বাঙালি সেক্যুলারিজমের মুখোশ ও বাস্তবতা || পর্ব – ০১

0
0

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম

আমাদের চারপাশের তথাকথিত প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের দিকে একটু খেয়াল করে দেখেছেন কি? তাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হবে, মানবাধিকার আর সভ্যতার যেন তারাই একমাত্র ঠিকাদার। অথচ তাদের এই মানবাধিকারের বুলি কতটা একপেশে, তা একটু গভীরভাবে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের একটা বড় স্বভাব হলো, নিজেদের সাধের গণতান্ত্রিক বা সেক্যুলার সরকারগুলোর যাবতীয় ব্যর্থতা, দুর্নীতি আর অপদার্থতার দায়ভার অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ব্যর্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রের বেআইনি কার্যকলাপ ও অসারতা নিয়ে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন তোলে না। অথচ এই কথিত সুশীলরা প্রাক্তন গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জুলুম নিপীড়ন ও বে-ইনসাফির দায়ভার ইসলামী ইমারাত বা ইসলামী শাসনব্যবস্থার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়! কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিক পঁচা-গলা আইন কানুন ও রীতি নীতি নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলে না, যেখানে জন সাধারণ সর্বদাই অনিশ্চিত, অনিরাপদ জীবন যাপন করে।

‎আবার, যখন তাদের কথিত সভ্য দুনিয়ার, বিশেষ করে ইসরায়েলের মতো দখলদার রাষ্ট্রের ভেতরের চরম পচনশীল দিকগুলো যখন সামনে আসে, তখন তাদের মুখে একেবারে কুলুপ আঁটা থাকে।

‎খুব বেশি দূরের কথা নয়, আসুন তাদের সভ্যতার একটি নমুনা দেখি। ইসরায়েলি সমাজের ভেতরে গুমরে কাঁদা এক ভয়াবহ ও বিকৃত সত্য সম্প্রতি জনসমক্ষে এসেছে। আর মজার ব্যাপার হলো, এই গা শিউরে ওঠা তথ্যগুলো কিন্তু কোনো তথাকথিত ‘ইসরায়েল-বিরোধী’ বা মুসলিম সংবাদমাধ্যমের দেওয়া নয়; বরং তাদেরই প্রথম সারির পত্রিকা ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর প্রতিবেদন থেকে এই বীভৎস চিত্র উঠে এসেছে। সমাজটা ঠিক কতটা পচে গেলে এমনটা সম্ভব, তা ভাবতে গেলেও সুস্থ মস্তিষ্কের যেকোনো মানুষের বমি চলে আসবে। সেখানে খোদ স্কুল প্রশাসন রীতিমতো সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা গ্যাংরেপের মতো জঘন্য অপরাধের আয়োজন করে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। শিশুদের ওপর হওয়া যৌন নির্যাতনের যে পরিসংখ্যান তারা নিজেরাই দিচ্ছে, তা আক্ষরিক অর্থেই এক চরম বিকারগ্রস্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি।

‎পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আপনার রক্ত হিম হয়ে আসবে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেখানে শিশুদের ওপর হওয়া যৌন নিপীড়নের অন্তত ৭০ শতাংশই ঘটে খোদ পরিবারের ভেতরে; অর্থাৎ অজাচার বা ইনসেস্টের মাধ্যমে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই বিকৃত অপরাধের ১১ শতাংশ ক্ষেত্রে খোদ পিতা-মাতাই জড়িত! এছাড়া ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী হচ্ছে পরিবারের অন্য কোনো নিকটাত্মীয় এবং ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে তারা নির্যাতিত শিশুর পূর্বপরিচিত বা বন্ধুস্থানীয় কেউ। অর্থাৎ, মাত্র ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে বাইরের কোনো অপরিচিত ব্যক্তি এই অপরাধ করে থাকে। এই নারকীয় লালসা থেকে ছেলে বা মেয়ে— কেউই নিরাপদ নয়; যদিও খুব স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় যে, মেয়েদের ক্ষেত্রে এই নির্যাতনের মাত্রা ও ভয়াবহতা আরও কত বেশি।

‎সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, ইসরায়েলি সমাজের এই বীভৎস রূপটিকে আড়াল করতে সেখানকার পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রটাই যেন একজোট। জঘন্য এই মামলাগুলোকে খুব সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়। শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া যৌন অপরাধের প্রায় ৮০ শতাংশ মামলাই কোনো সুনির্দিষ্ট বিচার ছাড়াই চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো আইনি ব্যবস্থাই নেওয়া হয় না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ মদদ ছাড়া এমন পদ্ধতিগত প্রশ্রয় যে কখনোই সম্ভব নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি, তাদের বিভিন্ন উপাসনালয় বা মন্দিরের ভেতরেও শিশুদের নিয়ে নানা বিকৃত আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মাচারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে। এই হলো তাদের তথাকথিত সভ্যতার আসল চেহারা!

‎এবার একটু নিরপেক্ষ মন নিয়ে ভেবে দেখুন তো, একটি ইসলামী হুকুমত বা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি এমন জঘন্যতম কোনো অপরাধের সামান্যতম ঘটনাও ঘটত, তবে তার পরিণতি কী হতো? ইসলামী আইনে নিষ্পাপ শিশুদের ওপর এমন পাশবিক নির্যাতনের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর এবং আপসহীন। সেখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা পদ্ধতিগত প্রশ্রয়ের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ইসলামী হুকুমতে এ ধরনের বিকৃত মানসিকতার অপরাধীকে জনসমক্ষে চূড়ান্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। জনসমক্ষে এমন কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেন সমাজে এ ধরনের বিকৃত চিন্তার বীজ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায় এবং বাকিরাও এর থেকে চরম শিক্ষা পায়।

‎অথচ, আমাদের দেশের সেক্যুলার সমাজ এসব নিয়ে একেবারেই নিশ্চুপ। ইসরায়েল তথা কথিত সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র‌গুলোর এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, শিশুদের ওপর রাষ্ট্রীয় মদদে চলা এমন পাশবিক নির্যাতন ও চরম নৈতিক স্খলন নিয়ে তারা কখনোই কোনো টকশো গরম করবে না, বিশাল কোনো কলামও লিখবে না। তাদের যাবতীয় আক্রোশ আর সমালোচনা যেন কেবল ইসলামী শাসনব্যবস্থার জন্যই তোলা থাকে। নিজেদের পছন্দের চরম ব্যর্থ ও বেহুদা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমস্ত দায় তারা অনায়াসেই ইসলামী ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। মানবতার দোহাই দেওয়া এই মানুষগুলোর এই নির্লজ্জ দ্বিচারিতা আর অন্ধত্বই হলো বাঙালি সেক্যুলারিজমের আসল মুখোশ ও সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবতা।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাশ্মীরের রাজৌরি জেলায় দখলদার ভারত একটানা ঘেরাও-তল্লাশির ১৭তম দিনে প্রবেশ করেছে