যেভাবে শহীদ করা হয় বাবরি মসজিদ!

0
316

বাবরি মসজিদ! হিন্দুস্তানে মুসলিমদের প্রাচীন স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন। ভারতের উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট হিলের উপর অবস্থিত এই মসজিদটি ১৫২৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে নির্মিত হয়! আর, তাঁর নামানুসারেই মসজিদটির নাম রাখা হয় বাবরি মসজিদ! দীর্ঘকাল যাবৎ ভালোই চলছিল মসজিদের ব্যবস্থাপনা। কিন্তু, কে জানে এই মসজিদকে ঘিরেও ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে ইসলামের শত্রুরা! মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়ার গোপন চক্রান্তে লিপ্ত হিংসুক গোষ্ঠী!?

মসজিদ নির্মাণের প্রায় ৫০ বছর পর “রামচরিত মানস” লিখে সাধারণ হিন্দুদের মাঝে রামায়নের রামের গল্পের প্রচলন ঘটায় তুলসি দাস। ধীরে ধীরে অযোধ্যা নগরী রাম মন্দিরে ভরে যেতে শুরু করে।
বাবরি মসজিদ নির্মিত হবার প্রায় ৩০০ বছর পর, ১৮২২ সালে প্রথমবারের মত হিন্দুরা দাবি করতে শুরু করে, যে জমিতে রামের জন্ম হয়েছিল সেখানেই বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছে।

তারপর ১৮৫৩ সালে নির্মোহী আখরার সশস্ত্র হিন্দু সন্ন্যাসীদের একটি দল বাবরি মসজিদ দখল করে নিয়ে কাঠামোর মালিকানা দাবি করে! পরবর্তী কয়েকবছর পর্যায়ক্রমিক সহিংসতার পর ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ শাসক সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে ২টি আঙ্গিনায় বিভক্ত করে ফেলে মসজিদটি! মুসলিমরা ভেতরের প্রাঙ্গণে নামাজ আদায় করবে এবং হিন্দুরা বাইরের প্রাঙ্গণে ‘‘রাম ছবুতারা’’ নামে পরিচিত একটি প্লাটফর্মে প্রার্থনা করবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়! কিন্তু, ১৯৩৪সালে আবারও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধে! যার ফলে মসজিদটির দেয়ালের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়! ১৯৪৭ সালে হিন্দুস্তান বিভক্ত হয়ে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের আত্মপ্রকাশ ঘটে! আর তারপরই শুরু হয় নতুন চক্রান্ত! ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে মসজিদটির বাহিরে হিন্দু সংগঠন অখিল ভারতীয় রামায়ণ মহাসভা ৯দিন ব্যাপী রামচারিতমানাস পাঠের আয়োজন করে! অনুষ্ঠানের শেষে ২২ ডিসেম্বরের রাতে বেশ কয়েকজন উগ্র হিন্দু মসজিদে প্রবেশ করে এবং মসজিদের ভেতরে রাম ও সিতা মূর্তি স্থাপন করে! ২৩শে ডিসেম্বর সকালে অনুষ্ঠানের আয়োজকরা লাউডস্পিকারে ঘোষণা দেয় যে, মূর্তিগুলো অলৌকিকভাবে উপস্থিত হয়েছে! এবং সবাইকে ঐ মূর্তিগুলো দেখারও আহ্বান জানায়!

এ সময় বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে চলে গেলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু মূর্তিগুলো স্থাপনের মূল উৎস বুঝতে পেরে সেগুলো মসজিদ থেকে সরানোর আদেশ দেয়। কিন্তু, হিন্দুদের পৃষ্ঠপোষকতা করে উত্তর প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী আদেশ পালনে অপারগতা প্রকাশ করে! পরে ১৯৫০ সালে একদিকে হিন্দুসংস্থাগুলো মসজিদের জমি দখল নেওয়ার জন্য আদালতে মামলা করতে থাকে, অন্যদিকে সুন্নি কেন্দ্রীয় ওয়াকফ বোর্ড মসজিদ থেকে মূর্তিগুলো সরানোর জন্য আবেদন জানাতে থাকে! দীর্ঘ চার দশক যাবৎ এভাবেই চলে বাবরি মসজিদ ইস্যু! ১৯৮৬ সালে কংগ্রেস নেতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধির সিদ্ধান্তে বাবরি মসজিদকে হিন্দুদের জন্য খুলে দেওয়া হয়! ফলে হিন্দু পুরোহিতরা মসজিদে প্রবেশ করতে পারার সুযোগ পেয়ে যায়! মুসলমানরা বাবরী মসজিদ একশন কমিটি গঠন করলেও তা হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। তারপর, শুরু হয় মসজিদের পবিত্র প্রাঙ্গনে শিরকের ঘৃণ্য উৎসব।
১৯৮৯ সালে বিজেপির পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মসজিদের পাশেই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করে।

অতঃপর ১৯৯২সালে ঘটে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঘটনাটি! উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ১৯৯২ সালে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাবরি মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে। কিন্তু, পরবর্তীতে তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ১৫০,০০০ লোক মুসলিমদের প্রাচীন স্থাপত্যকলার নিদর্শন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ভূমিস্যাৎ করে দেয়!! মসজিদটি হঠাৎ করেই ধ্বংস করা হয়নি, বরং বহু পূর্ব থেকেই বাবরি মসজিদকে শহীদ করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল হিন্দুত্ববাদীরা! সাবেক গোয়েন্দা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মালয় কৃষ্ণ ধর ২০০৫ সালের একটি বইয়ে দাবি করেছে, আরএসএস, বিজেপি, ভিএইচপি এবং বজরং দলের সিনিয়র নেতারা মসজিদ ধ্বংসের ১০ মাস আগে থেকেই পরিকল্পনা শুরু করেছিল! আর, মসজিদ ধ্বংসের নীল নকশা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সকল বাঁধার সমাধানও করে রেখেছিল!

এ বিষয়ে ‘বিবিসি বাংলা’ ২০১৪ সালের ৪ঠা এপ্রিল ‘পরিকল্পনা করেই বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছিল’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ভারতীয় একটি অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা এক স্টিং অপারেশনে দাবি করেছে, বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা কল্যাণ সিং এমনকি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও-ও জানত যে সেদিনই বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হবে।

অনুসন্ধানী সংবাদসংস্থা কোবরা পোস্ট একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার জন্য রীতিমতো আত্মঘাতী দল তৈরি করা হয়েছিল, দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল আর সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে ডায়নামাইট দিয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নেতারা।

অতঃপর, সকল প্রস্তুতি শেষে চূড়ান্ত আঘাত আনার লক্ষ্যে বাবরি মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় দেড় লক্ষাধিক হিন্দুত্ববাদীদের সমাগম ঘটে। বিবিসি বাংলার ২০১৭ সালের ৬ই ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, হিন্দুত্ববাদীরা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার ৪-৫দিন আগে থেকেই মুসলিমদের কয়েকটি ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে নিজেদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমার পরিচয় দিচ্ছিল। আগেই বলা হয়েছে, ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার থেকে নিয়ে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত সকল হিন্দুত্ববাদীরা জানতো যে, মুসলিমদের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হবে। তাই, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন প্রকারের বাঁধার আশংকা ছিল না হিন্দুত্ববাদীদের।

তাই, আর দেরি কেন!? ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর সকাল সাড়ে দশটার দিকে মসজিদকে ঘিরে রাখা হিন্দুত্ববাদীরা বাবরি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে! বিবিসি বাংলার তথ্যানুযায়ী, মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে ১৫০০০ উগ্র হিন্দু। কিছু হিন্দুত্ববাদী যখন মসজিদের গম্বুজে উঠে গিয়েছিল, তখন চারদিকে আওয়াজ উঠলো- ‘এক ধাক্কা অউর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো।’ অর্থাৎ, আরো একটা ধাক্কা দাও, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দাও। মুরলী মনোহর জশি, উমা ভারতি ও আদভানিসহ হিন্দু নেতা ও পুরোহিতরা বক্তৃতার মাধ্যমে ক্রমাগত উপস্থিত হিন্দুদের উত্তেজিত করতে থাকে। আর, কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে পাশে দাড়িয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার দৃশ্য নিরবে দেখছিল জনতার সেবক পুলিশ বাহিনী! অবশেষে বিকেল পাঁচটা নাগাদ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ শেষ করে মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং ইস্তফা জমা দিয়েছিল – ততক্ষণে বাবরি মসজিদের তিনটি গম্বুজই ভাঙ্গা হয়েছে। মুসলিমদের স্বপ্নকে চুরমার করে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা, কুঠারাঘাত করেছে মুসলিমদের হৃদয়রাজ্যে। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদীরা তৎক্ষণাৎ ধ্বংসস্তুপের উপরই অস্থায়ী রাম মন্দির নির্মাণ করে। আর, পরের দিন সকালে হিন্দুত্ববাদী সেনারা এসে সেখানে খুব ভক্তি ভরে আশির্বাদ নেয়।

তারপর ইসলামপ্রেমী মুসলিমদের সাথে দাঙ্গা বাঁধে সন্ত্রাসী হিন্দুদের। একের পর এক লাশ পড়তে থাকে মাঠে-ময়দানে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বর্বরতায় সারাবিশ্ব হতবাক হয়ে যায়! ১৯৯২সালের সেই দাঙ্গায় প্রায় ২০০০ জন নিহত হয়েছিল।  অতঃপর, মুসলিমদের মসজিদ ধ্বংস করে, মুসলিমদেরকে গণহারে হত্যা করে, সমাধানের নামে মামলা-মোকদ্দমা, তদন্ত ইত্যাদি চলতে থাকে দীর্ঘসময়। আর, আজ ৯ই নভেম্বর শনিবার সেই মামলার শেষ রায় দিতে যাচ্ছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সুপ্রিম কোর্ট।

 

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন