ডিম, মুরগির বাচ্চা আর খাদ্যের দাম ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি

0
120

ঢাকার খুচরা দোকান থেকে এখন এক ডজন (১২টি) ডিম কিনতে লাগছে প্রায় ১৫০ টাকা। এক মাস, দুমাস নয়; বছর দুয়েক ধরে ডিমের দাম চড়া। ফলে প্রাণিজ আমিষের কম খরচের উৎস বলে পরিচিত ডিম কিনতেও মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) একটি সমীক্ষা বলছে, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, মুরগির খাবার ও ডিমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। এর কারণ, আমদানি একেবারেই নিয়ন্ত্রিত রেখে ‘অতিমাত্রায়’ সুরক্ষা প্রদান।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এ সুযোগে চড়া দাম আদায়ের সুযোগ পাচ্ছে ডিম, মুরগির বাচ্চা ও খাদ্য ব্যবসায়ীরা। অন্য অনেক খাতেই দেশীয় শিল্প যেমন আছে, তেমনি আমদানির সুযোগও আছে। এতে বাজারে ভালো প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু পোলট্রি খাতে কেন আমদানি নিয়ন্ত্রিত, সেই প্রশ্ন উঠছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজারে দাম কমাতে নির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করে আমদানি উন্মুক্ত করার পক্ষে। তবে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় তা চায় না। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারি সংস্থার বিভিন্ন বৈঠকে আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ কারণে বাজারে ডিম, মুরগির মাংস ও গরুর মাংসের দাম কমছে না।

এক বছর আগে যে খাবার ১০০ টাকায় কেনা যেত, তা কিনতে জুনে লেগেছে ১১০ টাকার বেশি।
শুধু ডিম ও মাংস নয়, এখন বেশির ভাগ পণ্যের দামই চড়া। সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি এখন উদ্বেগের বিষয়। দেশে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই অনেক দিন ধরে। গতকাল রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছর আগে যে খাবার ১০০ টাকায় কেনা যেত, তা কিনতে জুনে লেগেছে ১১০ টাকার বেশি। যদিও বাজারের প্রকৃত অবস্থা আরও ভয়ানক।

২০২৩ সালের মার্চে গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ৯৬ শতাংশ নিম্নবিত্ত পরিবার মাংস খাওয়া, ৮৮ শতাংশ মাছ খাওয়া এবং ৭৭ শতাংশ পরিবার ডিম খাওয়া কমিয়েছে।

ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১ থেকে ৯৬ টাকা। পাকিস্তানে ছিল ৭৩ থেকে ১১৮ টাকা। বাংলাদেশে ওই সময় ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকায়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ডিমের দাম ভারতের চেয়ে গড়ে ৭৮ এবং পাকিস্তানের চেয়ে ৬৫ শতাংশ বেশি।

ডিম উৎপাদনের জন্য খামারিদের এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা কিনে লালন–পালন করতে হয়। জুনের প্রথম সপ্তাহে ভারতে এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দাম ছিল প্রতিটি ৩৫ থেকে ৫৬ টাকা। পাকিস্তানে ছিল ২১ থেকে ৪২ টাকা। বাংলাদেশে মুরগির বাচ্চার দাম ৫৫ থেকে ৭৪ টাকা। অর্থাৎ, বাংলাদেশে মুরগির বাচ্চার গড় দাম ভারতের চেয়ে ৪২ এবং পাকিস্তানের চেয়ে ১০৫ শতাংশ বেশি।

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১ থেকে ৯৬ টাকা। পাকিস্তানে ছিল ৭৩ থেকে ১১৮ টাকা। বাংলাদেশে ওই সময় ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকায়।
পোলট্রি খাবার খাইয়ে খামারে মুরগি পালন করা হয়। ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে প্রতি কেজি মুরগির খাবারের (লেয়ার গ্রোয়ার) দাম ছিল ৫৭ থেকে ৫৯ টাকা। ভারতে ছিল ৩৭–৪৮ টাকা। পাকিস্তানে ছিল ৩৯ থেকে ৪১ টাকা। বাংলাদেশে গড় দাম ভারতের চেয়ে ৩৭ ও পাকিস্তানের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি।

মুরগির খাদ্য তৈরির প্রধান দুই উপকরণ ভুট্টা ও সয়াবিনের উপজাত (মিল)। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বিশ্ববাজারে এই উপকরণের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০২২ সালে ভুট্টার গড় দাম ছিল টনপ্রতি ৩১৯ ডলার। কমতে কমতে তা গত মাসে ১৯৩ ডলারে নেমেছে। একইভাবে ৫৪৮ ডলারের সয়াবিন মিল গত মাসে বিক্রি হয়েছে ৪৮১ ডলারে। ফলে এখন আর রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাত দেওয়া খাটে না। ওদিকে বাংলাদেশে পোলট্রি খাদ্যের দাম কমেনি। খাদ্য উৎপাদনকারীরা এখন সামনে আনছে মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে।

ক্ষুদ্র খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ভারতে যে ডিমের উৎপাদন খরচ প্রতিটি ৫ টাকার আশপাশে, বাংলাদেশে সেটা সাড়ে ১০ টাকা কেন হবে। ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ভারতে ৮২ টাকা, বাংলাদেশে তা কেন ১৭০ টাকা হবে। এর কারণ, পোলট্রি খাদ্যের দাম। তিনি বলেন, পোলট্রি খাদ্যশিল্পে ‘সিন্ডিকেট’ (অসাধু জোট) রয়েছে। সেই ‘সিন্ডিকেটের’ সঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে।

এ অভিযোগের বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলে, ‘আমাদের কোনো কর্মকর্তা সিন্ডিকেট বা কোনো ধরনের যোগসাজশের সঙ্গে জড়িত নন। আর আমদানির অনুমতি দিলে দেশে যে শিল্প গড়ে উঠেছে, তা ক্ষতির মুখে পড়বে।’

অবশ্য সুমন হাওলাদার বলছেন, সাদিক অ্যাগ্রোর সঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যোগসাজশ ছাগল–কাণ্ডের পর বেরিয়ে এসেছে। তদন্ত করলে পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনকারীদের সঙ্গে যোগসাজশও বের হবে।


তথ্যসূত্র:
১. ডিম, মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যের দাম বাংলাদেশেই বেশি – https://tinyurl.com/3t6xhkxp

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধভারতে আরও এক মুসলিম ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা
পরবর্তী নিবন্ধকাশ্মীরে স্বাধীনতাকামীদের হামলায় পাঁচ দখলদার ভারতীয় সেনা নিহত