বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, অপকর্মের জবাবদিহি নেই এমপিদের

0
818
বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, অপকর্মের জবাবদিহি নেই এমপিদের

যেভাবেই হোক আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। এই দলটির একাধিক সংসদ সদস্য বারবার গণমাধ্যমে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য।

কিন্তু নিকট অতীতে আওয়ামী লীগের কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার নজির নেই। এ কারণে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী অপরাধী সংসদ সদস্যরা কাউকে তোয়াক্কা না করেই তাঁদের মেয়াদ পূর্ণ করেছে।

সর্বশেষ যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) শাহীন চাকলাদারকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। সেখানে ভাইরাল হওয়া একটি ফোনালাপে শোনা যায়,  এক পরিবেশবাদী আইনজীবীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের জন্য কেশবপুর থানার ওসিকে চাপ দিচ্ছেন। শেখ সাইফুল্লাহ নামের ওই আইনজীবী অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করায় এমপির রোষানলে পড়েন। ভয়ে সাইফুল্লাহ থানায় জিডি করেছেন।

শাহীন চাকলাদারের মতো বিভিন্ন সময় সমালোচিত সংসদ সদস্যদের তালিকাটা ছোট নয়। কিন্তু দল থেকে সতর্ক করা ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঢাকার দুই সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাজি সেলিম ও আসলামুল হক আসলাম বরাবরই সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।

রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হকের নারীঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলে দেশজুড়ে। কয়েক দফা নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যের এ রকম চারিত্রিক ক্লেদ দলের ভেতরে-বাইরে নানা রকম সমালোচনার জন্ম দেয়। এনামুল হকের গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে এবং হঠাৎ ছাড়াছাড়ি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ব্যাপারটি মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট দেওয়া এবং কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে লিজা নামের একজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় লিজাকে এনামুল হকের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘দপ্তরি কাম প্রহরী’ পদে ৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রার্থী নির্বাচনে কমিটির কোনো ভূমিকা ছিল না। সংসদ সদস্য এনামুল হক নিয়োগের আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে একটি ডিমান্ড অর্ডার (ডিও) লেটার পাঠাতেন। কোন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে চিঠিতে এর উল্লেখ থাকত। সে তালিকা ধরেই প্রার্থী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় ওই কমিটি। অভিযোগ আছে, নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এনামুল হক চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। সে হিসাবে অন্তত দুই কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা টাকা দেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন। কিন্তু এত সব অভিযোগের পরও এনামুল হকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আসলামুল হক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও দখলদারির জন্য বরাবরই সমালোচিত। জমি দখল করে পাওয়ার প্লান্ট তৈরির অভিযোগ রয়েছে এই এমপির বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে গেলে প্রকাশ্যে প্রশাসনের সমালোচনা করেন তিনি। যার ফলে প্রশাসনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ভালো সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

বিএ পরীক্ষায় নিজে উপস্থিত না হয়ে অন্যজন তাঁর পক্ষে অংশ নেওয়ায় জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সরকারদলীয় সদস্য (মহিলা আসন-২৪) তামান্না নুসরাত বুবলী চরম সমালোচনার মুখে পড়েন। পরীক্ষার হলে তাঁর জায়গায় বসে কমপক্ষে আটজন পরীক্ষা দেন বলে জানা যায়। সন্ত্রাসী হামলায় নিহত নরসিংদীর সাবেক পৌর মেয়র লোকমান হোসেনের স্ত্রী বুবলীর এই কাণ্ডে বিব্রত হন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য বুবলী এইচএসসি পাস। শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়িয়ে নিতে তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ কোর্সে ভর্তি হন। বিএ পাস করার পরীক্ষায় তিনি এই অনিয়মের আশ্রয় নেন। তিনি ঢাকায় থাকলেও তাঁর হয়ে নরসিংদীতে বিএ পরীক্ষা দেন প্রক্সি প্রার্থীরা। বাউবির বিএ কোর্সে চারটি সেমিস্টার ও ১৩টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও তিনি একটিতেও অংশ নেননি। এ ধরনের ঘটনার পরও বুবলীর সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে।

বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু চরম সমালোচনার মুখে পড়েন আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পর। হত্যাকাণ্ডে যাঁরা সরাসরি সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের মদদদাতা হিসেবে সরকারদলীয় এই এমপির ছেলে সুনাম দেবনাথের নাম আসে। আসামিদের পক্ষ থেকে সুনাম দেবনাথের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়। এমপি পিতার প্রশ্রয়ে সেখানকার কিশোর গ্যাং অপরাধীদের সুনাম দেবনাথ মদদ দিয়ে আসছিলেন বলে বরগুনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরও অভিযোগ রয়েছে। দেশজুড়ে সমালোচনার পরও ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বিরুদ্ধে দলের হাইকমান্ড কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং মামলার আসামি না করে তাঁর ছেলে সুনাম দেবনাথকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন