ব্যক্তিগত রোষেই রায়হানকে হত্যা করেন এসআই

1
628
ব্যক্তিগত রোষেই রায়হানকে হত্যা করেন এসআই

সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে মারা যান আখালিয়ার যুবক রায়হান। গত ১১ অক্টোবর দিবাগত রাত তিনটায় তাকে এ ফাঁড়িতে ধরে এনে ভোর ছয়টা পর্যন্ত চালানো হয় নির্যাতন। নির্যাতনের ফাঁকে রায়হানের হাতে একটি মোবাইল ফোন দেওয়া হয়। রায়হান সেই ফোনে পরিবারের কাছে কল করে জানান, ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে এসে যেন তাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। এ তথ্য পেয়ে পরিবারের সদস্যরা টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে হাজির হলেও রায়হানের সঙ্গে তাদের দেখাই করতে দেওয়া হয়নি, নেওয়া হয়নি দাবিকৃত টাকাও। পরে জানানো হয়, গণপিটুনিতে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে। এসব কারণে প্রশ্ন জেগেছে, শুধু কি ১০ হাজার টাকা আদায় করতেই রায়হানের ওপর নির্যাতন চালান এসআই আকবরসহ পুলিশের অন্য সদস্যরা? এ প্রশ্নে একাধিক সূত্র বলছে, নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে ইউটিউবের একটি চ্যানেলের নাট্যাভিনেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এসআই আকবর। তারা যে বাড়িতে নিষিদ্ধ আড্ডা দিতেন, নিহত যুবক রায়হানদের বাড়ি সেই বাড়িটির অদূরেই অবস্থিত। রায়হান ওই বাড়িতে চলা অপকর্ম ও অনৈতিক কার্যকলাপের বিরোধী ছিলেন। এটি খেপিয়ে তোলে এসআই আকবরকে। তাই রাতে রায়হানকে হাতের নাগালে পেয়ে তাকে আটক করে গায়ের ঝাল মেটান আকবর। তার আক্রোশী নির্যাতনের কারণেই মারা গেছেন রায়হান।

এদিকে গতকাল বেলা ২টার দিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খালেদুজ্জামান জানিয়েছেন, নিহত রায়হানের লাশ কবর থেকে তুলে আবার ময়নাতদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, মরদেহ কবর থেকে তোলার অনুমতি দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে জেলা প্রশাসন ।

একে একে বেরিয়ে আসছে আকবরের সব অপকর্ম

বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। এতদিন ভয়ে কেউ টুঁ শব্দটি করেননি। এখন এ ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে যুবক রায়হানের মৃত্যুর পর উঠে আসছে অনেক অনেক ভুক্তভোগীর অসংখ্য অভিযোগ।

জানা গেছে, অসহায় মানুষকে এ ফাঁড়িতে ধরে এনে কখনো মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে, কখনো নির্যাতন করে টাকা আদায় করা হতো। এ ছাড়া বন্দরবাজার, কাষ্টঘর, মহাজনপট্টি এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীরাও এই ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের হয়রানির শিকার হয়েছেন। বুধবার পিবিআই দল মামলার তদন্ত হিসেবে ফাঁড়ি পরিদর্শনে গেলে সেখানে সমবেত হয়ে ক্ষোভ জানান ভুক্তভোগীরা।

সবজি ব্যবসায়ী তমিজ আলী বলেন, সকালে সবজি নিয়ে এলাকায় এলেই সবজির ভার আটকে দিয়ে সঙ্গে গাঁজা আছে বলে দাবি করা হয়। তাদের টাকা দিয়ে তবেই ছাড় পাওয়া যায়।

সঙ্গে গাঁজা না থাকলে টাকা দেন কেন, এমন প্রশ্নে তমিজ আলী বলেন, গাঁজা তো তাদের কাছেই থাকে। আমি না বললে সেটা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দেবে।

স্থানীয় ইলেকট্রিক পণ্য ব্যবসায়ী ফয়েজ বলেন, কতবার যে তাদের হয়রানির শিকার হয়েছি তার ঠিক নেই। কিন্তু কার কাছে অভিযোগ করব? এই এলাকায় তো তাদেরই রাজত্ব।

বন্দরবাজার এলাকার স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ হকার, আবাসিক হোটেল, মাদকদ্রব্য কেনা-বেচার স্পট, নিশীকন্যাদের অসামাজিক কার্যকলাপের স্পট, ছিনতাইকারী গ্রুপ, জুয়া খেলার স্পটগুলো থেকে প্রতিদিন, সপ্তাহ ও মাসিক হিসাবে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন এসআই আকবর। তার নির্দেশে নিরীহ পথচারীদের আটকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি করতেন ফাঁড়িটির পুলিশ সদস্যরা।

নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়ির আওতাভুক্ত তালতলা থেকে জিন্দাবাজার পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ভাসমান হকার রাস্তা ও ফুটপাতে বসেন। এর মধ্যে প্রত্যেক স্থায়ী হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা এবং ভ্রাম্যমাণ হকারদের কাছ থেকে ২০ টাকা করে চাঁদা ওঠাতেন এসআই আকবর। এ হিসাবে বন্দর ফাঁড়ির নামে প্রতিমাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হতো হকারদের কাছ থেকে।

অসামাজিক কাজের সুযোগ করে দিয়ে কয়েকটি হোটেল থেকে মাসোয়ারা আদায় করতেন আকবর। তার ফাঁড়ি এলাকার সুরমা মার্কেটে ২টি, জিন্দাবাজারে ২টি ও কালীঘাটে ২টি- এই ৬টি আবাসিক হোটেল থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার নিতেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

গুঞ্জন আছে, বন্দর এলাকাভিত্তিক মাদকদ্রব্য বিক্রির একটি বিশাল সিন্ডিকেটও পুষতেন এসআই আকবর। কাষ্টঘর ও কিন ব্রিজের নিচে মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য বিক্রি করত এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তাদের কাছ থেকে প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা নিত আকবর বাহিনী।

লালদিঘিরপারের সাধারণ ব্যবসায়ীরাও রেহাই পাননি আকবরের কবল থেকে। বৈধ ব্যবসা করেও নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো তাদের। না দিলে ব্যবসায়ীদের নানাভাবে হেনস্তা করতেন আকবর। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিমাসে লালদিঘিরপারস্থ হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৩০ হাজার টাকা চাঁদা তুলত আকবরের মদদপুষ্ট পুলিশ সদস্যরা।

প্রতিরাতে বন্দরবাজার এলাকায় ঘুরে বেড়ায় ছিনতাইকারী কয়েকটি গ্রুপ। তারা সুযোগ বুঝেই হামলে পড়ে পথচারীদের ওপর, ছিনতাই করে সর্বস্ব লুটে নিত সাধারণ মানুষের। এই ছিনতাইকারীদের কয়েকটি গ্রুপকে শেল্টার দিতেন আকবর। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে প্রতিমাসে পেতেন বড় অঙ্কের টাকা।

বন্দরবাজার, কিন ব্রিজের মুখ, সুরমা মার্কেট ও করিমুল্লাহ মার্কেটের সামনে এবং ধোপাদিঘির পূর্বপারের সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে মাসোয়ারা আদায় করতেন এসআই আকবর।

সুরমা মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ভোরে এবং রাতে ঢাকা অথবা সিলেটের বহিরাঞ্চল থেকে আগত নারী-পুরুষদের রাস্তা থেকে ধরে ফাঁড়িতে নিয়ে মাদক ও অবাঞ্ছিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল এসআই আকবরের নিত্যদিনের কাজ।

গত ১১ অক্টোবর রাতে এই ফাঁড়িতেই পুলিশের নির্যাতনে মারা যান রায়হান। রাত তিনটায় ধরে এনে ছয়টা পর্যন্ত নির্যাতন চালানো হয় তাকে। পরিবারের কাছে কল দিয়ে দাবি করা হয় ১০ হাজার টাকা। পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে আসার আগেই নির্যাতনে রায়হানের অবস্থা হয় মুমূর্ষু। তিন ঘণ্টা নির্যাতনের পর সকাল ছয়টায় হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। তখন হাঁটতেও পারছিলেন না রায়হান। হাসপাতালে যাওয়ার কিছুক্ষণে মধ্যে রায়হান মারা গেলে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন বলে প্রথমে প্রচার করে পুলিশ। কিন্তু পুরো এলাকাবেষ্টিত সিসিক্যামেরার ফুটেজে কোনো গণপিটুনির ঘটনা দেখা যায়নি জানার পর বক্তব্য পাল্টায় পুলিশ।
আমাদের সময়

১টি মন্তব্য

  1. এমন অত্যাচারী জানোয়ারদের সাধারণ মানুষের হত্যা করার অনুমতি কি আছে ইসলামে??? এদের খতম করতে পারলে হাজারো সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন