ভারতের কর্মকাণ্ডে মারাত্মক সঙ্কটে পড়বে বাংলাদেশ

0
1434
ভারতের কর্মকাণ্ডে মারাত্মক সঙ্কটে পড়বে বাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা বিগত কয়েক বছরে নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সবখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়নের কারণে এই চাহিদা বেড়েছে।

পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় এবং সীমিত সম্পদের উপর চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে পানি সমস্যার কার্যকর ও টেকসই সমাধান বের করার জন্য সমাজের উপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় পানি সঙ্কটের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ইস্যু হিসেবে উঠে আসছে। বিশ্বের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ মানুষ এই অঞ্চলে বাস করছে। উপমহাদেশে বড় বড় বেশ কিছু নদী ও তাদের শাখা-প্রশাখা রয়েছে। পাকিস্তানের কিছু নদীর উৎপত্তি হয়েছে পশ্চিমা পার্বত্য অঞ্চলে। এর বাইরে অধিকাংশ নদীগুলোর উৎপত্তি তিব্বত অঞ্চলে।

সিন্ধু, গঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখা এবং ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি তিব্বত থেকে। তিব্বত শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বরং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ারও পানি নিরাপত্তার মূল কেন্দ্র। মেকং আর ইয়াংজি নদীর উৎপত্তিও তিব্বতে।

তিব্বত মালভূমিতে হিমবাহ গলার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ার কারণে বহু মিলিয়ন মানুষের পানি নিরাপত্তা নিয়ে হুমকি সৃষ্টি হয়েছে, যারা পানির জন্য তিব্বত থেকে জন্ম নেয়া নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল।

তিব্বতে বর্তমানে বার্ষিক হিমবাহ গলে যাওয়ার হার হলো সাত শতাংশ। এই মাত্রায় গলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ হিমবাহ নিঃশেষ হয়ে যাবে। হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে ব্রহ্মপুত্রের মতো কিছু নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে গেছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে পানির প্রবাহ বাড়বে কিন্তু যতদিন হিমবাহ থাকবে, ততদিনই শুধু এই প্রবাহ থাকবে। এভাবে পানি অপচয় এশিয়ার জন্য শুভ নয়।

বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ার কারণে বিশুদ্ধপানির উৎসগুলো আরও কমে আসবে। পরিবেশ বিপর্যয়, এশিয়ায় দ্রুত নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যাগুলো সীমিত পানি সম্পদের উপর চাপ ক্রমাগত বাড়াচ্ছে।

উপমহাদেশসহ এশিয়ার প্রধান পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাই চীনের ভূমিকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিকভাবে চীন মূলত একটি শুষ্ক দেশ এবং বহু বছর ধরেই পানি নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। বাঁধ নির্মাণ, সেচ ব্যবস্থা এবং পানি বন্টন সিস্টেমটা তাই শুধু ১.৩ বিলিয়ন মানুষকে পানি সুবিধা দেয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটা গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের শুষ্ক জলবায়ুর কারণে তিব্বত মালভূমি থেকে তাদেরকে উত্তরাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় পানি নিয়ে যেতে হয়েছে। চীন তিব্বতের মেকং নদীপথে সাতটি বাঁধ নির্মাণ করেছে এবং আরও ২১টি নির্মাণের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যাণ্ড ও ভিয়েতনামের প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য ও পানির জন্য নদীর উপর নির্ভরশীল। এই পানির প্রবাহে কোন বাধা সৃষ্টি হলে এই দেশগুলোর জন্য সেটা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত শরণার্থী সৃষ্টি হবে এবং পানি নিয়ে যুদ্ধ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

ব্রহ্মপুত্র নিয়েও একই ঘটনা ঘটছে। এই নদীতেও আরও দুটো বাধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। ভারত এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছে, কারণ এগুলো তাদের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপর প্রভাব ফেলবে। পানির গতিপথ পরিবর্তনে চীনের পরিকল্পনা পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে এবং এটা ভারত ও বাংলাদেশের ১.৩ বিলিয়ন মানুষের কৃষি, জীবন ও জীবিকার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গঙ্গার উজানে ভারতের কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ পানি সরবরাহ নিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়বে। ব্রহ্মপুত্র আর গঙ্গা বাংলাদেশে মিলে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। গঙ্গায় ভারতের বাধ দেয়ার কারণে ভাটিতে এরই মধ্যে প্রবাহ কমে গেছে। বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে এবং কৃষি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ অঞ্চলের জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে হাজার হাজার বাংলাদেশীকে উত্তরপূর্ব ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছে, যেটা মারাত্মক জাতিগত সঙ্ঘাত তৈরি করেছে। ভারতের বিতর্কিত নতুন নাগরিকত্ব আইন এই সমস্যার একটা লক্ষণ মাত্র।

বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতাও তাদের সীমিত। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়লে এটা দেশে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করবে।

পাকিস্তানের জন্য প্রধান সমস্যা হলো ১৯৬০ সালের ইন্দুস ওয়াটার্স ট্রিটি (আইডাব্লিউটি), যেটা বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। উপমহাদেশের উত্তরে যে সিন্ধু নদী ব্যবস্থা, সেটার পানি বন্টনের বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় নদী – বিয়াস, রাভি এবং সুটলেজের প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ ভারতের কাছে দেয়া হয়েছে। আর তিনটি ‘পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী’ – ইন্দুস, চেনাব ও ঝিলামের নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের কাছে।

আইডাব্লিউটি চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে বহু বছর ধরেই সমালোচনা চলে আসছে কিন্তু উপমহাদেশে পানি সঙ্কট বাড়তে থাকায় ভারত কিষাণগঙ্গা বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো নতুন বাধ নির্মাণ করে পানি সম্পদ কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। এই প্রকল্পটি নিলাম নদীর পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে এবং এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে পানি থেকে বঞ্চিত করছে ভারত।

বন্যার সময়, পাকিস্তানকে আগাম সতর্কতা না জানিয়েই বন্যার পানি ছেড়ে দিতে পারে ভারত এবং সেটা তারা করেছে। ফলে পাকিস্তানে বন্যা দেখা দিয়েছে। নিলাম নদীর উপর কিষাণগঙ্গা বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং চেনাবের উপর রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে মারাত্মক আপত্তি জানানোর পরও ভারত এই প্রকল্পগুলো শেষ করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ সালের জুনে ৩৩০ মেগাওয়াটের কিষাণগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তানের অনুরোধে বিশ্ব ব্যাংক যখন কোর্ট অব আরবিট্রেশান গঠনের প্রক্রিয়া স্থগিত করে, তখন এই বাধ নির্মাণ সম্পন্ন করে ভারত।

ভারত পাকিস্তানের অনুরোধের বিরোধিতা করে এবং নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের আহ্বান জানায়। ভারত যে আচরণ দেখিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি যেভাবে লঙ্ঘন করেছে, সেটা  চরম দুঃখজনক এবং এর মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রতি ভারতের শত্রুতা ফুটে উঠেছে। ইন্দুস ওয়াটার ট্রিটির অধীনে পাকিস্তানের যে সব নদীর পানি প্রাপ্য, সেগুলোর প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন মোদি।

পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গিয়েছে, তাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পানি নিয়ে এমনকি যুদ্ধ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে, কারণ এটা এখন জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু।

তিব্বতী নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি করে যে দেশগুলো, তাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাও রয়েছে। পারস্পরিক শত্রুতা, সন্দেহ এবং আইনগত কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি না থাকার কারণে বহুপাক্ষিক সাফল্যটা বাধাগ্রস্ত হবে।

১৯৯৫ সালে এগ্রিমেন্ট অন কোঅপারেশান ফর দ্য সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট অব দ্য মেকং রিভার বেসিন স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয় যে, মেকং কোন একক রাষ্ট্রের সম্পদ নয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল নদী অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে টেকসই উন্নয়ন এবং সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করা। কিন্তু মেকংয়ের উৎপত্তি যেহেতু তিব্বতে, এবং উজানের নিয়ন্ত্রণ চীনের কাছে রয়েছে, সে কারণে চীন এই চুক্তিতে যোগ দিতে অস্বীকার করে।

১৯৯৫ সাল থেকে, বিশ্বায়নের মাত্রা বেড়ে গেছে এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব বহুগুণে বেড়েছে। এখনই সময় যাতে অভিন্ন নদীগুলোর পানি বিনিময়ের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশ যাতে এগিয়ে আসে।

যে পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে, সেখানে বিভিন্ন জাতি রাষ্ট্রের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকে চেপে যাওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিটার স্বীকৃতি দিতে হবে এবং বহুদেশীয় ও বহু আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করতে হবে কারণ এর কারণে বহু মিলিয়ন মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে।

পানি বিনিময় সঙ্কটকে বিরাজনীতিকীকরণ করতে হবে। এটা বলা সহজ হলেও বাস্তবায়ন করা কঠিন। যে অঞ্চলে আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে না এবং অতীতে যেখানে যুদ্ধ হয়েছে, এবং নতুন একটা বৈশ্বিক পরিবেশ যেখানে চীনকে নতুন সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে, সেখানে যে কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য আত্মবিশ্বাস তৈরির ব্যবস্থা নিতে হবে।

সেই সাথে বিভিন্ন দেশ ও সরকারকে টেকসই জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং সেটা বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

সে কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের নিজেদের প্রচেষ্টাটা চালাতে হবে। এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, এটা একক বিশ্ব এবং মানবতাও এখানে একক। অন্যকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে নিজের মনুষ্যত্বই চলে যাবে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন