বাংলাদেশে ধর্ষণের ভয়াবহ বিস্তার ও শরিয়াহর ছায়াতলে নারীর নিরাপত্তা

0
0

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম

যে সমাজে আল্লাহর বিধান উপেক্ষিত হয়, যেখানে লজ্জাশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে, যেখানে নারীকে সম্মানিত আমানত নয় বরং ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—সেই সমাজ ধীরে ধীরে নৈতিক ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। আর যখন মানব রচিত মতবাদ আল্লাহর শরিয়াহর পরিবর্তে সমাজ পরিচালনার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ধর্ষণ, ব্যভিচার, পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক অস্থিরতা অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়। আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন সেই ভয়াবহ পরিণতিরই প্রতিচ্ছবি।

প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও পাশবিক হত্যার খবর। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—এ অপরাধের শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরাও। এমন এক সমাজ, যেখানে একটি আট বছরের শিশুও ধর্ষকের হিংস্রতা থেকে নিরাপদ নয়—সেই সমাজের নৈতিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আজ সময়ের দাবি।

২০২৬ সালের ১৯ মে, ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরে তার মস্তকবিহীন দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; বরং এটি এমন এক সমাজব্যবস্থার নগ্ন প্রতিচ্ছবি, যেখানে আল্লাহভীতি, নৈতিকতা ও ইসলামী মূল্যবোধ ক্রমাগত ধ্বংস করা হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই বাংলাদেশে ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৯ জনের বয়স মাত্র ০ থেকে ৬ বছরের মধ্যে। একই সময়ে ১২৯টি ধর্ষণচেষ্টা এবং বহু ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনাও সামনে এসেছে। অথচ বাস্তব সংখ্যা আরও ভয়াবহ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

প্রশ্ন হলো—কেন এমন হচ্ছে?

কারণ, একটি সমাজ যখন ইসলামি শরিয়াহ থেকে দূরে সরে যায়, তখন সেখানে অশ্লীলতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, পর্দাকে পশ্চাৎপদতা বলা হয়, এবং পশ্চিমা ভোগবাদী জীবনব্যবস্থাকে “অগ্রগতি” হিসেবে প্রচার করা হয়। ফলস্বরূপ মানুষের অন্তর থেকে তাকওয়া উঠে যায়, জিনা-ব্যভিচার সহজ হয়ে পড়ে, আর ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সমাজে মহামারির রূপ নেয়।

পশ্চিমা মানবাধিকার সংগঠনগুলো আজ নারী স্বাধীনতার নামে যে সমাজব্যবস্থার প্রচার করে, সেই সমাজেই নারী সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। নারীকে পণ্য বানিয়ে বিজ্ঞাপন, বিনোদন ও ব্যবসার হাতিয়ার করা হয়েছে। অথচ ইসলাম নারীকে দিয়েছে সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পবিত্র অবস্থান।

এই বাস্তবতার বিপরীতে আফগানিস্তানে ইমারাতে ইসলামিয়ার অধীনে গড়ে উঠছে এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে শরিয়াহকে কেন্দ্র করেই সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। সেখানে নারীর অধিকারকে পশ্চিমা স্লোগানের মাধ্যমে নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বাস্তবভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইমারাতে ইসলামিয়ার সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত কয়েক বছরে হাজার হাজার জোরপূর্বক বিবাহ প্রতিরোধ করেছে। বহু নারীকে পারিবারিক নির্যাতন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নারীদের উত্তরাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সমাজে শালীনতা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শুধু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই নারীর অধিকারসংক্রান্ত ৩,৪১৩টি মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ১,৫৪৫ নারীকে পারিবারিক সহিংসতা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ৮৩৩টি জোরপূর্বক বিবাহ বন্ধ করা হয়েছে। ১,০৩৫ নারীকে তাদের শরিয়াসম্মত উত্তরাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে— একদিকে এমন একটি সমাজ, যেখানে “স্বাধীনতা”র নামে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিয়ে নারীকে অনিরাপদ করা হয়েছে; অন্যদিকে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আল্লাহর শরিয়াহর আলোকে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।

ইসলামি সমাজে নারীর নিরাপত্তা কেবল আইনের মাধ্যমে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া ও নৈতিকতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন মুসলিম পুরুষকে শেখানো হয়—নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া পর্যন্ত গুনাহ। আর ধর্ষণের মতো অপরাধ ইসলামে এত ভয়াবহ যে, এর শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর।

অন্যদিকে পশ্চিমা সভ্যতা “স্বাধীনতা”র নামে নারীকে ঘর থেকে বাজারে, বিজ্ঞাপনে, বিনোদনে এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ফলে নারীর মর্যাদা নয়, বরং দেহই হয়ে উঠেছে তার পরিচয়ের প্রধান উপাদান।

আজ প্রয়োজন কেবল নতুন আইন নয়; প্রয়োজন নৈতিক বিপ্লব। প্রয়োজন এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে লজ্জাশীলতা সম্মানের বিষয় হবে, পরিবার হবে নৈতিকতার কেন্দ্র, এবং আল্লাহর ভয় মানুষের অন্তরে জীবন্ত থাকবে।

কারণ ইতিহাস সাক্ষী— যেখানে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে সমাজে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও নৈতিকতা শক্তিশালী হয়। আর যেখানে মানুষ আল্লাহর আইনকে পরিত্যাগ করে, সেখানে অস্থিরতা, অবক্ষয় ও জুলুমই শেষ পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধসোমালিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএসএ এবং সিআইডি সদর দপ্তরে হারাকাতুশ শাবাবের হামলা