিহত হয়েছে।

আর সোমালিয়া থেকে উগান্ডান বাহিনীর প্রত্যাহারে যেই শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে পারে সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী আশ-শাবাব।

লোয়ার শাবেলি রাজ্যটি এমনিতেই আশ-শাবাবের সবচেয়ে শক্তিশালী অপারেশনাল জোনগুলোর একটি। এই অঞ্চলে তাদের দীর্ঘদিনের কৌশল হচ্ছে – প্রথমে সরকারি বাহিনীর সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়া, তারপর আইইডি ও গেরিলা হামলা চালিয়ে নতুন মোতায়েন হওয়া বাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়া এবং শেষে শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

আগের উদাহরণগুলোতে দেখা গেছে, বিদেশি বাহিনী সরে যাওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই আশ-শাবাব আশেপাশের গ্রামগুলোতে প্রবেশ করেছে এবং ধীরে ধীরে শহর অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। বারাভে ও শালানবোদের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

ফলে আশ-শাবাব যদি এই দুটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়, তাহলে তারা শুধু দুটি শহরই পাবে না, বরং পুরো লোয়ার শাবেলির উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য একটি কৌশলগত করিডোর পেয়ে যাবে, যা রাজধানী মোগাদিশুর জন্যও কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধইমারাতে ইসলামিয়ার সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে আরও ১৪০ তরুণ সদস্যের তিন মাসের গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন
পরবর্তী নিবন্ধগাজায় বর্বর ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ আরও তিন ফিলিস্তিনি শহীদ